Naya Diganta

নজরুলের গানে বহু বর্ণিল ও মাত্রিকতায় মহানবী সা:

নজরুলের গানে বহু বর্ণিল ও মাত্রিকতায় মহানবী সা:

১৯৩৭ সাল থেকে কাজী নজরুল ইসলামের সৃজনশীল সঙ্গীত প্রতিভা নতুন এক ধারার সৃষ্টিতে মেতে ওঠে। এ সময়ে তিনি ইসলামী গান রচনা শুরু করেন। এটি তাঁর মৌলিক গান রচনার তৃতীয় পর্ব। এ ধারাটি ত্রিশ দশকের শেষ অবধি চলতে থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম এ পর্বে মনপ্রাণ ঢেলে দেন ইসলামী সঙ্গীত রচনায়। তিনি বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনে যে ইসলামী সঙ্গীতের বীজ বপন করেন তা তাঁর জলসেচনে কালে কালে মহীরুহে পরিণত হয়। মহানবীর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে হামদ ও নাত রচনা করেন তা বাংলা সঙ্গীত জগতের জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বাস বোধ-চেতনা এবং তার শিল্পীত প্রকাশ ছিল সত্য-সহজ-সুন্দর ও শিল্পোত্তীর্ণ। নজরুল মানসে মহানবী সা: নানা মাত্রিকতায় ধরা দিয়েছেন। এক আল্লাহ ও রসূলে প্রগাঢ় বিশ্বাস ও আস্থা না থাকলে এমন সৃষ্টি সম্ভব নয়। নাত-এ রসূলে উচ্চারিত তাঁর সব কথা হৃদয় থেকে উৎসারিত, তা কোনো সাহিত্যিক ঝকমারি নয়।
হজরত মোহাম্মদ সা: যেমন অতীত ও বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়, স্মরণীয়, বরণীয়, অনুসরণীয়, এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের কাছেও ছিল হজরত মোহাম্মদ সা:-এর সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা। রাসূল সা:-এর রূপ, গুণ, কর্মজীবন, শিষ্টাচার, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল কবি নজরুলের শেষ আশ্রয়স্থল। হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বাণী ও আদর্শের বাস্তবায়নসহ ইসলামে বিশ্বাস, পরকালে আস্থা নবীজীকে অবলম্বন করে ইসলামে ভরসা ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে তিনি বাংলা গানে নাত-এ-রসূলের প্রবর্তনা করেন। যা নিঃসন্দেহে একটি নতুন যুগের সূচনা করে। হজরত মোহাম্মদ সা: নজরুলের মনে যতভাবে আন্দোলন ঘটিয়েছেন তার প্রায় সব রকম প্রকাশ পাঠক শ্রোতা তাঁর নাত-এ-রসূলের রূপবৈচিত্র্যে খুঁজে পায়-
আমি যদি আরব হতাম-মদিনারই পথ
এই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবী হজরত ॥
পয়জার তাঁর লাগত এসে আমার কঠিন বুকে
আমি ঝর্ণা হয়ে গলে যেতাম অমনি পরম সুখে
সেই চিহ্ন বুকে পুরে পালিয়ে যেতাম কোহ্-ই-তুরে,
সেথা দিবা-নিশি করতাম তাঁর কদম জিয়ারত॥
মা ফাতেমা খেলতো এসে আমার ধূলি লয়ে
আমি পড়তাম তাঁর পায়ে লুটিয়ে ফুলের রেণু হয়ে।
হাসান হোসেন হেসে হেসে নাচতো আমার বক্ষে এসে
চক্ষে আমার বইতো নদী পেয়ে সে নেয়ামত॥
নজরুলের চেতনায় সাহারা মরুভূমিতে গুলিস্তানের আবাদ হয়েছে নবীজীর আবির্ভাবে। সে জন্য কবি হতে চেয়েছেন আরবের মদিনার পথ। তাঁর বুকের ওপর দিয়ে হজরতের জুতার ছোঁয়ায় তিনি ঝরনার মতো গলে যেতে চেয়েছেন। বুকে মোহাম্মদ সা:-এর পদচিহ্ন নিয়ে কবি পালিয়ে যেতে চেয়েছেন কোহ-ই-তুর পর্বতে। শুধু হজরত মোহাম্মদ-ই নন মা ফাতেমাকেও পথের ধূলি হয়ে তিনি ফুলের রেণুতে পরিণত হতে চান। হজরত মোহাম্মদ সা:-এর দৌহিত্র হাসান, হোসেন এ পথে যখন খেলবেন তখন কবির মনে জলস্রোত বইত এবং চোখে কান্নার নদী বইত। নজরুল নিজেকে মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন পথের অস্তিত্বের সাথে তাতে যদি কিছুটা হলেও মোহাম্মদ সা:-এর উপস্থিতি তিনি অনুভবন করতে পারেন, নজরুল অনুভবে মোহাম্মদ সা: বিপুল, বিচিত্র ও ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে তাঁর রসূলপ্রেম।
আমার ধ্যানের ছবি আমার হজরত।
ও নাম প্রাণে মিটায় পিয়াসা,
আমার তামান্না আমার আশা,
আমার গৌরব আমার ভরসা,
এ দীন গোনাহগার-তাঁহারি উম্মত
ও নামে রওশন জমীন আসমান,
ও নামে মাখা তামাম জাহান,
ও নাম দরিয়ায় বহায় উজান,
ও নাম ধেয়ায় সরু ও পর্বত॥
আমার নবীর নাম জপে নিশিদিন
ফেরেস্তা আর হুর পরী জিন,
ও নাম জপি আমার ভোমরায়
পাব কিয়ামতে তাঁহার শাফায়াৎ॥
কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্যজুড়ে আছেন হজরত মোহাম্মদ সা:। কবির প্রাণের তৃষ্ণা, আশা-ভরসা গৌরব, হয়ে বিরাজ করছেন নবী মোহাম্মদ। নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করেন রাসূল তাঁর চরিত্রের আলোতে আলোকিত করেন জমিন-আসমানসহ সমগ্র পৃথিবী। সমুদ্রের উজানে মরু ও পর্বতে আনে প্রাণের জোয়ার। নজরুল চৈতন্যে মিশে আছে এ নামের ধ্যান যার মাধ্যমে তিনি পাবেন কিয়ামতে শাফায়াৎ বা মুক্তি। এ জন্য তিনি তাঁর ধ্যানের ছবিতে এঁকেছেন মোহাম্মদের নাম। কারণ এ নাম তাঁর পিপাসা মেটায়, তাঁর আশা বা তামান্না পূরণ করে। এ জন্য এ নাম কবির গৌরব ও ভরাস্থল। কাজী নজরুল ইসলাম কতটা গভীর বোধ নিয়ে হজরত মোহাম্মদ সা:-কে ধারণ করেছেন তাঁর হৃদয়ে তা এ নাত-এ স্বয়ং প্রকাশ্য
আমার প্রিয় হজরত নবী কামলীওয়ালা
যাঁহার রওশনীতে দীন দুনিয়া উজালা,
যাঁরে খুঁজে ফেরে কোটি গ্রহ তারা,
ঈদের চাঁদে যাহার নামের- ইশারা
বাগিচায় গোলাব গুল গাঁথে যাঁর মালা॥
আউলিয়া, আম্বিয়া দরবেশ যার নাম,
খোদার নামের পরে জপে অবিরাম
কেয়ামতে যাঁর হাতে কওসার-পিয়ালা॥
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাসূল সা: বিপুলভাবে আভাসিত। নানা মাত্রিকতায় চিত্রিত। নানরূপে গ্রন্থিত। কত মহিমায় রঙিনভাবে বর্ণিত। কতটা সাহিত্যিক মাত্রায় উত্তীর্ণ, ‘মানব চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ’ হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিচিত্র, বর্ণিল উন্নত, মহান, আদর্শিক গুণের যে চিত্তাকর্ষক, কারুকার্যময়, ঐশ্বর্যশালী হৃদ-উদ্বেল বর্ণনা কাজী নজরুল ইসলাম নাতসমূহে দিয়েছেন তা বাংলা ভাষায় এর আগে দুর্লক্ষ ছিল। তাঁর নবী কামলীওয়ালার আলোকে উদ্ভাসিত, উজ্জ্বল পৃথিবী আর কোটি গ্রহ তারা। ধর্মীয় পুরুষেরা তাদের জিকিরে আল্লাহর পরেই জপেন মোহাম্মদের নাম। কাওসারের পেয়ালা হাতে যে মানুষ যিনি কেয়ামতে অপেক্ষা করবেন তাঁর সাহাবীদের তৃষ্ণা মেটাতে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ-যাঁর মহিমা উচ্চারণ করেন তাঁর আলোকিত জীবনকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করতে ব্যাকুল নজরুল।
ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলা নবীন সওদাগর
বদনসীব আয়, আয় গুনাহগার নূতন করে সওদা কর॥
জীবন ভরে করলি লোকসান আজ হিসাব তার খতিয়ে নে;
বিনিমূলে দেয় বিলিয়ে সে যে বেহেশতী নজর॥
কুরআনের ঐ জাহাজ বোঝাই হীরামুক্তা পান্নাতে,
লুটে নে রে, লুটে নে সব, ভোরে তোল তোর শূন্য ঘর।
কেয়ামতের বাজারে ভাই মুনাফা যে চাও বহুৎ
এই ব্যাপারীর হও খরিদ্দার লও রে ইহার সিল-মোহর।
আরশ হতে পথ ভুলে এ এলো মদিনা শহর,
নামে মোবারক মোহাম্মদ পুঁজি আল্লাহ আকবার॥
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নাত-এ-রসূলসমূহে বিচিত্র ভাষায় অসংখ্য প্রতীকে, বর্ণিল রঙে, রূপে হজরত মুহাম্মদ সা:কে উপস্থাপন করেছেন যা নিঃসন্দেহে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। রাসূলের বাণীকে তিনি চিহ্নিত করেছেন শরাব বা মদের সাথে আর রাসূল নিজে হয়েছেন সাকী। অর্থাৎ ইসলামের নেশায় নজরুল নেশাসক্ত রঙিন আঁখির মুসলমান। তৌহিদরূপী যে সুধা তাকে পাগল করেছে তা পান করিয়েছেন দূর মক্কা মদিনার আল কুরআনের গজল গায়ক হজরত মুহাম্মদ সা:। রাসূলের দেয়া ইসলামী শরাব যেমন নজরুলকে করেছে নেশায় আকীর্ণ তেমনি নজরুল পাঠককেও করেছে মন্ত্রমুগ্ধ। বাংলাভাষী মুসলমানেরা নজরুলের কাছ থেকে পাওয়া উপহারে (নাত-এ-রসূল) নতুন করে ইসলামের নানা রঙের বাহারের সন্ধান পেয়েছেন।
তোমার নামে একি নেশা হে প্রিয় হজরত
যত চাহি তত কাঁদি, আমার মেটে না হসরত॥
কোথায় আরব কোথা হিন্দ
নয়নে মোর নাই তবু নিন্দ
প্রাণে শুধু জাগে তোমার মদিনার ঐ পথ॥
কে বলে তুমি গেছ চলে হাজার বছর আগে
আছ লুকিয়ে তুমি প্রিয়তম আমার অনুরাগে।
মোর অন্তরের হেরা গুহায়
আজো তোমার ডাক শোনা যায়
জাগে আমার মনের কাবা ঘরে তোমারি সুরত
হজরত তোমারি সুরত॥
যারা দোজখ হতে ত্রাণের তরে তোমায় ভালোবাসে
আমার এ প্রেম দেখে তারা কেউ কাঁদে কেউ হাসে।
তুমি জান হে মোর স্বামী, শাফায়াৎ চাহি না আমি
আমি শুধু তোমায় চাহি তোমার মহব্বত
হজরত তোমার মহব্বত।
হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রূপে বিভোর সমগ্র পৃথিবী। সে রূপকে রূপায়িত করার সার্থক রূপকার নজরুল। হাজারো আলোয় আলোকিত করে, হাজারো ভাষায় রূপায়িত করে, হাজারো উপমা, রূপক, চিত্রকল্পে আঁকেন তাঁর ছবি। মুহাম্মদ সা:-এর রূপে পৃথিবী যেমনভাবে আমোদিত, রোমাঞ্চিত উদ্বেলিত এবং বিলীন হয়েছে নজরুল তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন যথার্থ শব্দে, ধ্বনিতে ছন্দে অলঙ্কারে। মুহাম্মদ সা:-এর নামের নেশায় বিভোর হয়ে কবি নজরুল
মুহাম্মদের নাম যতই জপি ততোই মধুর লাগে
নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে॥
ঐ নামেরি মধু চাহি
মন-ভ্রমরা বেড়ায় গাহি
আমার কুধা তৃষ্ণা নাহি ঐ নামের অনুরাগে॥
ও নাম প্রাণের প্রিয়তম
ও নাম জপি মজনু সম
ঐ নামে পাপিয়া গাহে প্রাণের কুসুম-বাগে॥
ঐ নামে মুসাফির রাহী
চাই না তখত শাহানশাহী,
নিত্য ও নাম ইয়া ইলাহী, যেন হৃদে জাগে॥
হজরত মোহাম্মদ সা:-এর গুণ বর্ণনায় নজরুল ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাঞ্জল এবং শিল্পোদীর্ঘ। নবীজীর নাম মাহাত্ম্য বর্ণনায় তিনি যেসব চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন তা অভিনব এবং অতুলনীয়। শুধু মোহাম্মদ সা:-এর নামের মধুর সন্ধানে কবির মন ভ্রমরা গান গেয়ে বেড়ায় শুধু নামের অনুরাগে, সৌরভে, রূপে, রসে কবির ক্ষুধা, তৃষ্ণা বোধ লোপ পায়। কবি মোহাম্মদ সা:-এর নাম মজনুর মতো জপ করেন প্রতিনিয়ত। কবির পাশাপাশি পাপিয়া নিজের সুখে গান গায় যার অর্থ নবীর নাম জপ। কবি আশা করছেন শুধু হজরত মোহাম্মদ সা:-এর নাম ছাড়া তিনি কোনো বাদশাহী সিংহাসন চান না শুধু হৃদয়ে নবীজীর নামকে ধারণ করে বাঁচতে চান। পাঠক বা শ্রোতা হিসেবে ভাবতে অবাক লাগে যে একটি নাত-এ কত গভীর রসূলপ্রেম প্রকাশিত হতে পারে।
মোহাম্মদের নাম জপে ছিলি বুলবুলি তুই আগে
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান এমন মধুর লাগে॥
ওরে গোলাপ নিরিবিলি
নবীর কদম ছুঁয়েছিলি
তাঁর কদমের খোশবু আজো তোর আতরে জাগে॥
মোর নবীরে লুকিয়ে দেখে
তাঁর পেশানীর জ্যোতি মেখে,
ওরে ও চাঁদ রাঙলি কি তুই গভীর অনুরাগে॥
ওরে ভ্রমর তুই কি প্রথম
চুমেছিলি নবীর কদম
গুনগুনিয়ে সেই খুশি কি জানাসরে গুলবাগে॥
হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বর্ণনায় বিচিত্র বিষয়ের ব্যতিক্রম উপস্থাপনা দেখা যায় নজরুলের নাত-এ-রসূলে। যেমন বুলবুলি সুরেলা কণ্ঠ এজন্য সুন্দর যে সে সবার আগে রাসূল সা:-এর নাম জপেছিল। গোলাপের এই রূপৈশ্বর্যের কারণ গোলাপ প্রথম নবীজির পায়ের স্পর্শ লাভ করে তাই সে এত সুন্দর ও সুগন্ধি। আকাশের চাঁদ লুকিয়ে নবীর রূপ সৌন্দর্যের সন্ধান পেয়েছিল তাই সে প্রতি পূর্ণিমায় পৃথিবীকে রাঙায়।
ভ্রমর চুমু খেয়েছিল নবীজির পদযুগল। সারা পৃথিবীতে গুনগুনিয়ে সে সুখস্পর্শের বর্ণনা দেয় ভ্রমর। এই যে প্রাণিকুলের মানসিক অবস্থা, এ আমলে নজরুলের রসূলপ্রীতির বহিঃপ্রকাশ।
হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিচিত্র, ব্যাপ্ত, উপস্থিতি প্রকাশে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন প্রকৃতির অনুষঙ্গ। কখনো আসমান, বাতাস, চাঁদ, জোছনা কখনো ফুল, ফল পাখি কখনো ঝরনা নদী, সাগর, পাহাড়ি, সাহারা মরুভূমি। হজরত মোহাম্মদ সা:-এর গুণ বর্ণনাতেও তিনি ব্যবহার করেছেন প্রকৃতির সৌন্দর্যকে যেমন সুরের পাখি বুলবুলি, দোয়েল, চকোর, কোকিল এসব সুমিষ্ট পাখির গানের কণ্ঠের সৌন্দর্য তুলনায়িত হয়েছে। গোলাপ ফুলের অনুষঙ্গ সৌন্দর্য ও সুবাসের কারণে উঠে এসেছে বারবার। খোরমা, খেজুর, বাদাম জাফরান ফল অর্থাৎ আরব দেশের প্রচলিত ফল নবীর উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। এমনি কিছু নাত-এ-রসূলের দু-লাইন করে উপস্থাপন করা হলো :
ক. নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহাম্মদ বোল,
যে নাম নিয়ে চাঁদ-সেতারা আসমানে খায় দোল।
খ. মরু সাহারা আজি মাতোয়ারা হলেন নাজেল
তাহার দেশে খোদার রসূল
যাহার প্রেমে যাহার ধ্যানে সারা দুনিয়া দিওয়ানা
প্রেমে মশগুল॥
গ. ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়॥
ঘ. আসিছেন হাবিবে খোদা আরশ পাকে তাই উঠেছে শোর
চাঁদ পিয়াসে ছুটে আসে আকাশ পানে যেমন চকোর॥
ঙ. ওরে ও চাঁদ উদয় হলি কোন জোছনা দিতে
দেয় অনেক বেশি আলো আমার নবীর পেশানীতে॥
চ. সাহারাতে ফুটলো রে ফুল রঙিন গুলে লালা
সেই ফুলেরি খোশবুতে আজ দুনিয়া মতোয়ালা॥
ছ. হে মদিনার বুলবুলিগো গাইলে তুমি কোন গজল
মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাব দল॥
জ. মরুর ধূলি উঠল রেঙে রঙিন গোলার রাগে
বুলবুলিরা উঠল গেয়ে মক্কার গুলবাগে॥
ঝ. রসূল নামের ফুল এনেছি রে আয়, গাঁথবি মালা কে
এ মালা দিয়ে রাখবি বেঁধে আল্লা তালাকে॥
ঞ. নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া সে এলো মক্কায় আমিনার
ফাগুন পূর্ণিমা নিশীথে যেমন আসমানের কোলে কোলে॥
ট. মদিনাতে এসেছে সই নবীন সওদাগর
সে হীরা জহরতের চেয়ে অধিক মনোহর॥
ঠ. তোমার নামে এ কী নেশা হে প্রিয় হজরত
যত চাহি ততো কাঁদি আমার মেটে না হসরত॥
ড. হেরেমের বন্দিনী কাঁদিয়া ডাকে তুমি শুনিতে কি পাও?
আখেরি নবী প্রিয় আল আরাবি বারেক ফিরে চাও॥
ঢ. হেরা হতে হেলে দুলে নুরানী তনু ও কে আসে হায়
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়
সে যে আমার কমলিওয়ালা কমলিওয়ালা॥
কাজী নজরুল ইসলাম রাসূলের রূপতৃষ্ণায় বিভোর ছিলেন। তার চিন্তা-চেতনা বোধ বিশ্বাসে এমনভাবে মহানবীর উপস্থিতি যে নাত-এ-রসূলই তার উপযুক্ত প্রকাশ। যেদিকে কবির দৃষ্টি সেদিকেই মোহাম্মদ সা: অর্থাৎ চৈতন্যে মিশে থাকা যে মহামানব তাঁরই যেন স্পর্শ সর্বখানে :
ক. মোহাম্মদ মোর নয়নমণি মোহাম্মদ নাম জপমালা
ঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসারের পিয়ালা॥
খ. হে প্রিয়নবী রসূল আমার
পরেছি আভরণ নামেরই তোমার॥
গ. নামাজ রোজা হজ জাকাতের পসারিণী আমি
নবীর কলমা হেঁকে ফিরি পথে দিবসযামী॥
ঘ. নাই হলো না বসনভূষণ এই ঈদে আমার
আল্লা আমার মাথার মুকুট রসূল গলার হার॥
ঙ. আল্লাহ থাকেন দূর আকাশে নবীজী রয় প্রাণের কাছে
প্রাণের কাছে রয় যে প্রিয, সেই নবীরে পরাণ যাচে॥
চ. লহ সালাম লই, দ্বীনের বাদশা, জয় আখেরি নবী
পীড়িত জনের মুক্তি দিতে এলে হে নবীকুলের রবি॥
ছ. যে রসূল বলতে নয়ন ঝরে সেই রসূলের প্রেমিক আমি
চাহে আমার হৃদয় লায়লী, সে মজনুরে দিবসযামী॥
জ. হে মোহাম্মদ এসো এসো আমার প্রাণে আমার মনে
এসো সুখে এসো দুখে আমার বুকে মোর নয়নে॥
কাজী নজরুল ইসলামের গানে বিপুল; বিশাল জায়গাজুড়ে মোহাম্মদ সা:-এর উপস্থিতি। কত রূপে, কত রঙে, কত মাত্রিকতায় চিত্রিত। কত মহিমায় আদিগন্ত রঙিনভাবে বর্ণিত যা সর্বতোভাবে সাহিত্যিক মাত্রায় উত্তীর্ণ।
কতভাবে, ভঙিমায়, রূপকে, চিত্রকল্পে নিবেদিত আর কত না ঐশ্বর্যময় ভাষায় প্রকাশিত কত না বহু বর্ণিল ভাষার অলঙ্কারে সুসজ্জিত তা এসব নাত-এ-রসূল বিশ্লেষণ না করলে বোঝা যায় না। রসূল সা:-এর রূপে, ধর্মীয় আচরণ। তাঁর ঐশ্বর্যময় উপস্থিতি, তাঁর মানবপ্রেম, আল্লাহর নৈকট্য, মহান আদর্শ, কল্যাণকামী মানসিকতার-চিত্তাকর্ষক, কারুকার্যময়, ঐশ্বর্যশালী হৃদ-উদ্বেল বর্ণনা কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর উপযুক্ত নাত-এ-রসূলগুলোতে দিয়েছেন, যা বাংলা ভাষায় এর আগে দুর্লক্ষ ছিল।
মূলত ইসলামী বাংলা গানের প্রবক্তাই ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নাত-এ-রসূলের মধ্য দিয়ে রাসূলকে ধারণ করতে চেয়েছেন প্রতি অঙ্গের রুধির ধারায়, মননে, বিশ্বাসে, নিঃশ্বাসে, প্রজ্ঞায়। হজরত মোহাম্মদ সা:-এর পবিত্র, নিষ্কলুষ, আদর্শবান, পরম শিক্ষণীয়, পরিশীলিত, সুন্দর, অনুসরণযোগ্য, কল্যাণকর যে জীবন কাজী নজরুল ইসলামের হৃদয়পটে আঁকা রয়েছে তারই শিল্পিত উপস্থাপন হয়েছে তাঁর নাত-এ রসূলগুলোয়। সাহিত্যিক ও প্রায়োগিক বিচারে যা উচ্চমার্গীয়। নজরুলের কাছে মহানবীর বাণী, কর্ম, অনুমোদন, আচরণ সবই শাশ্বত সুন্দর। ফলে তিনি এসব সঙ্গীত রচনা করেছেন সযত্নে। স্বমহিমায় এসব নাত হয়েছে ভাস্বর।