Naya Diganta

প্রকৃতির শোধ

প্রকৃতির শোধ

জায়গাটার নাম নিলাম্বুর না হয়ে হওয়া উচিত ছিল তেঁতুলাম্বর। চারদিকে যেদিকে তাকাই সেখানেই দেখি তেঁতুল গাছ। অবশ্য এখন অনেকে টেক টাউন হিসেবেই চিনে। যেতে হবে ছলিয়ার নদীর তীরে, সেন্ট পল গির্জার কাছে। ওখানে আমার ক্লায়েন্ট রবার্টের কাছে। সত্তরোর্র্ধ্ব রবার্ট আমার একজন ক্লায়েন্ট, যৌবনে লোকটা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল বোঝা যায়। অবশ্য এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তার সাথে মালাপপুরাম জেলা কোর্টে আমার দেখা হয়েছিল কয়েকবার। কিছু প্রপার্টির লিগ্যাল পেপার ওয়ার্ক নিয়ে। এরপর কয়েকবার তার বাসায় যাওয়ারও সুযোগ হয়েছে। লোকটা যথেষ্ট কৃপণ বটে, অবশ্য এটা আমার জানা কথাই। বয়স হলে লোকের সম্পদের প্রতি মোহ বেড়ে যায়। তিনি আগে পুরোনে জিনিস কেনাবেচার ব্যবসা করতেন বোধ হয়, ভদ্রলোক মানুষের সাথে তেমন একটা মিশেন না। যৌবনে উনি কলকাতার ওই দিকে কোথায়ও থাকতেন হয়তো। এ দিকে এসে বছর ১৫ হবে থিতু হলেন। স্থানীয় লোকজন ওনার বাড়ি সবসময় এড়িয়ে চলেন। কেননা, বাড়িভর্তি আছে নাম জানা না জানা বেশ কিছু কুকুর। আর বিশ্বস্ত কয়েকজন কাজের লোক।
স্থানীয় শিশুরা অবশ্য তাকে খাড়ুস বুড়ো বলে ডাকে। যদিও অনেক কানাঘুষা আছে তাকে নিয়ে কিন্তু কেউ তাকে নিয়ে ঘাটে না। সমাজে অবশ্য যাদের টাকা থাকে তাদের নিয়ে কেউ কথা বলতে সাহস করে না। ছোট্ট এ এলাকার প্রায় ৫০ হাজার লোকের মাঝে তার বাংলো ও তার মানমর্যাদার শান অনেক উঁচু অবশ্য। কোথায় টাকা খরচ করলে সমাজে পজিশন হয় এটা বোধহয় খুব ভালোই জানেন রবার্ট। ওনাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলের কারণগুলোর একটি হলো- তার গেটে লেখা ‘স্ত্রীলোক ও বাচ্চাকাচ্চা প্রবেশ নিষেধ’। অবশ্য তার বাসায় আমি ছাড়া কেউ আসে কি না আমার অবশ্য জানা নেই। ভদ্রলোকের স্ত্রী নেই। যৌবনেই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। হয়তো সে শোক থেকেই মেয়ে মানুষ ও বাচ্চাকাচ্চার প্রতি এতটা রাগান্বিত। রামু, শিবু, নিধু আর পেশিবহুল ওয়াসম্যান কালিয়া আরো দু-চারজন কর্মচারী নিয়ে তার জীবন। এরা প্রত্যেকেই তার সাথে বহু বছর ধরেই আছেন বলে জানি। আর এদের সবাই কেউই অবশ্য নিলাম্বরের লোক না, তাদের কেউ আছেন কলকাতার, কেউ আছেন খোদ কেরালার অন্য জায়গাগুলো থেকে। আবার কেউ আছে নেপালের।
যাই হোক, অবশেষে রবার্টের বাড়ি এলাম। রবার্ট তার সম্পদের একটি উইল করতে চাচ্ছে। যেহেতু ওর সাথে আগেই আমার পরিচয়, তা ছাড়া মালাপপুরাম ফ্যামিলি কোর্ট একজন সম্মানিত ল’ইয়ার তাই আমাকে ডেকেছে। রবার্ট স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত, প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সম্পদের ৪০ শতাংশ এলেক্স হলির (কৃষ্ণপুর, খ্রিষ্টানপাড়া, কলকাতা) নামে, বাকি সম্পদ এলেক্সের ছেলেমেয়ের মধ্যে ১০ শতাংশ এনা, ১০ শতাংশ ড্যারেক, ১০ শতাংশ জিনিয়া এবং ১০ শতাংশ ফ্রেডের নামে উইল করেছেন। যদি এলেক্স এ সম্পদ গ্রহণে অস্বীকার করে তবে তার সম্পদ তার চার সন্তানের মাঝে চারভাগে বণ্টন হবে। মোট গেল ৮০ শতাংশ, বাকি ২০ শতাংশ রবার্টের নামে একটি চ্যারিটি ফাউন্ডেশন হবে, যার কাজ হবে রবার্টের জীবনাবসান পর্যন্ত যারা তার কাছে ছিলেন তাদের ও তাদের পরিবারের ভরণপোষণ এবং অনাথ শিশু ও অসহায় নারী কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। আমি একটু অবাক হলাম তার এমন ধরনের উইলে। তবে রবার্টের মুখে মুচকি হাসি দেখলাম, মনে হয় যেন রবার্টের জীবন থেকে একটা বড় বোঝা নেমে গেল। আমি তার উইলের সব কাজ শেষ করে ওই দিনের মতো ফিরে এলাম।
রবার্টের কাছে এরপর কয়েকবার এসেছি তার উইলের কাজে। দিন দিন রবার্টের শরীর খারাপের দিকেই যাচ্ছে দেখলাম। প্রায়ই দেখতাম রবার্ট বিড়বিড় করে একটি কথাই বলত, ‘ওহ লর্ড, ওহ জেসাস, ওহ মাতা মেরি, আমি অপবিত্র, আমায় তুমি ক্ষমা করো।’ উইলের প্রায় আট মাস পর একদিন ভোরবেলা শ্বেতশুভ্র সকালে রামু, রবার্টের ব্যক্তিগত সহকারী ফোন দিয়ে কেঁদে দিলেন। আমি যা বোঝার বুঝে গেলাম। এরপর খুব দ্রুতই রবার্টের লাশ নিলাম্বুরের একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হলো। রবার্টের মৃত্যুর পরদিন রামু আর আমি কলকাতায় কৃষ্ণপুরে এলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এলেক্স হলির খবর পেলাম। ও বর্ধমানের দিকে চলে গেছে। ওখানে একটি স্কুলের প্রাথমিক টিচার। বেচারা চার সন্তান নিয়ে বেশ কষ্টে আছে। আমি এর আগে অনেকবারই ভেবেছি রবার্ট কেন ওর উইলে এর কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু ক্লায়েন্টের পারসোনাল সাবজেক্ট তাই কখনো প্রশ্ন করিনি। এলেক্স হলি রামুকে দেখেই ক্ষেপে গেল। ও দেখলাম বেশ রাগের সাথেই রামুকে বলল, কেন আবার এসেছেন? আপনাদের অত্যাচারে আমি কৃষ্ণপুর থেকে পালিয়েছি। আপনি আবারো এখানে এসে হাজির। রামু মাথা নিচু করে রইল। আমাকে দেখিয়ে এলেক্স রামুকে জিজ্ঞেস করল, ইনি কে? রামু বলল, বাবুর ল’ইয়ার। এলেক্স দেখলাম বেশ ঝাঁজের সাথে বলল, ওই শয়তানের কিছু চাই না আমি। এবার রামু কেঁদে দিলো। এলেক্স দেখলাম একটু নরম হলো। এলেক্স জিজ্ঞেস করল, উনি কি নেই? এবার এলেক্সের চোখে দেখলাম একটি কষ্টের ছাপ।
এরপর শান্তভাবেই এলেক্স আমার থেকে উইলের বিষয়টি সম্পূর্ণ জানলেন। এলেক্স কিছুতেই নিজের নামে সম্পদের ব্যাপারে রাজি হলেন না। উইল মোতাবেক এলেক্সের সম্পদ এলেক্সের সন্তানের- তাতেও এলেক্স দেখলাম রাজি না। এবার দেখলাম রামু উঠে এলেক্সের পা জড়িয়ে ধরলেন, এলেক্স বারবার তাকে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। রামু দেখলাম বলল, বাবু বলেছে আপনার পা জড়িয়ে ধরতে। আপনাকে আমি ছাড়ব না। অগত্যা এলেক্স রামুর জেদের কাছে হার মানল। তবে নিজের নামেরটা সন্তানের নামে ট্রান্সফার করতে বললেন। রামু এরপর খুব মৃদুভাবে ভয়ে ভয়ে বললেন, বাবুর লাশ এখনো মর্গে, তার শেষ ইচ্ছে ছিল আপনি যদি তাকে বিদায় দিতেন। এবার দেখলাম এলেক্স শিশুদের মতো কাঁদতে শুরু করল। আর বলতে লাগল, রামু জীবন এত অদ্ভুত কেন? আমার মা, রামু আমার মা! আমি আবারো একটু অবাক হলাম এলেক্সের মায়ের জন্য আর্তনাদ দেখে। এবার দেখলাম রামু, কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল। বাবু সারাক্ষণ এ বিষয়ে মর্মপীড়ায় ভুগতেন। তিনি সারাক্ষণ এ জন্য লর্ড, যিশু ও মা মেরির কাছে কাঁদতেন। এটাই তার জীবনকে শেষ করে দিলো। এলেক্স দেখলাম বলছিল, এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। আমিও বুঝতে পারলাম এলেক্সের সাথে রবার্টের কোনো একটা সম্পর্ক ছিল।
অবশেষে এলেক্স কেরালায় আসতে রাজি হলো। বলল, আপনারা আজ এগোন আমি কাল রওনা করব। এখানে আমার কিছু ফর্মালিটি সারতে হবে। অতঃপর আমরা চলে এলাম, রামুকে পথে বললাম, রামু একটা বিষয় আমার কাছে একটু অদ্ভুত লেগেছে, যদিও এটি রবার্টের পারসোনাল বিষয় তবে তুমি ইচ্ছে হলে এর উত্তর দিতেও পারো নাও দিতে পারো। এলেক্স হলি রবার্টের কে?
রামু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে লাগল, এলেক্স হলি আসলে বাবুর (রবার্টের) ছেলে। আমি একটু অবাক হয়ে রামুর দিকে তাকালাম। রামু এবার বলতে লাগল, আসলে বাবুরা ছোটবেলা থেকেই ধনী ছিলেন, এক বাপের এক সন্তান ছিলেন বাবু। পয়সার অভাব ছিল না তাই নারীরও অভাব ছিল না জীবনে। কৃষ্ণপাড়ার এলিজাবেথকে দেখে বাবু পছন্দ করে ফেললেন। তিনি অসম্ভব সুন্দরী একজন নারী ছিলেন। কলেজ থেকে ফেরার পথে বাবু তাকে দেখতেন। একদিন প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন, কিন্তু এলিজাবেথ বাবুর আগের কীর্তি সম্পর্কে জানতেন বিধায় না করে দিলেন। এরপর বাবু দিন দিন বেপরোয়া হয়ে পড়েন। এলিজাবেথের থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাবু রেগে গেলেন। বাবু ওনাকে বলেওছিলেন, তিনি ভালো হয়ে যাবেন কিন্তু এলিজাবেথ রাজি ছিলেন না। বাবুর জেদ চেপে গেল সামান্য এক মিষ্টির দোকানির মেয়ের কাছে তার প্রত্যাখ্যান, মেনে নিতে পারলেন না। একদিন সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশনি শেষে বাসায় ফেরার পথে বাবু তাকে অপহরণ করলেন এবং ধর্ষণ করলেন। এরপর বাবু কলকাতা ছেড়ে দিল্লি চলে গেলেন। এলিজাবেথ গর্ভবতী হয়ে পড়েন, তখন সবাই এলিজাবেথকে নিয়ে ছি! ছি! করল। অনেকে পরামর্শ দিলো বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে। কিন্তু এলিজাবেথ ছিলেন খুব শক্ত মনের একজন মেয়ে মানুষ। উনি এ বাচ্চা বড় করলেন, সমাজ থেকে বেরিয়ে নিজে একাই এ সন্তান মানুষ করলেন। ছেলেকে যেন কেউ অপবিত্র ডাকতে না পারে তাই নাম রাখলেন হলি (পবিত্র)। এদিকে বাবু দিল্লিতে এসেও নারী-মদ নিয়েই থাকলেন। বছর পাঁচেক পরে এসে এ সন্তানের কথা জানলেন। অবশ্য তার ব্যাপারে বাবুর কোনো আগ্রহ ছিল না। এরপর বাবুর পিতাজি মারা যান কিছুদিন পর, মাতাজিও চলে যান। বাবু একা হয়ে পড়েন। বাবার ব্যবসা বাবু শুরু করলেন, ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে লাগল। এলিজাবেথকে দেখলে বাবু পালিয়ে থাকতেন। কিন্তু এলিজাবেথ ছিলেন শত কথা শুনেও মুক্ত স্বাধীন ভয়হীন দ্বিধাহীন এক নারী। বাবু বিয়ে করলেন, কয়েক দিন পর দেখা গেল, বাবুর সাংসারিক ঝামেলা। বাবু ডাক্তার দেখালেন, ডাক্তার বলল, বাবু নপুংসক হয়ে গেছেন। জীবনেও কখনো বাবা হতে পারবেন না। বৌদি বাবুকে ছেড়ে চলে গেল। কখনো এলিজাবেথের সাথে দেখা হলে সে বাবুকে নিয়ে হাসত। এখন সবাই বলতে লাগল, একেই বলে প্রকৃতির শোধ। বাবু লোকের কথা সহ্য করতে পারলেন না। তাই কলকাতা ছেড়ে কেরালায় গিয়ে উঠলেন। এরপর থেকে বাবু এলিজাবেথকে অনেকভাবে সাহায্যের চেষ্টা করলেন, এলেক্সকেও। কিন্তু কখনো তারা বাবুকে পাত্তাই দেয়নি। এলিজাবেথের মৃত্যুর পর বাবু আরো বেশি ভেঙে পড়েন। রামু এরপর চুপ হয়ে গেল, আমিও নিশ্চুপ। সারা যাত্রাপথে রামুর সাথে আর কোনো কথা হয়নি।
আজ রবার্টের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, সেন্ট পল চার্চে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবাই, এলেক্সের ওয়াইফ ও ছেলেমেয়েগুলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে। ফাদার শেষকৃত্যর শ্লোকগুলো আবৃত্তি করছেন। আজ সবাই কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে, এই কালো থেকেই মনে হচ্ছে এক অন্ধকার অনন্তের দিকে হেঁটে যাচ্ছে সবাই।