Naya Diganta
লাঞ্ছনার পর কুয়েটে শিক্ষকের মৃত্যু

ছাত্রলীগকে লাগাম পরান

লাঞ্ছনার পর কুয়েটে শিক্ষকের মৃত্যু

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির নামে নিজেদের আখের গোছানো ও গায়ের জোরে আধিপত্য বিস্তারেই তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। এতে করে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দলাদলির ঘটনা লেগেই আছে। পরিস্থিতি এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ছাত্রলীগ অন্যায়-অনিয়ম, দলাদলি ও খুনোখুনি করবে এটাই স্বাভাবিক বলে সবাই মেনে নিয়েছে। এর মধ্যেও তারা এমন সব ঘটনা ঘটিয়ে বসছে যা প্রায়ই চরম সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। শিক্ষক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার এমন ঘটনা তারা ঘটাচ্ছে, যা নজিরবিহীন। সর্বশেষ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) এক শিক্ষক লাঞ্ছিত অপদস্থ হওয়ার পর প্রাণ হারিয়েছেন।
জানা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের জেরে এ ঘটনা ঘটে। মূলত কুয়েটে ছাত্রলীগের বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের পরিবর্তন হচ্ছে। সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের মধ্যে নতুন করে কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে। এমনই একটি লোভনীয় ও লাভজনক সুবিধা হলো- বিভিন্ন হলের ডাইনিং পরিচালনার কর্তৃত্ব হাতিয়ে নেয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান আছেন বিবদমান পক্ষগুলোর একটির নেতৃত্বে। হলের ডাইনিং পরিচালনার কাজ নিজের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইলকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও লালন শাহ হলের প্রভোস্ট ড. সেলিমকে কয়েক দিন ধরে চাপ প্রয়োগ করছিলেন তিনি। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে, ওই শিক্ষকের সাথে দেখা হলে সেজানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কয়েকজন সদস্য তার সাথে দুর্ব্যবহার করেন। তারা রাস্তা থেকে তাকে অনুসরণ করে তড়িৎ প্রকৌশল ভবনে শিক্ষকের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আধা ঘণ্টা অবস্থান করে গ্রুপটি রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
এ দিকে দুপুরে বাসায় ফিরে ড. সেলিম বাথরুমে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাথরুম থেকে বের না হওয়ায় একপর্যায়ে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করা হয়। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার স্ত্রী সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরেই ড. সেলিম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। ড. সেলিম একজন সৎ ও অমায়িক মানুষ ছিলেন। অন্যায়-অনিয়মকে তিনি প্রশ্রয় দিতে পারছিলেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ অন্যায়ভাবে সুবিধা নিতে চায়। যেগুলো আইনগতভাবে একজন শিক্ষক দিতে পারেন না। ফলে যারাই এমন অন্যায় কর্মকাণ্ডে সাড়া দিতে পারেন না তারা ছাত্রলীগের লাঞ্ছনা, অপমান, এমনকি মারধরের শিকার হন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদকে ছাত্রলীগ পানিতে ফেলে দেয়। চট্টগ্রামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ শিক্ষককে মারধর করে মাটিতে ফেলে কেরোসিন ঢেলে দিতে চায় ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ। অর্থাৎ কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেবে। শিক্ষক নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনার নজির পাওয়া যাবে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। দুর্ভাগ্য, এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাস্তি তো দূরের কথা, ন্যূনতম তিরস্কারেরও ব্যবস্থা নেই।
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের অবনতির অন্যতম কারণ এসব সন্ত্রাস। এ ব্যাপারে সরকারের একেবারে উপরের পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে। কারণ চলমান অবস্থায় শিক্ষার উন্নয়ন হতে পারে না। কুয়েটে ছাত্র-শিক্ষকরা ড. সেলিমের মৃত্যুর সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন সেগুলোরও বিচার হতে হবে। ছাত্রলীগকে লাগাম পরাতে না পারলে তা সরকারের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।