Naya Diganta

অতি লোভে ভূমধ্যসাগরে তলিয়ে যাচ্ছে বহু পরিবারের স্বপ্ন

শরীয়তপুরে এখনো সক্রিয় আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, স্পেন, পাঠানোর লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পাচারকারী চক্রটি। বিদেশ পাঠানোর কথা বলে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে ভূমধ্যসাগরে। আর সাগরেই তলিয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবারের স্বপ্ন। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় শরীয়তপুরের ঘরে ঘরে চলছে শোকের মাতম।
বিদেশ গিয়ে নিখোঁজ মিঠু চৌধুরীর বাবা জিতেন চৌধুরী ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী দালাল চক্রের অর্ধশতাধিক সদস্য শরীয়তপুরের ছয়টি উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মানবপাচারকারীরা অবলীলায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রথমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে মানব চক্রের সদস্যরা উন্নত ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গমন ইচ্ছুকদের লিবিয়া পাঠায়। এরপর সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় করে ইউরোপের দেশ ইতালি পাঠায়। এ সময়ে ঘটে অনেক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা। ওই দালালরা বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের মাফিয়া চক্রের মাধ্যমে পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও পরিবারে কাছে পাঠিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করে লাখ লাখ টাকা। টাকা দিতে না পারলে জীবন দিতে হয় মাফিয়া চক্রের হাতেই। এ ছাড়া লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে ভুমধ্যসাগরেই। আবার অনেকেই লিবিয়া, তিউনিয়িাসহ বিভিন্ন দেশের কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পরে দীর্ঘ দিন জেল খেটে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসছেন। নিখোঁজদের বেশির ভাগই নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদর উপজেলার হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান।
গত কোরবানির ঈদের দিন লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ঝুঁকিপূর্ণ তিনটি অবৈধ নৌকা ডুবে গেলে সেখান থেকে তানজিনিয়া কোস্টগার্ডের সদস্যরা ৩১৮ জনকে উদ্ধার করেছে। সেখানে নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাঁও গ্রামের সেলিম কাজীর ছেলে কাজী ফিরোজ মাহমুদ (৩০) নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ কাজী ফিরোজ মাহমুদের সাথে থাকা এসডি সুমন জানায়, যে ভুমধ্যসাগরে নৌকা ডুবির সময় স্টোকে কাজী ফিরোজ মাহমুদ মারা গেছে।
একই উপজেলার ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের সিলংকর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া ছৈয়ালের ছেলে নুরে আলম ছৈয়াল (১৯) ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হয় বলে জানান তার মামা কালাই চৌকিদার। তার সাথে থাকা একই উপজেলা চামটা এলাকার শহীদ মোল্ল্যা (২০), চাকধ এলাকার আরাফাত (১৭), শামীম হোসেন (২২) ডামুড্যা উপজেলার জাহিদ হোসেন (২৫) একই ঘটনায় নিখোঁজ হন। তাদের পরিবারের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।
২০১৯ সালের শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মিঠু চৌধুরী, সোহেল বেপারী, জহির উদ্দিন, কবীর মিয়া, জামাল উদ্দিনসহ ১২ জন যুবক নিখোঁজ হয়। কয়েক জনের লাশ পাওয়া গেলেও অন্যদের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মিলেনি। বিঝারী ইউনিয়নের কানদাপাড়া গ্রামের জিতেন চৌধুরীর ছেলে মিঠু চৌধুরী ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল চক্রের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে নৌকায় পাড়ি জমিয়ে নিখোঁজ হয়। বাবা জিতেন চৌধুরী নড়িয়া থানায় চক্রের সদস্য রতন খানসহ চারজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করে।
নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাঁও এলাকার নিখোঁজ কাজী ফিরোজ মাহমুদের মা সখিনা বেগম ও নিখোঁজ নুরে আলম ছৈয়ালের মা শাহিদা বেগম বলেন, মানব পাচারকারী চত্রেুর সদস্য ফয়সাল বেপারী ও সুজন ছৈয়াল আদম ব্যবসায়ীরা আমাদের সন্তানদেরকে উন্নত ভবিয্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে অবৈধ পথে ইতালি, গ্রিস নেয়ার কথা বলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ভাবে লিভিয়া নিয়ে যায়। সেখান থেকে মারধর করে প্লাস্টিকের নৌকায় উঠিয়ে সগর পাড়ি দেয়। এতে আমাদের মতো অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। এখন যারা জিবিত আছে তাদের দ্রুত উদ্ধার ও যারা মারা গেছে, তাদের লাশ এনে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, শরীয়তপুর জেলার অনেকেই ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকে। সে কারণে এ এলাকার লোকজন অনেকেই বিদেশ মুখী। এ সুযোগে মানবপাচারকারী সদস্যরা প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে তাদের ফাঁদে ফেলছেন। যারা ভূমধ্যসাগরসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে মামলা হওয়ার কারণে অনেকেই পলাতক রয়েছেন। আমরা তাদেরকে গ্রেফতার করার জোর তৎপরতা চালাচ্ছি।