Naya Diganta

ইসলামী শাসনতন্ত্রের রূপরেখা

শেষাংশ
তাফসির : আনুগত্য প্রসঙ্গে আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলুল্লাহ সা:-এর পর ‘উলিল আমর’- দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। এই শব্দের সাথে ‘আতিউ’ (বা আনুগত্য করো) শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। এ থেকে ব্যাখ্যা দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রতি আনুগত্য আর ‘উলিল আমর’ যেই হোক না কেন, তাদের প্রতি আনুগত্য এক জিনিস নয়। আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রতি আনুগত্য নিঃশর্ত, ‘উলিল আমর’-এর প্রতি আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ। আবু দাউদ রা: বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘মুসলিমকে তার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক, কর্তৃপক্ষের হুকুম শুনতে ও মানতে হবে, যদি না তাকে পাপের আদেশ দেয়া হয়। যখন তাকে পাপের আদেশ দেয়া হয়, তখন তাতে কোনো শ্রবণ বা আনুগত্য হয় না।’ আনাস রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘শুনুন এবং আনুগত্য প্রদর্শন করুন, এমনকি যদি একজন ইথিওপিয়ান ক্রীতদাস যার মাথা কিশমিশের মতো, তাকে আপনার প্রধান করা হয়। বুখারি এই হাদিসটি লিপিবদ্ধ করেছেন। সহিহ হাদিস মতে, আল্লাহর অবাধ্যতায় কারো আনুগত্য নেই। ‘আনুগত্য কেবল ধার্মিকতায়’। এই হাদিসটি দু’টি সহিহ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আনুগত্য শাসকদের বা তাদের আদেশের জন্য নয় (বুখারি, মুসলিম)। ‘পাপপূর্ণ কাজে আনুগত্য করা হারাম। আনুগত্য কেবল সঠিক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক’ (বুখারি, মুসলিম)।
তাফসির : ‘উলিল আমর মিনকুম’ প্রসঙ্গে
‘উলিল আমর’ কে? শানে নুজুলে বর্ণিত দু’টি ঘটনাতে ‘উলিল আমর’ একজন সেনানায়ক। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে সেনাপতি নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি নিজে নিজে সেনাপতি হননি। আয়াতের ‘উলিল আমর’ সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং, ‘উলিল আমর’ বলতে সেই শাসক, সেই সেনানায়ক, সেই অফিসপ্রধান, সেই কর্মাধ্যক্ষ, সেই শ্রমিক সর্দার বা দলনেতাকে বোঝাবে যিনি বৈধভাবে নিয়োজিত। দেশের শাসক নিয়োগ করেন জনগণ, সেই ক্ষমতা বা আইন বলে তিনি বা তার প্রতিনিধি যোগ্যতা মোতাবেক বিভিন্ন পদে ও দায়িত্বে অন্যদের নিয়োগ দেন। বৈধভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হলে ‘উলিল আমর’ হওয়া যায় না, তার প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন নেই। আর যোগ্যতা যতই থাক, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোনো পদে নিযুক্ত না হলে নিজে নিজে বা অন্ধকারে ‘উলিল আমর’ হওয়া যায় না।
‘উলিল আমর’-এর পরের শব্দ ‘মিনকুম’ মানে তোমাদের মধ্য থেকে। এটি সমষ্টি থেকে বাছাই বা নির্বাচন জ্ঞাপক, এখানে কোনো পরিবার, গোষ্ঠী বা বংশের প্রশ্ন নেই, যোগ্যতাসাপেক্ষে সবার সমান অধিকার। যেকোনো রাষ্ট্রীয় পদ কারো পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত দখলীয় সম্পত্তি নয়। কেউ ক্ষমতা জবরদখল করলে বা নিজে নিজে শাসক সাজলে সেটা ‘মিনকুম’-এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের সাথে যায় না। এখানে ‘আলাইকুম’ বা তোমাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত (যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন), ‘মিন আহলে বাইত’ বা রাসূলুল্লাহ সা:-এর পরিবারের মধ্য থেকে, ‘মিনালকুরাইশ’ বা কুরাইশদের মধ্য থেকে বিশেষণ ব্যবহার না করে ‘মিনকুম’ বা ‘তোমাদের মধ্য থেকে’ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য রাজতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র ইসলামে সিদ্ধ নয়। এখানে সমষ্টিগত স্বার্থ ও প্রশ্ন জড়িত, তাই এর সমাধানও সমষ্টিগত উপায়ে জড়িত। আর এটি পবিত্র কুরআনের দাবি।
আবার কেউ কোনো পদের জন্য লালায়িত হলে ইসলামের বিধানে তিনিও সেই পদের যোগ্যতা হারান। সাহাবি আবু মুসা রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘আমি এবং আমার দুই চাচাতো ভাই নবী করিম সা:-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তাদের একজন বললেন, আল্লাহর রাসূল, আমাদের এমন কিছু দেশের শাসক নিয়োগ করুন যেগুলো সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আপনার তত্ত্বাবধানে অর্পণ করেছেন। অন্যজনও একই রকম কথা বলেন।’ রাসূল সা: বললেন, ‘আমরা এই পদে এমন কাউকে নিযুক্ত করি না যে এটি চায় এবং এমন কাউকে নিযুক্ত করি না যে এর জন্য লালায়িত।’
এভাবে কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায় জনজীবনে কে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে পারেন তার বিবরণ আমরা সংক্ষেপে অথচ সুস্পষ্টভাবে পেয়ে যাই। কিন্তু জটিল প্রশ্ন হলোÑ ‘মতানৈক্য পোষণ করলে তা নিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরণাপন্ন হও’-এর ব্যাখ্যা কী? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শরণাপন্ন হওয়া নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। প্রশ্ন হলোÑ কার সাথে কার বিরোধ কে নিষ্পত্তি করবে? কুরআন ও হাদিসের আলোকে কঠোর নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত কে দিতে পারবে? শুধু কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান থাকলেই কি হবে? বিচারককে জ্ঞানী হতেই হবেÑ এটা প্রথম শর্ত, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা তাকে ঈমানদার, কঠোর নিরপেক্ষ ও সৎসাহসী হতে হবে। পরীক্ষিতভাবে তিনি নিজে কঠোর সত্যের অনুসারী না হলে তার বিচারকের আসনে বসার নৈতিক অধিকার থাকে না। সাধারণের মধ্যে বিরোধ এক কথা, রাজার সাথে প্রজার বিরোধ একেবারে অন্য কথা। কুরআনের আয়াতে শাসকের সাথে শাসিতের বিরোধকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অতএব, সেখানে বিচারক একতরফা শাসক কর্তৃক নিযুক্ত হলে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। সুতরাং কে, কীভাবে বিচার বা ফায়সালা করবেন তার অগ্রিম রূপরেখা নির্ধারণে বিবদমান পক্ষগুলোর মতামত সমান গুরুত্ব পাওয়া আবশ্যক।
আরবের প্রাচীন বিচারব্যবস্থায় কোনো আদালতের অস্তিত্ব ছিল না। বিচারব্যবস্থা ছিল একান্তভাবেই সালিসনির্ভর। ইসলামেও সেই প্রথা প্রবেশ করে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা: গোত্রীয় সমস্যার সমাধানে সালিসকারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের চার খলিফার আমল পর্যন্ত এই মুক্ত বিচারব্যবস্থা বহাল ছিল। ইতিহাস বলে, হজরত আলী রা: এবং গভর্নর মুয়াবিয়ার তীব্র বিরোধ নিরসনেও সালিসের আশ্রয় নেয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস থেকে আমরা এও জানি যে, উমাইয়ারা ইসলামী পতাকা উড়িয়ে আরবের ক্ষমতা দখল করার পর সালিসি ব্যবস্থা বাতিল করে তদস্থলে কাজীর আদালত প্রতিষ্ঠা করে। কাজীর নিয়োগ ও অপসারণের পূর্ণ কর্তৃত্ব আমিরের হাতে রেখে প্রতিষ্ঠিত এই বিচারব্যবস্থায় কাজীরা হয়ে যান শাসকের প্রতিনিধি। কোনো কোনো কাজী সেনাপতি হয়ে যুদ্ধও করতেন। আবার যেকোনো বিরোধে চূড়ান্ত রায় দেয়ার ক্ষমতা আমির নিজের কাছে সংরক্ষণ করতেন, আর তাকে বৈধতা দেয়ার যুক্তি জড়ো করতে হতো কাজীদের। এভাবে যুগে যুগে রাজানুগত কাজীদের রায়ের সমষ্টিগত সঙ্কলন কালক্রমে শরিয়াহ নামের কথিত ইসলামী আইনি বিধানে পরিণত হয়। তাতে শাসকের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ চিরতরে অপসৃত হয়ে যায়। হজরত উসমান রা: ও হজরত আলী রা:-এর খিলাফতের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার, বিতর্ক হওয়ার সুযোগ ছিল, সে সুযোগ উমাইয়া শাসনামলে বাতিল হয়ে যায়। কুরআনের বাণী পড়ে থাকে কুরআনের পাতায়। মানুষের মনে যুগের পর যুগ সঞ্চিত হয় ক্ষোভ ও অভিযোগের পাহাড়।
ইসলামী শাসনব্যবস্থা : আল-কুরআনের আয়াতে শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্ক পরিষ্কার। শাসককে জনগণ কর্তৃক ও উলিল আমরকে অবশ্যই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হতে হবে। শাসক সম্পর্কে জনগণের আপত্তি জানানোর ও প্রতিকার পাওয়ার আইনি অধিকার থাকতে হবে। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় জনগণের দ্বারা ও জনগণের মধ্য থেকে নিয়োজিত শাসক যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী বিধানের আলোকে দেশের শাসন পরিচালনা করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। তবে, যেকোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার অধিকার জনগণের থাকবে এবং জনগণের নিজেদের মধ্যে বা জনগণের সাথে শাসকের বিরোধ দেখা দিলে তার সুরাহার জন্য নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা থাকতে হবে; অবশ্যই কুরআন ও হাদিসের আলোকে সব বিরোধের নিষ্পত্তি করতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব