Naya Diganta

ভবন নির্মাণে ফার ও উচ্চতা কমছে না

ভবন নির্মাণে ফার এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমছে না। এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করবে রাজউক। তবে আবাসন ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এখনো কমেনি। রাজউকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ীরা। আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংশোধিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে ‘ফার এরিয়া রেশিও’ নির্ধারণের যেসব বিষয় তারা শুনেছেন, তা রাজউক বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে আবাসন ব্যবসা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই, একই সাথে ব্যক্তিপর্যায়ে যারা ভবন নির্মাণ করতে চান, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একপর্যায়ে আবাসন খাতে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেষ পর্যন্ত উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে যেতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজউকের একটি প্রতিনিধিদল ড্যাপের প্রকল্প পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক, নগর পরিকল্পনাবিদ মো: আশরাফুল ইসলাম গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, সংশোধিত ড্যাপে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। সবার জন্য গ্রহণযোগ্য একটি ড্যাপ করার জন্য রাজউক কাজ করছে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হোক আমরা চাই না। ভবনের উচ্চতা কমানো এবং ‘ফার এরিয়া রেশিও’ পরিবর্তন করা হচ্ছে না। ‘রিহ্যাবের উদ্বেগ নিরসনে সংশোধিত ড্যাপে ফার ও ভবনের উচ্চতা কিভাবে নির্ধারণ করা হবে’ এমন প্রশ্নের জবাবে মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা ড্যাপের কোনো কিছুই অফিসিয়ালি প্রকাশ করিনি। ফার এরিয়া রেশিও ও নির্মাণাধীন ভবনের উচ্চতা কমানোর ব্যাপারে একটি স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়িয়েছে।

মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা এলাকাভিত্তিক ফার নির্ধারণের কথা বলেছি কিন্তু নতুন করে উচ্চতা নির্ধারণ করিনি। তিনি বলেন, রিহ্যাবের নেতৃবৃন্দ এসেছিলেন। তাদের বিষয়টি যৌক্তিক পর্যায়ে বিবেচনা করা যায় কি না আমরা ভেবে দেখছি। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখব। এরই মধ্যে পর্যালোচনা শুরু করেছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে সংশোধিত ড্যাপে। ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারটি স্পষ্ট করতে পারব আশা করছি। মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছু ড্যাপে সংযোজন করা হবে না।’
ফার এরিয়া রেশিও (এফএআর বা ফার) নিয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট আলমগীর শামসুল আলামিনের (কাজল) কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গতকাল রাতে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘রাজউকে আমরা আমাদের বক্তব্য লিখিত আকারে জমা দিয়েছি। ড্যাপের প্রকল্প পরিচালকের কাছে আমাদের উদ্বেগের কথাগুলো জানিয়েছি। আমরা এখন রাজউকের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি। সংশোধিত ড্যাপে ফার এরিয়া রেশিও এবং ভবনের উচ্চতা পরিবর্তন করা হলে আমরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো তাদের জানিয়েছে। রাজউকের সিদ্ধান্ত পেলে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাবো।’

এর আগে গত ৩১ অক্টোবর রিহ্যাব সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছিল, ‘সংশোধিত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) নির্মিতব্য ভবনের ফার এরিয়া রেশিও (ফার) কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে যারা ভবন তৈরি করবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ রিহ্যাব বলছে, ভবন উঠানোর জন্য চার পাশে প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়তে বাধ্য হলেও উপরের দিকে ভবনটি আগের মতো উঁচু করা সম্ভব হবে না ড্যাপে নতুন করে সংশোধনী আনা হলে। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ডেভেলপার কোম্পানি এবং এর সাথে জড়িত দুই শতাধিক পশ্চাৎ শিল্পের (লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রি) ব্যবসা কমে গিয়ে শিল্পগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

রিহ্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘সংশোধিত ড্যাপে নতুন বিধান কার্যকর হলে আগে যে জায়গায় আটতলা ভবন নির্মাণ করা যেত, এখন সেখানে পাঁচতলার বেশি নির্মাণ করা যাবে না।’ রিহ্যাব নেতৃবৃন্দ বলছেন, ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রিহ্যাবের সদস্যরা। কারণ তারা এরই মধ্যে অনেক ভূমি মালিকের সাথে চুক্তি করে রেখেছেন। ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালাতে যেভাবে ফার দেয়া হয়েছে, সেভাবেই ভূমি মালিকদের সাথে চুক্তি করা হয়েছে। ড্যাপে নতুন বিধান পাস হলে ভূমি মালিকদের সাথে মনোমালিন্য হতে বাধ্য। কাউকে কাউকে মামলার সম্মুখীনও হতে হবে।’

আলমগীর শামসুল আলামীন বলেন, ২০০৮ সালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ২০ ফুট রাস্তার পাশে ৫ কাঠা জমিতে ১৩ হাজার ৫০০ বর্গ ফুটের ভবন তৈরি করা যেত। সংশোধিত ড্যাপে ‘ফার এরিয়া রেশিও’ কার্যকর হলে একই ৫ কাঠায় ৯ হাজার বর্গফুটের বেশি পাওয়া যাবে না। ২০ ফুটের ছোট রাস্তার পাশের জমিতে ৩ থেকে ৪ তলার বেশি ভবন তোলা যাবে না। নির্মিতব্য ভবনের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা একই থাকায় একটি ফ্ল্যাটের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাবে। ভবনের আয়তন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় সিরামিক, স্যানিটারি, টাইলস, ইলেকট্রিক ক্যাবল শিল্প, রড-সিমেন্ট শিল্প, পেইন্ট এবং বালু-পাথর ব্যবসায় ধস নামবে, বাড়বে বেকারত্ব। অন্য দিকে ভবনের উচ্চতা কমে যাওয়ায় আবাসনের জন্য ফসলি জমি বেশি ব্যবহার হবে।