Naya Diganta

ব্রাহ্মণচরের প্যাঁচের ইতিকথা

মেঘনা ও এর শাখা-প্রশাখাবেষ্টিত ৬০ বর্গমাইল আয়তনবিশিষ্ট একটি দ্বীপ, নাম ‘ব্রাহ্মণচরের প্যাঁচ’। নামটি সর্বজনস্বীকৃত না হলেও প্রবীণদের মতে, এককালে দ্বীপের এককোণে ছিল ব্রাহ্মণ ঠাকুরদের বাস। তাদের নামে গাঁয়ের নাম হয় ব্রাহ্মণচর। গাঁয়ের পাশেই বাজার। বাজারের উত্তর-পূর্ব দিকে ছিল ইংরেজদের নীলকুঠি। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে গ্রামটি ভাঙনকবলিত হয়। ভাঙনে গ্রামটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও নামটি রয়ে যায়। তাই অনেকের কাছে দ্বীপটির নাম ‘ব্রাহ্মণচরের প্যাঁচ’।

দ্বীপটি দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন মূল ভূখণ্ডের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সুযোগ-সুবিধা থেকেও। দ্বীপের বুকে গুমড়ে মরছে অর্ধসহস্র বছরের বঞ্চনার হাহাকারসহ জমাট বাঁধা অশ্রু। জাগলে স্বপ্নের স্মৃতি যে কারণে মনে থাকে না, সে কারণে আগত প্রজন্মও বিগত প্রজন্মের হাহাকারসহ ভুলে যাবে দ্বীপের আত্মপরিচয়ও।

৫০০ বছরের প্রচ্ছন্ন সহস্র কথন থেকে দু-চার ফোঁটা অশ্রু নিম্নরূপ
১. নায়েক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। বিডিআরের অপরাজিত স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কুস্তি খেলোয়াড়। বিদেশ থেকে শক্তি প্রদর্শন করে ছিনিয়ে এনেছেন অর্ধডজন পদক। চাকরিসূত্রে থাকেন রাজধানীতে। সুখের সংসার। স্ত্রী মোসাম্মৎ নাসিমা আক্তার, দুই শিশুকন্যাসহ দ্বীপের মাঝে বাস।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সন্তানসম্ভবা স্ত্রী অসুস্থ মর্মে খবর পান জামাল। সাথে সাথে রওনা হন। দ্বীপে হাঁটা ছাড়া বিকল্প নেই। বাড়ি পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। স্ত্রীকে জরুরি হাসপাতালে নেয়া দরকার। সকাল না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার দূরে লঞ্চঘাট। ফজরের আজানের সাথে সাথেই বের হন। স্ত্রী স্বামীর কাঁধে ভর করেও হাঁটতে পারছেন না। সময় কম, স্ত্রীকে টান দিয়ে কাঁধে তুলে স্বামী ছুটলেন লঞ্চঘাটের দিকে। ৯ বছরের শিশুকন্যাও মা-বাবার সাথে। ফ্যাল ফ্যাল করে একবার বাবার দিকে আবার মায়ের দিকে তাকায়, আর দৌড়ায়। জমির আঁকাবাঁকা ও উঁচুনিচু কাঁচাপথ। ঝাঁকুনিতে রক্তক্ষরণ বাড়তে থাকে। স্বামীর কাঁধে ভর করা স্ত্রীর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর, ‘আমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়ার তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও। শরীর ঝিমঝিম করছে।’ নদী পার হয়ে সিঅ্যান্ডবি গিয়ে স্কুটার চালককে, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বিডিআর হাসপাতালে পৌঁছে দাও। সেখানে আমার পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ সেবাসহ চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে।’ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে স্কুটার। যাত্রাবাড়ী গিয়ে থামতে হয়। রাস্তায় যানজট। সামনে পেছনে সব পথ বন্ধ। রক্তে স্ত্রীর পরিধেয় বস্ত্র ভিজে গেছে। আর সহ্য হয় না। ডান কাঁধে তুলে নিলেন প্রিয়তমা স্ত্রী নাছিমাকে বাম হাতে কন্যা সেতু। সময়মতো পৌঁছতে না পারলে... না না আর ভাবতে পারছে না!

একবিংশ শতাব্দীতে এসে এক হাতে শিশুকন্যা, কাঁধে রুগ্ণ স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন স্বামী। যানজট শেষে আবার স্কুটার। যখন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছে তখন সব শেষ। শিশুকন্যা ‘মা মা’ শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে নাছিমার স্পন্দনহীন শীতল বুকে।’ (মেঘনা ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা নং ২৯)

২. দ্বীপের বৃহত্তর বৈশাখী মেলা। স্থান বৈদ্যনাথপুর। আমরা বলতাম গাছতলা। শৈশবে সারা বছর গাছতলায় প্রতীক্ষায় থাকতাম। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল তিনেক দূরে বৈদ্যনাথপুর। দু’টি গ্রাম ও তিনটি মাঠ পার হয়ে তারপর খাল। খাল পার হলেই গাছতলা। খালের ওপর ভাঙা সাঁকো নিচে এক হাঁটু কাদা। সাঁকোর একপাশে হাত রাখার বাঁশ। বুড়ো দাঁতের মতো নড়বড়ে খুঁটি। মাঝখানে দড়ি দিয়ে বাঁধা একজোড়া কাঠ। সাঁকোয় উঠতে গেলেই কাঠ নড়তে শুরু করে। ভয়ে বসে পড়তে হয়। নিচের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে অনেকেই ফিরে আসে। সাধারণত কেউ সাঁকো ব্যবহার করে না। বীরত্ব প্রদর্শন করতে গিয়ে দু-চারজন কাদাজলে পড়ে হাসির খোরাক হয়। কাদাজলের ওপর দিয়ে পার হতে গিয়ে নাকাল অস্থায় বৈশাখের আনন্দটাই মাটি হয়ে যায় (১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়া দিগন্ত, ‘বৈদ্যনাথপুরের বৈশাখী মেলার অংশ)।

৩. দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম পাশ ঘেঁষে নদী থেকে শুরু হয় বালু উত্তোলন। ৮-১০ ফুট গভীর জলে লগি পুঁতে বালু তুলছে শত শত ডিঙি নৌকা। বালতি হাতে একজন ডুব দেয়। বালুসহ ভুশ করে ভেসে ওঠে। ভাঙতে শুরু করে নদীর ক‚ল। (‘মেঘনায় ভাঙন’ শিরোনামে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের অংশ)-এর মধ্যেই কয়েকটি গ্রামসহ কয়েক শ’ একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে নদীতে।

৪. ১৯৬২ সালের রমজান মাস। হাড়কাঁপানো শীত। এক দিকে শীত আরেক দিকে মহামারী আকারে শুরু হয়েছে কলেরা। ভয়ঙ্কর রোগ কলেরা আর বসন্ত। তখন কারো কলেরা দেখা দেয়ার অর্থ, নির্ঘাত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। গ্রামের পর গ্রাম বিরান হয়ে যেত কলেরা-বসন্ত উপদ্রæত এলাকায়। (৪ জুন ২০২০ দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়ের অংশ)

এরকম সমস্যাসঙ্কুল অবস্থায়ও বাড়ছে দ্বীপের বসতি। কারণ বারো মাসে তেরো পার্বণ ছাড়াও সন্ধ্যার পরই পাড়ায় পাড়ায় বসে পুঁথিপাঠ, জারিগান, পালাগান ও গল্পদাদুর আসর। প্রধান খেলা হাডুডু ও কুস্তি। দেশের সর্বোচ্চ স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কুস্তিগীর জামাল উদ্দিনের জন্ম এ দ্বীপেই।

মেঘনার পলি মাটিতে গড়া দ্বীপ। মাটিতে বীজ পড়লেই অঙ্কুর গজিয়ে ওঠে। নির্মল বায়ু, মাছ আর ফসলের ভাণ্ড এ দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে খাল-বিল ও ডোবা-নালা। দিগন্তপ্রসারী ফসলের মাঠ। বর্ষায় ভরসা নৌকা। ঘোমটা টানা নাইওরি নিয়ে ছোট ছোট নাও চলাচলের মনোরম দৃশ্য। আমনের ক্ষেতে কোড়ার টুলুপ টুলুপ ডাক, বিলে জলচর পাখি, শাপলা-শালুকের ছড়াছড়ি। পানিতে কিলবিলরত মাছ আর মাছ। মাছ খেতে সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসে অতিথি পাখি। নীল আকাশের গলার মালা বলাকার ঝাঁক। আসে পাখি শিকারি। বন্দুকের গুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত পাখির ওড়াউড়ির দৃশ্য। বিধাতার অকৃপণ হাতে সাজানো দ্বীপের নিসর্গ দেখে মনে পড়ে ইংরেজ কবি William Cowper-এর 'God made the country, and man made the town'.

নিসর্গের লীলাভূমি দ্বীপটি মেঘনার বুকে ভেসে ওঠার কাহিনীও রোমাঞ্চকর। পালতোলা সওদারি ডিঙ্গি, পারাপারে গয়নার নৌকা, বজরা ও সাহসী জেলে ছাড়া ছোট নৌযান খুব একটা চোখে পড়ত না। কথিত আছে যে, ‘জনার্ধন কৈবর্ত জলে জাল ফেলার সময় হুঁকার কল্কি পড়ে যায়। সঙ্গীয় জেলে নেমে ডুব দেয়। দেখেন কাছেই নদীর তলদেশ।

একসময় কূলবর্তী এলাকা ছিল জলদস্যুকবলিত। হজরত দানেশমন্দ রহ: ইরান থেকে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে এসে জলদস্যু দমনের পর জনগণের অনুরোধে রয়ে যান সোনারগাঁওয়ে। হজরত দানেশমন্দ রহ: নদীপথে যাওয়ার সময় ডুবোচরে আটকে যায় বজরা। যেখানে বজরা আটকে যায় সেখানে একটি ডালা গাড়েন। ডালাগাড়া স্থানটি-ই কিনা মানিকারচর। হজরত দানেশমন্দ রহ:-এর মাজার রয়েছে মোগড়াপাড়া। মাজারে স্থাপিত শিলালিপিতে তার জন্ম-মৃত্যু ১১৬৮-১২৬৩ উল্লেখ আছে। এ তথ্য থেকে অনুমান করা যায়, দ্বীপটি জাগতে শুরু করেছিল কমবেশি ৭০০ বছর আগে।

আনুমানিক ৪০০ বছর আগে ব্রাহ্মণ, গোবিন্দ, চন্দন ও বড়কান্দা নামে চার সহোদর দ্বীপের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। তাদের নামানুসারে চার গ্রামের নামকরণ হয়। পরবর্তীতে এই নামানুসারেই নামকরণ হয় চার ইউনিয়নের। দ্বীপের কোনো কোনো এলাকা ছিল ঝোপঝাড় পূর্ণ। বসতি স্থাপন ও ফসলের জমি বৃদ্ধির জন্য ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে ছোট্ট একটি মসজিদ বেরিয়ে আসে। মনিরুদ্দিন মুন্সির মাজারসংলগ্ন মসজিদটি আবিষ্কার করেন মনিরুদ্দিন মুন্সির দাদা বেচু বেপারি। অনেকের মতে, মসজিদটি মোগল আমলে নির্মিত। ১৬৫৮ সালে বাহাদুর গড়ের যুদ্ধে সুজা তৎভ্রাতা দারা কর্তৃক পরাজিত হয়ে বাংলায় পলায়ন করেন। নৌপথে যাওয়ার সময় চিহ্ন হিসেবে এরকম আরো অনেক স্থাপনা নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরো একটি প্রাচীন নিদর্শন ছিল তালুকের পশ্চিম পাশের একটি মঠ। কারো কারো মতে মঠটি জনার্ধন কৈবর্তের নির্মিত। মঠ থেকে ধারণা করা হয় একসময় এখানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকও বাস করত। মঠটি বছর পঞ্চাশেক আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাঘাইকান্দি মাঠের পশ্চিম দিকে বটগাছের তলায় ইউসুফ পীরের মাজার। মাজারের এখানেই দরগাবাড়ি খেয়াঘাট। এখান থেকে বৈদ্যেরবাজার পর্যন্ত খেয়া চলাচল করত। বটগাছটির বয়স শ’ তিনেক বছর। এটিই এ দ্বীপের প্রাচীন গাছ বলে জানা যায়। বটগাছটির পূর্ব দিকে একটি পুরনো আমগাছ। এর তলায় আড়াইবাগ দরবার শরিফে রয়েছে ফাজলিন শাহ রহ:-এর মাজার। হজরত শাহজালাল রহ:-এর সাথে যে ৩৬০ জন সহচর এসেছিলেন, ফাজলিন শাহ রহ: তাদেরই একজন বলে জানা যায়।

গোবিন্দপুর গ্রামে রয়েছে সামন্তযুগের স্থাপনা। গোবিন্দপুরের জমিদাররা কলকাতা থেকে নির্মাণসামগ্রী এনে এসব ভবন নির্মাণ করেন। সবচেয়ে পুরনো ভবনটি ঈশ্বর সাহার। এটির পশ্চিমে শানবাঁধানো ঘাট। ঈশ্বর সাহার ভবনের দক্ষিণে নদের চাঁদ ও হরিমোহন সাহার ত্রিতল বাড়ি। পাশেই মথুরামোহন সাহার ভবন। ভবনটির গাঁয়ে ১৩২১ বাংলা ৬ কার্তিক লেখা। এসব পুরনো ভবন দেখলে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিতপাষাণ’ গল্পের কাহিনী মনে পড়ে। গোবিন্দপুরের পেরীমোহন সাহা, জগৎচন্দ্র সাহা, পার্বতীচরণ রায় জমিদার ছিলেন। তালুকদার ছিলেন গণ্ডীরাম সাহা ও সনাতন সাহা। তালুকদারির জন্য বার্ষিক ৫০০ টাকা কর দিতে হতো। আনুমানিক আড়াই শ’ বছর আগে সোনারগাঁও থেকে ছয়টি পরিবার এসে তালুকদারি ইজারা নেন। জমিদার হীরালাল চক্রবর্তী ও কেদারনাথ চক্রবর্তী এসেছিলেন বিক্রমপুর থেকে। ব্রাহ্মণচর বাজারে হীরালাল চক্রবর্তীর কাচারি ছিল।

মানিকারচরের মনিরুদ্দিন মুন্সি ৯৯ বছর বয়সে ১৩৪১ বাংলা ইন্তেকাল করেন। তার দাদা বেচু বেপারি। বেচু বেপারির বাবা ছালু সওদাগর। তাদের পূর্বপুরুষদের ছিল সওদাগরি ব্যবসা। তাদের বাড়ির ঘাটেই বাঁধা থাকত সওদাগরি নৌকা। তারাই এখানকার আদি বাসিন্দা বলে মনে করা হয়।

মানিকারচর, মতভেদে সোনারচর এ দ্বীপের প্রথম জনবসতি বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নদীপথে বাতাকান্দি যাতায়াতকালে খন্দকার কাবিল মিয়ার সোনার আংটি নদীতে পড়ে যায়। এ কারণে স্থানের নাম হয় সোনারচর। এ রকম দ্বীপের প্রতিটি গ্রামের নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা রকম কতকথা। সোনারচর গ্রামেও নবাবদের কাচারি ছিল। কাচারির নায়েব ছিলেন গোবিন্দপুরের পেরীমোহন সাহা। তিনিই ২ নম্বর গোবিন্দপুর ইউনিয়নের প্রথম প্রেসিডেন্ট।

শিক্ষাব্যবস্থা : ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে গোবিন্দপুর গ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত একটি মাইনর স্কুল স্থাপিত হয়। সম্ভবত এটিই এলাকার প্রথম স্কুল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় মৌলভী ওমর আলী স্থাপন করেন মুগারচর ওমরিয়া জুনিয়র মাদরাসা। ১৯২০ সালে স্থাপিত হয় লক্ষণখোলা প্রথমিক বিদ্যালয়। ঠিক এ সময়কালে ‘তুলাতুলি জুনিয়র স্কুল’ নামে একটি স্কুল গড়ে ওঠে। তবে বেশি দিন টেকেনি। টিকে থাকা স্কুলের মধ্যে প্রথম আত্মপ্রকাশ পায়, ‘মহেষখোলা জুনিয়র স্কুল’। ৫০ দশকে ‘মানিকারচর এলএল হাইস্কুল’ পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুলরূপে আত্মপ্রকাশ করে। অত্র দ্বীপের প্রথম কলেজও এটি-ই।

ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এ দেশের মুসলিম সম্প্রদায় ইংরেজি বিমুখ ছিল। এর ছায়া পড়ে এ দ্বীপেও। উচ্চ শিক্ষায় হিন্দু সম্প্রদায় বরাবরই এগিয়ে। গোবিন্দপুরের যতীন্দ্রমোহন সাহা ১৯২৮-৩০ সালের দিকে ডাবল এমএ অর্জন করেন। তার দুই ছেলে বোমকেশ সাহা ও ঋষিকেশ সাহাও এমএ পাস করেন। ঋষিকেশ সাহা নেপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে বিএ পাস করেন রাধানগরের অমৃকা চরণ দাস। তিনি হোমনা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব এডুকেশন হন।

প্রতিকূল পরিবেশেও মাধবপুর গ্রামের সনসুর আলী ভূঞা বিএবিটি ১৯৩৩-৩৬ সালে। পঞ্চাশের দশকে করাচিতে ৪৭ Intelligence High school-এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ছয়আনির গফুর বিএ ১৯৩২-৩৩ সালে। মোল্লাকান্দির এ কে এম আবদুল ওয়াদুদ বিএ ১৯৩৭ সালে। মোল্লাকান্দির আবদুল খালেক বিকম ১৯৩৭ সালে। মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো জ্বলতে শুরু করে চল্লিশের দশকে। মির্জানগরের মিছির আলী (এমএ), ভাওরখোলার সিরাজ সাহেব (এমএ), সাতানির মুজাফ্ফর আলী (বিএ অনার্স, এমএ), হরিপুরের মোসলেউদ্দিন (বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার), সোনারচরের ইঞ্জিনিয়ার কামাল উদ্দিন আহমদ, বাঘাইকান্দার আবদুস সামাদ (এমএ) প্রমুখ উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দেন। (তথ্যসূত্র ‘মেঘনা’ ম্যাগাজিনের ৬ থেকে ১৪ পৃষ্ঠার সারমর্ম) সেই দ্বার দিয়ে দ্বীপে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিসিএস ক্যাডারের জোয়ার বইতে শুরু করেছে।
দ্বীপটি পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ ৩টি :

১. সামন্তপ্রথা : ব্রিটিশ প্রবর্তিত এক প্রকার ভূমি ব্যবস্থা। এ প্রথায় রাষ্ট্র এলাকা ছেড়ে দেয় জমিদারের হাতে। জমিদারগণ প্রজাদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো কর আদায় করে। এ দ্বীপও তখন জমিদার, তালুকদার, নীলকর, নাগ ও টাকা লগ্নিকারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল- কর আদায় ছাড়া তারা এলাকার উন্নয়ন করেনি।

২. অদৃষ্টবাদী : প্রকৃতিনির্ভর দ্বীপবাসী খড়া, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা প্রভৃতির মতো মূল ভূখণ্ডের সাথে উন্নয়নের পার্থক্যকেও অদৃষ্টের পরিহাস বলেই মেনে নিত।

৩. বিভাজন : ভৌগোলিকভাবে দ্বীপটি অবিচ্ছিন্ন হলেও এর দু’টি ইউনিয়ন দাউদকান্দি এবং দু’টি ইউনিয়ন হোমনা থানার অন্তর্গত করে রাখা। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে প্রার্থীরা দোয়া নিতে আসেন। দোয়া নেয়া শেষে কবাব কা হাড্ডিতে পরিণত হয় দ্বীপ।

সোনারচরের মো: আবদুর রব ১৯৫৪ সালে সংসদ সদস্য হলেও দ্বীপের জন্য কিছু করেছেন তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। দ্বীপের কৃতীসন্তান মুজাফ্ফর আলী ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি নিজ অনুদানে নিজের জমিতে স্কুল প্রতিষ্ঠা ছাড়া সরকারি অনুদানে কিছু করার বিষয়টিও অনুজ্জ্বল।

‘মূল ভূখণ্ডের সাথে বৈষম্যনীতি অদৃষ্টের পরিহাস’ মানতে পারেননি বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের মানুষ, তারা এ বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন। পাশেই নারায়ণগঞ্জ মহকুমা। মহকুমাগুলো জেলায় রূপান্তরের পথে। দ্বীপ থেকে কুমিল্লা বহু দূরে। যাতায়াতও দুর্গম। অন্য দিকে নদী পাড় হলেই নারায়ণগঞ্জ। যাতায়াতও সুগম। তাই চন্দনপুর ইউনিয়ন সমাজকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে এর সাধারণ সম্পাদক দ্বীপটি নারায়ণগঞ্জের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে ২৬ জুন ১৯৭৯ দৈনিক সংবাদ ও ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ দৈনিক বাংলা পত্রিকায় পত্রাকারে প্রকাশ করেন। নারায়ণগঞ্জের অন্তর্ভুক্তির শর্ত হিসেবে সমসাময়িককালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় পত্রাকারে আবেদন করেন ইঞ্জিনিয়ার কামাল উদ্দিন আহমদ। যেহেতু সত্তর হাজার জনসংখ্যার ভিত্তিতে চারটি ইউনিয়ন অচিরেই আটটি ইউনিয়নে পরিণত হতে যাচ্ছে সেহেতু পৃথক থানা গঠনে বাধা নেই মর্মে যুক্তি প্রদর্শন করে তিনি বলেন, ‘৬০ বর্গমাইলের এই এলাকায় কোনো রাস্তাঘাট বা সেচ প্রকল্প গড়ে ওঠেনি। হাসপাতাল তো দূরের কথা কোনো ডিসপেনসারি বা পশু চিকিৎসালয়ও এখানে নেই। তাছাড়া উন্নতমানের কোনো স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র বা জনস্বাস্থ্য বিভাগের কোনো প্রতিষ্ঠান এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে নেই। মোটকথা সরকারের কোটি টাকা উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল থেকে এ এলাকা চিরবঞ্চিত। চার দিকে মেঘনা নদী দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় থানার এ এলাকার যোগাযোগ রক্ষা করাও অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। এ কারণে ব্রিটিশ আমল থেকেই এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা একটি সমস্যা হয়ে রয়েছে। এসব অসুবিধা দূর করার জন্য এ দ্বীপভূমিকে পৃথক একটি থানায় অন্তর্গত করা একান্ত আবশ্যক।’

এরপর সাবেক সংসদ সদস্য মুজাফ্ফর আলীর উদ্যোগে মিছির আলী মাস্টারের সভাপতিত্বে চৌদ্দমৌজা অন্তর্ভুক্তিসহ পাঁচ ইউনিয়নের সমন্বয়ে পৃথক থানা গঠনের দাবিতে চন্দনপুর বাজারে এক সভা হয়। সভার বিষয়ে গত ৫/৯/১৯৭৯ ইং তারিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সভায় থানা বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা উল্লেখ থাকলেও অজ্ঞাত কারণে সে চেষ্টা আর ফলবতী হয়নি।

এর মধ্যে দ্বীপটি আটটি ইউনিয়ন, ১০৪টি গ্রামের জনসংখ্যা পৌঁছে যায় এক লাখের কোঠায়। লাখো জনতার দ্বীপ আর ‘কাবাব কা হাড্ডি’ হয়ে থাকতে চায় না। এগিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের সাবেক সভাপতি (বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) উদীয়মান যুবক মো: শফিকুল আলম। তার সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর। স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। ‘পৃথক থানার দাবি’ নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সংসদে উত্থাপন করতে হয়। দ্বীপটি ছিল দুই সংসদীয় এলাকায়। পৃথক থানার দাবির বিষয়ে দুই সংসদই ছিলেন নির্বিকার। অদম্য যুবক শফিকুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গাফফার হাউদ, সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার, ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক প্রমুখ স্পিকারের পিটিশন কমিশনে আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৬ মে ১৯৯৭ রামপুর বাজারের বিশাল সভায় স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ‘মেঘনা’ নামে একটি পৃথক থানা গঠনের অঙ্গীকার করেন। তৎভিত্তিতে ২৬ আগস্ট ১৯৯৮ তারিখে সরকারিভাবে কুমিল্লা জেলায় ‘মেঘনা’ নামে একটি প্রশাসনিক থানার জন্ম হয়। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো পাল্টে যেতে শুরু করে দ্বীপের দৃশ্যপট। এখন (কয়েকটি গ্রাম ছাড়া) রাজধানী থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে বাড়ি পৌঁছা যায়।

৩ সেপ্টেম্বর উদযাপিত হয় মেঘনার ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। যাদের সহযোগিতার নতুন মেঘনা তাদের সম্মাননা ক্রেস্টসহ ‘মেঘনা স্থপতি’ ভূষণে ভূষিত হন শফিকুল আলম।

এর মধ্যেই মেঘনাবাসীর প্রাণের দাবি খণ্ডিত দ্বীপটি এক গঠনে হোমনা নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা। এ বিষয়ে ১৪ মার্চ ২০১৮ প্রকাশিত এক গেজেটে আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জনসংখ্যার বিভাজনকে বিবেচনায় রেখে কুমিল্লা-১ দাউদকান্দি এবং তিতাস উপজেলা, কুমিল্লা-২ হোমনা এবং মেঘনা উপজেলা একত্রিতকরণের প্রস্তাবসহ লিখিত মতামত আহ্বান করা হয়েছে।

অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর দ্বীপের চার দিকে কবিগুরুর কবিতার মতো, ‘চিকচিক করে বালি কোথা নেই কাদা।’ নদী ও বালির মাঝে দাঁড়ালে মনে হয় কক্সবাজারের সৈকত। মেঘনা নামক দ্বীপটি সুরক্ষাসহ সরকার নজর দিলে কালের কবলে অবহেলিত এই দ্বীপ-ই হয়ে উঠতে পারে দেশের নৈসর্গিক লীলাভূমির পর্যটন স্পট।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
E-mail : adv zainulabedin@gmail