Naya Diganta

চামড়াশিল্প রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিন

প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় এলে চামড়াশিল্প নিয়ে নানা কথা, মন্তব্য, সমস্যাসহ এ শিল্পের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। আশির দশক থেকেই চামড়াশিল্পের নানা সমস্যার কথা বলা হলেও এই শিল্পকে একটি সুষ্ঠু কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যায়নি। অথচ পোশাক খাতের প্রতি নজর বেশি থাকায় এ খাত অনেক দূর এগিয়েছে। চামড়াশিল্পকে ওই রকম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। কোরবানির চামড়া নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটে, নানা সিন্ডিকেটের কথা শোনা যায়।
চামড়ার উপযুক্ত দর পাওয়া যায় না। চামড়ার মূল সুবিধাভোগী গরিব, অসহায় মানুষ ও এতিমরা। তারা তো বঞ্চিত হচ্ছেই; এখন দেখা যাচ্ছে ফড়িয়া, ব্যাপারি ও আড়তদাররাও চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। ক্রেতার অভাবে, ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চামড়া নদীতে ফেলে দেয়া, মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয় এখন মাত্র দুই থেকে তিন শ’ টাকায় অথচ একসময় যে চামড়া বিক্রি হতো দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। এ দিকে প্রতিবেশী ভারতে প্রতি বছর চামড়া পাচার হচ্ছে। কারণ আমাদের দেশের তুলনায় তাদের দেশে চামড়ার দাম ভালো। আমাদের দেশের চামড়ার দাম ভারতের বাজার থেকে বেশি নির্ধারণ করা এবং দেশীয় বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যের কারখানা প্রতিষ্ঠা, চাহিদা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করলে চামড়া পাচারও রোধ করা সম্ভব।
বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ২০১৭ সালে চামড়াশিল্পকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডি ওয়াটারিং ইউনিট, পাম্প, জেনারেটর ও ল্যাবের কাজ এখনো শেষ হয়নি। সিইটিপি কার্যকর না থাকায় সব বর্জ্য গিয়ে ধলেশ^রী নদীতে পড়ে। ফলে দূষণের কারণে ধলেশ^রী নদীও এখন হুমকির মুখে। চামড়াশিল্প নগরে বর্জ্য ও পানি আলাদা করতে ডি ওয়াটারিং ইউনিট আছে ৯টি। তার মধ্যে তিনটি ইউনিটই অকার্যকর রয়েছে। ফলে চামড়া শিল্পনগরের বেহাল দশায় কারখানার মালিক, শ্রমিক, আড়তদার ও ব্যাপারিসহ সবার নানা সমস্যার মধ্যে পরিবেশদূষণও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। অপ্রস্তুত চামড়া শিল্পনগরীতে কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট) ব্যবস্থাপনা এবং ক্রোম রিকভারি ইউনিটের কাজও অসমাপ্ত রয়েছে। সিইটিপির কাজ শেষ না করেই চীনা ঠিকাদার চলে গেছে। এ শিল্পনগরীকে উন্নত করতে হলে অবকাঠামো আধুনিকীরণ করতে হবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চামড়া শিল্পনগরীর শিল্প সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কারণ প্রায় দুই দশকেও এই শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব হয়নি। বিশ^ব্যাপী স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পওয়া যায়নি এখনো।
ইউরোপ আমেরিকার নামকরা আমদানিকারকদের কাছে সরাসরি চামড়া রফতানি করা যাচ্ছে না। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ভালো ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে এখাতের রফতানি কমতির দিকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি ছিল ১২৩ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০১৭-১৮তে তা ১০৮ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০২ কোটি ডলারে নেমে আসে। কোভিডের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই খাতের রফতানি কাক্সিক্ষত মানের হয়নি। তবে এ খাত ঘুরে দাঁড়ানো এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।
চামড়া খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ছয় লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরো তিন লাখ মানুষ জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোট রফতানির মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ। জুতাবাজারেও চামড়াশিল্পের বিরাট অবদান রয়েছে। চামড়া ও চামড়াবিহীন প্রধানত দুই ধরনের জুতা তৈরি হয় দেশে। এতে আমাদের স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি হয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রফতানি হয়েছিল ৭৮ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের রফতানি হয় ৮০.৯৬ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৭.৯৩ কোটি ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৫.০৫ কোটি ডলারের জুতা রফতানি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর যা রফতানি হয় তার মধ্যে চামড়ার তৈরি জুতায় ৮৫ শতাংশ। বাকি সিনথেটিকসহ অন্যান্য পণ্যের। লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি) সূত্রে জানা যায়, বিশে^ জুতার মোট বাজারের ৫৫ শতাংশ চীনের দখলে। বিশে^ জুতার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮ তে। বিশ^বাজারে বাংলাদেশের এ খাতে অবদান মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী পরিবেশবান্ধব ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য শোধনাগারের সমস্যা কাটিয়ে উঠলে জুতা রফতানি পাঁচগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে প্রায় ৯০টি দেশে বাংলাদেশের জুতা রফতানি হচ্ছে। বিশ^বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বা জুতা রফতানিতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাভারের শিল্পনগরীকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তৈরি করা। পরিবেশবান্ধব করা। সিইটিপির আধুনিকরণ করা। সেই সাথে বিশ^বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে মূল্য প্রতিযোগিতামূলক করা। চামড়াশিল্প পিছিয়ে পড়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো দেশী বাজারে নতুন কোনো ব্র্যান্ড, কোম্পানির প্রতিযোগিতা কম। কমপ্লায়েন্সের অভাব, পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে জটিলতা। পরিবেশবান্ধব চামড়া ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও উন্নয়নমূলক কাজ না থাকা। তা ছাড়া মলিক ও শ্রমিকের মধ্যে আচরণগত ও সুযোগ-সুবিধার জন্য দূরত্ব থাকা।
চামড়া শিল্পনগরী শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও বিনোদন ব্যবস্থাপনা এবং তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি সুবিধা থাকা দরকার। কাঁচা চামড়া রফতানির জন্য নিয়ম-কানুন শিথিল করা, কেমিক্যাল কস্ট কমানো। শ্রমিকের বেতন-বোনাস নিয়মিত দেয়া উচিত। বাংলাদেশের রফতানিরমুখী হাতেগোনা যেসব শিল্প খাত রয়েছে তার মধ্যে চামড়াশিল্প অত্যন্ত পুরনো শিল্প। প্রতি বছর এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরিত হচ্ছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত নানা সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানÑ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) কারখানার মালিক-শ্রমিক সমন্বয় থাকা চাই। এ সুযোগ তৈরির জন্য সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। এ শিল্পের মানোন্নয়নের জন্য ও রফতানিকে আরো গতিশীল করার জন্য, বিশ^ব্যাপী স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ পাওয়ার জন্য এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য শোধনাগার ও তার বর্জ্য ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
দেশীয় বাজারে চামড়া ও চামড়জাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে এ শিল্পের বাজার ধরে রাখা উচিত। কাঁচা চামড়া সরাসরি বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বিক্রির পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা উচিত। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা দরকার।
চামড়াশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এই শিল্পের বিকাশের পথে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যাগুলো সবারই জানা তবে প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১. চামড়াশিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বর্জ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি বলে বিশ^বাজারে চামড়াপণ্যের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২. লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের নামে বৈশি^ক সংস্থার মান সনদ অর্জন করতে না পারা। কোনো দেশের এ সনদ না থাকলে চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সেই দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে উৎসাহ দেখায় না। সরকারকেই এসব সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প শুরু হয় ২০০৩ সালে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখনো প্রকল্পের অনেক কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। সিইপিটি ও ডাম্পিং ওয়ার্ডের কাজ শেষ করতে ব্যর্থতার জন্য কারা দায়ী তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
লেখক : ব্যাংকার
Emil: main706@gmail.com