Naya Diganta

অ্যালগরিদম যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আপনার অনলাইন জীবন

অ্যালগরিদম যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আপনার অনলাইন জীবন

এই পৃথিবীতে বর্তমানে আরেক নতুন পৃথিবী তৈরি হয়েছে যার নাম ভার্চুয়াল পৃথিবী, যেখানে আছে আকাশের মতো সীমাহীন ইন্টারনেট, ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যম এবং গুগলের মতো বহু সার্চ ইঞ্জিন।

কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের মতো ডিজিটাল সামগ্রীকে ঘিরে এই জগত আমরা তৈরি করেছি, আমাদের চারপাশের ভৌত বাস্তব পৃথিবীতে নয়, এর অবস্থান এক সমান্তরাল ভার্চুয়াল বা অপার্থিব জগতে। সেখানেই আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে: তাদের ছবি দেখছি, শুভেচ্ছা বিনিময় করছি, কথাবার্তা বলছি, এমনকি ওই জগতে নতুন নতুন বন্ধুও তৈরি হচ্ছে।

ভার্চুয়াল এই জগত পরিচালনা করার মূলে যা রয়েছে তা হচ্ছে গাণিতিক কিছু নির্দেশনা, কম্পিউটারের পরিভাষায় যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমই ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিম মাধ্যম এবং গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফেসবুকের সাবেক একজন কর্মী ফ্রান্সেস হাওগেন। যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটর এক কমিটির কাছে দেয়া বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেছেন - ফেসবুক এবং তাদের অ্যাপগুলো শিশুদের ক্ষতি করছে, বিভেদ বাড়াচ্ছে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এবছর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ফিলিপিনো সাংবাদিক মারিয়া রেসাও বলেছেন ঘৃণা ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।

ফেসবুক অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অ্যালগরিদম কী
অ্যালগরিদম হচ্ছে যে কোনো কাজের প্রণালী বা ধাপে ধাপে কোনো কিছু করার প্রক্রিয়া। রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে এর তুলনা দিয়ে এটি সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ভাত রান্না করার সময় প্রথমে একটি পাত্রে চাল নেয়া হয়, তার পর তাতে পানি ঢালা হয়, চাল কয়েকবার ধোওয়ার পর সেটি রাখা হয় চুলার ওপরে, তার পর চুলা জ্বালাতে হয়- এই প্রক্রিয়াটিই অ্যালগরিদম।

আয়ারল্যান্ডে তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্‌মুদ, যিনি ডাবলিনে চিকিৎসা ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত আমেরিকান একটি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হেলথ গ্রুপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বলছেন, ‘কম্পিউটারকেও একটি কাজ করার জন্য ওই কাজটিকে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করে দেয়া হয়, যাতে কম্পিউটার সেটা সহজে বুঝতে পারে এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে।’

মাহমুদ বলেন, ‘কম্পিউটার নিজে কোনো কাজ করতে পারে না। তবে তার রয়েছে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। তাকে কিছু পদ্ধতি বলে দেয়া হয় যাতে সে তার খুব কম বুদ্ধি দিয়ে (কিম্বা তার কোন বুদ্ধি নেই) কাজটা সম্পাদন করতে পারে। প্রক্রিয়াগুলো সূক্ষ্ম ও সরলভাবে দেয়া থাকে যেন কাজটা সে কিছু গাণিতিক ধাপের মাধ্যমে শেষ করতে পারে। এসব নির্দেশনাই অ্যালগরিদম।

সামাজিক মাধ্যমে কীভাবে কাজ করে
সাাজিক মাধ্যমে অ্যালগরিদমের ব্যবহার নিয়ে সম্প্রতি অনেক আলোচনা হচ্ছে। কারণ এসব মিডিয়াতে মানুষ কোনো খবর দেখতে পাবেন বা পাবেন না সেটা এই অ্যালগরিদমের মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে। নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন, ‘অ্যালগরিদম এখন অনেক দূর এগিয়েছে, অ্যালগরিদম অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেসব সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা চলছি।’

একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে অনেক সময় একজনের প্রোফাইল দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয় - তিনি কি আপনার বন্ধু? এটা কীভাবে করা হয়? ফেসবুক কেমন করে বুঝলো যে এই ব্যক্তি আমার বন্ধু হতে পারেন? অনেক জটিল কিছু অ্যালগরিদম দিয়ে এই কাজটা করা হচ্ছে।’

কিন্তু এটা কি শুধু অ্যালগরিদমের নেয়া সিদ্ধান্ত নাকি এর পেছনে মানুষেরও কোনো ভূমিকা আছে? তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্‌মুদ বলছেন, হ্যাঁ বা না, এই প্রশ্নের এরকম সহজ কোনো উত্তর নেই। কারণ যে ব্যক্তি অ্যালগরিদম ডিজাইন করছেন, তৎকালীন সময়ে তার জানা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

মাহ্‌মুদ বলেন, ‘ধরা যাক ফেসবুকে আপনার যিনি বন্ধু, তার বন্ধুরাও আপনার বন্ধু হতে পারে। অ্যালগরিদমকে বলা হলো একজন ব্যক্তির যে বন্ধু রয়েছে, তার যারা বন্ধু, তাদেরকে তুমি বলো যে তারাও তার বন্ধু হতে পারে। কিন্তু ধরা যাক যিনি অ্যালগরিদম ডিজাইন করেছেন তার হয়তো জানা ছিল না যে চাকরির সূত্রে, কিম্বা একই পাড়ায় থাকার কারণে, অথবা একই স্কুলে পড়ার কারণেও বন্ধু হতে পারে।’

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়াটি ক্রমাগতই আপডেট করা হচ্ছে যার ফলে সময়ের সাথে অ্যালগরিদমও আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে। ফলে অ্যালগরিদম নাকি মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে - সেটি স্পষ্ট করে বলা কঠিন। অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের করা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করেই অ্যালগরিদম তার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

‘মানুষ যে বিষয়গুলো সহজে হিসাব করতে পারছে না অ্যালগরিদম সেই কাজটা দ্রুত করে দিতে পারছে। যেমন এক ব্যক্তি এক লক্ষ মানুষ থেকে তার বন্ধুকে খুঁজে বের করতে পারে না। কিন্তু অ্যালগরিদম মুহূর্তের মধ্যেই সেটা করতে পারছে।’

তবে বর্তমানে এমনভাবে অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে কম্পিউটার নিজেও সময়ের সাথে সাথে ডিজাইনার ছাড়াই নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারছে। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হচ্ছে যাকে বলা হয় মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং কিম্বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অ্যালগরিদম যখন নতুন কোনো তথ্য পায় তা থেকেও সে শিখতে পারে। কারণ কিভাবে শিখতে হবে এটাও তাকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছে।

নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন,‘একটা ছোট্ট শিশুকে প্রথমে আমরা কিছু শব্দ শিখিয়ে দেই, তার পর সে নিজে নিজেও কিছু শব্দ শিখতে পারে, এসময় হয়তো ভুলও করে, তখন আমরা তাকে ঠিক করে দেই, আবার সে ভুল করে- অ্যালগরিদমকে এভাবেও ভাবা যায়।

অ্যালগরিদম কি ভুয়া খবর ঠেকাতে পারে?
অ্যালগরিদম যাতে ভুয়া খবর বা ঘৃণা ছড়ায় এমন সব খবর চিনতে পারে সেজন্য অনেক গবেষণা চলছে। এখনো পর্যন্ত যা জানা যায় তা হচ্ছে অ্যালগরিদম কিছু কিছু ক্ষেত্রে এধরনের খবর শনাক্ত করতে পারছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারছে না।

তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন, ‘ভুয়া খবর পড়ে একজন শিক্ষিত মানুষও মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারেন না যে এটি বানোয়াট নাকি সত্য ঘটনা। কারণ এসব খবর বাস্তবের মতো করেই লেখা হয়। অ্যালগরিদমও সেটা বুঝতে পারে না। কিন্তু অ্যালগরিদমের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে। তার পক্ষে সম্ভব এক মুহূর্তের মধ্যে আরো এক লাখ উৎস থেকে এই খবরের সত্যতা যাচাই করে ফেলা, যা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।’

তাহলে ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া খবর কিভাবে ছড়াচ্ছে?

অ্যালগরিদমের কারণেই প্রথমে এই খবরটি ছড়িয়েছে। কারণ এটি ভাল না খারাপ, ভুয়া নাকি আসল- সামাজিক মাধ্যম সেটা সহজে বুঝতে পারে না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এসব খবরের ওপর নজর রাখার দায়িত্ব পালন করলো কীনা সেই প্রশ্নটা এখানে চলে আসে।

নাসিম মাহ্‌মুদ বলছেন, ভুয়া খবর জানার পর কর্তৃপক্ষ ওই অ্যালগরিদমকে উন্নত করার কোন পদক্ষেপ নিয়েছিল কীনা - সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘ওই যে একজন শিশুর কথা বলেছিলাম, সে যখন ভুল করছে তখন আমরা তাকে থামিয়েছিলাম কীনা! যদি না থামাই তাহলে শিশুটির ভুলের জন্য আমাকে দায়িত্ব নিতে হবে।’

কোনো খবরের ব্যাপারে বহু মানুষ যখন রিপোর্ট করে তখন অ্যালগরিদম বুঝতে পারে যে এই খবরটিতে সমস্যা রয়েছে। তার পর থেকে অ্যালগরিদমই এই খবরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অ্যালগরিদমের নেটওয়ার্ক এখন এতো বেশি বিস্তৃত, আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে গাণিতিক এসব নির্দেশনাই যেন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে।

একজন ব্যক্তি কী করেন, কখন কোথায় থাকেন, কী খেতে পছন্দ করেন, তার সামাজিক মর্যাদা কী, তিনি কোন ফুটবল ক্লাবকে সমর্থন করেন- তার সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার থেকে অ্যালগরিদম এসব কিছু জেনে যায়।

ধরা যাক কেউ একজন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় হয়তো বললো যে তার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছে। পরদিন দেখা গেল ফেসবুকে তাকে বিরিয়ানির বিজ্ঞাপন পাঠানো হচ্ছে এবং তিনি বিস্মিত হলেন যে তার কথা আড়ি পেতে শোনা হয়েছে কীনা!

এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। একটি কারণ হতে পারে যে আড্ডায় উপস্থিত কোনো একজন বন্ধু হয়তো অনলাইনে বিরিয়ানি কিনেছেন। তখন অ্যালগরিদম হিসেব করে দেখেছে যে ওই বন্ধুর সাথে তিনি গতকাল বিকেলে আড্ডা দিয়েছেন, হয়তো তারও বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছে হতে পারে, এবং একারণেই তাকে বিরিয়ানির বিজ্ঞাপন পাঠানো হয়েছে।

নাসিম মাহ্‌মুদ বলেন, ‘আমরা কিভাবে ভাবছি, এবং কিভাবে ভাববো, এই বিষয়গুলোও মনে হচ্ছে কেউ ডিজাইন করে দিচ্ছে। আমি কোন খবরটা দেখবো এবং কোনটা দেখবো না সেই সিদ্ধান্তও হয়তো অন্য কেউ নিচ্ছে।’

ফেসবুকে কেউ যদি কোন থ্রিলার বই-এর খোঁজ করেন এর পর থেকে ফেসবুক তাকে থ্রিলার বই-এর খবর পাঠাতে থাকবে। এবং তিনি শুধু এধরনের বই-ই পড়তে থাকবেন। ভয়টা এখানেই- তিনি হয়তো জানতেও পারবেন না যে থ্রিলারের বাইরেও রোমান্টিক ও অ্যাডভেঞ্চার ধরনের বই রয়ে গেছে।

তবে সুখবর হচ্ছে যারা অ্যালগরিদমের ডিজাইন করছেন তারা এখন সামাজিক মাধ্যম থেকে এধরনের বাবল বা বৃত্তের ভেতর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন।

সূত্র : বিবিসি