Naya Diganta

মোহন ভাগবত পিছু হটছেন কেন

মোহন ভাগবত পিছু হটছেন কেন

মোহন ভাগবত হলেন আরএসএসের প্রধান। আরএসএস হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গুরু সংগঠন। ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’ নামেরই সংক্ষিপ্ত রূপ হলো আরএসএস। আরএসএস হলো ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল ‘আইডিয়ার’ ধারক মানে আদর্শ দেয়ার সংগঠন। তবে তাদের মূল আইডিয়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেক ‘তিতা’ লাগতে পারে। তাই ওপরে চিনির প্রলেপ দেয়া এদেরই ‘নরম’ গণসংগঠনের নাম বিজেপি।

আরএসএস কেমন বৈশিষ্ট্যের সংগঠন? এটা সামাজিক তবে ধর্মতত্ত্বীয় সংগঠন। হিন্দুত্ববাদ, এই ধর্মীয় আইডিয়া ভারতের সমাজে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম। কিন্তু আরএসএস জানে, তার এ কাজে রাজনৈতিক ক্ষমতাও দরকার। তাই নিজের অধীনস্থ এক রাজনৈতিক দল যার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে বিজেপি, এই নামে একটা দল রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে। তবে আইনি কারণে প্রকাশ্যে আরএসএস দাবি করতে পারে না যে, বিজেপি তার অঙ্গ বা অধীনস্থ দল। তাই তারা বলে থাকে যে, কিছু আরএসএস-সদস্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিজেপি নামে রাজনৈতিক দল খুলে সেটা আরএসএসের আইডিয়াতে চালাতে। তাই এরা নন-আরএসএস এমন যে কাউকেও বিজেপিতে নিতে পারবে। অর্থাৎ আরএসএসের অনেক কাজ বিজেপির জন্য পালনীয় নয়, বিজেপিতে তা ছাড় দেয়া যাবে। বাজপেয়ি বা মোদি এরা সবাই আসলে আরএসএসের ‘প্রচারক’ সদস্য ছিলেন বা আছেন। প্রচারক, মানে দলের ‘ফুল টাইমার’ কর্মী, যারা দলীয় ভাতায় চলেন।

কিন্তু কেন মোহন ভাগবতের নাম তুললাম? সম্প্রতি তিনি এক সভায় মুসলমান কোপানো যেসব কাজের জন্য মোদি ও বিজেপির কুখ্যাতি বা যেটা তাদের মূল পরিচিতিÑ ভাগবত ওই সভায় ঠিক তার সব বক্তব্যই এর উল্টা দিয়েছেন। যেমন মিডিয়াতে তার ওই রিপোর্টের শিরোনামÑ যেমন আনন্দবাজারের হলো, ‘যিনি বলবেন মুসলিমরা ভারতে থাকবেন না, তিনি হিন্দু নন, বললেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত’। আবার ওই রিপোর্টের ভেতরে তিনি বলেছেন, ‘যে বা যারা গো-রক্ষার দোহাই দিয়ে গণরোষ তৈরি করে কাউকে কাউকে আক্রমণ করছেন, তারাও হিন্দুত্বের বিরোধী’। আবার বলেছেন, ...‘মনে রাখতে হবে ভারতের হিন্দু, মুসলমান একই (ডিএনএ) উৎস থেকে এসেছেন’। এ ছাড়াও আছে, ...‘গরু একটি পবিত্র প্রাণী। কিন্তু গো-রক্ষার কারণে যারা গণরোষ তৈরি করে অন্যকে আক্রমণ করছেন, তারা হিন্দুত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। আইন আইনের পথেই চলবে’।

মোহন ভাগবত এমনকি লিঞ্চিং বা কথিত গণপিটুনিতে মানে দলবদ্ধভাবে রাস্তায় মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ঘটনা এতদিন মোদির আমলে ঘটে এসেছে সে সবের দায় অস্বীকার করে পুরা উল্টা কথা বলছেন। বলছেন, ‘যারা লিঞ্চিংয়ে জড়িত তারা হিন্দুত্ববিরোধী লোক।’ অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই গরু রক্ষার রক্ষক সেজেছিলেন। আর এই রক্ষার নামে, গরু হাটে বেচাকেনা, গরু মাংস হিসেবে বিক্রি, দুধের ব্যবসার জন্য গরু পালা কেনাবেচা, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা ইত্যাদি সবকিছুর বিরুদ্ধে আইন করতে গেছিলেন। প্রথমে আলাদা আলাদা রাজ্যে, পরে কেন্দ্র সরকারের হয়ে আইন করেছিলেন। কিন্তু আইন চালুর একপর্যায়ে সুপ্রিম আদালতের শুনানিতে প্রশ্নের সদুত্তর না দিতে পেরে শেষে পিছু হটে ‘আপাতত’ স্থগিত রেখেছিলেন সেই গোরক্ষা আইন। অথচ আজ ভাগবত সব দায় অস্বীকার করে বলছেন, ‘লিঞ্চিংয়ে জড়িতরা হিন্দুত্ববিরোধী লোক।’ তাহলে কি তিনি বলতে চাইছেন মোদি সরকারটাই হিন্দুত্ববিরোধী? না ঠিক তা নয়। তাই তিনি এবার আরেক গল্প জুড়ে দিয়ে দাবি করছেন, ওসব ছিল সব মিথ্যা মামলা!

তবে এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। লিঞ্চিংয়ের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে ভাগবত কিন্তু স্বীকার করে ফেলেছেন বা করে নিয়েছেন যে, মোদি ও তার দলই আসলে একটা এমন লিঞ্চিং উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন। কথাটা বলছি এ জন্য যে ব্যাপকভাবে এমন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ‘অন ক্যামেরা’ মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও মোদি সরকারের এক সংখ্যালঘু মন্ত্রী আছেন; তিনি তাকে দিয়ে এসব ঘটনায় মন্ত্রী হিসেবে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, এমন ঘটনাগুলোর কথা সরকারের জানা নাই, এগুলো সব গুজব।’

ওদিকে আরো ছিল। যেমন রাস্তায় যেকোনো মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে ‘জয়শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা এবং ক্রমাগত নির্যাতন করা যেমন বুকের খাঁচার ওপর উঠে দাঁড়ানো ইত্যাদি ধরনের অজস্র টর্চার- এসব ভিডিও ক্লিপ আমরা দেখেছি।

আবার কলকাতার সর্বশেষ আরেক রূপ দেখেছি। জেলা শহরের শিক্ষকরা কলকাতায় অফিসের কাজে এসে, তারা মুসলমান হলে শহরের হোটেলে থাকতে পারবে না, রেস্টুরেন্টে খেতে পারবে না বলে ‘পাড়া কমিউনিটি থেকে’ আপত্তি তুলে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে।

আরো ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ছিল। তাবলিগ মারকাজে যোগ দিতে আসা প্রথমবারের লকডাউনে শহরে আটকা পড়া মুসলমানদের নিয়ে। বিজেপি মিডিয়া সেলের প্রধান এটাকে প্রসঙ্গ করে প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, মুসলমানরা অসভ্য, এরা খেতে জানে না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জানে না। হাতের আঙুল দিয়ে উঠিয়ে চেটে চেটে এরা খায়।’ অর্থাৎ এটা নাকি মুসলমানদের নিচা কালচারের কাজ ও প্রমাণ। এভাবে মুলমানদের নিয়ে ‘চিত্র’ একে এবার এরা ছড়িয়েছিল যে, এ কারণেই ভারতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী এই নিচা কালচারের মুসলমানরা। চরম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দু সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ওই সেলে কিছুই করতে বাকি রাখে নাই। অথচ এখন মোহন ভাগবত বলছেন, ভারতের হিন্দু-মুসলমান তারা শুধু ‘একই’। না, তাদের ডিএনএ (মানুষের শরীরের মৌলিক কণা বা জিনগত বৈশিষ্ট্য) এরা একই। অর্থাৎ ইংরেজি রেস অর্থে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বৈশিষ্ট্যও নাকি একেবারেই এক। কী সাঙ্ঘাতিক? একেবারে উল্টা ‘ফতোয়া’!

মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য প্রসঙ্গে, ভারতের মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা লিখেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় হায়দ্রাবাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফয়জান মুস্তফা, কলাম লিখেছেন। তার পুরা লেখাটা ‘সবাই লিবারেল বা উদারনৈতিক হয়ে গেলেই তো হয়’ ধরনের; মানে হিন্দুত্বের চাপের মধ্যে থাকা কলকাতার মুসলমানদের অবস্থার মতো; যার সার কথা হলো, হিন্দুত্বের আধিপত্যটাকেই আপন বলে মেনে নিতে এরা সাজেশন দেন। কারণ, তাহলে বিনিময়ে ওরা হিন্দুত্বের সমাজ- স্কুলে ঢুকতে দেবে, এক বেঞ্চে বসতে দেবে, পাস করে ডিগ্রি পেলে একই অফিসে চাকরি করতে দেবে ইত্যাদি। অতএব, এটাকেই তারা নিজেদের ‘লিবারেল’ জীবনযাপন বলে চালিয়ে দিতে চায়।

আসলে ফয়জান মুস্তফার লেখার শিরোনামটাই এমন অনেক কথা বলে দেয়। যেমন তার লেখার শিরোনাম হলো, ‘মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক মন্তব্যটা কি হিন্দুত্ববাদের নরম ধারার ইঙ্গিত?’
ব্যাপার হলো, কারো ধর্মীয় মতবাদের নরম বা গরম রূপ বা ধারার কোনোটা নিয়েই রাষ্ট্র সাজানো যায় না। কারণ রাষ্ট্র গঠন বা সাজানোর কাজে কম্প্রোমাইজ করার কিছুই নেই। কারণ মূল কথা, নাগরিক যেই হোক তারসহ সবার নাগরিক অধিকার সমান হতেই হবে। কোনো উসিলায় কেউ ‘বেশি অধিকারী’ হতে পারে না। যেমন আমরা সংখ্যায় বেশি বা আমার ধর্মটা বেশি ভালো বা আমি সমতলী তাই পাহাড়িদের চেয়ে আমি এগিয়ে অথবা আমি বাঙালি ইত্যাদি অজুহাতে কারো অধিকার কম কারো বেশি হতে পারবে না।

কাজেই মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদটাকে এবার নরম করে হাজির করেছেন তাই এটা মুসলমানদেরসহ কারো গ্রহণযোগ্য হবে- এটা হতে পারে না। বিশেষ করে নরম অথবা গরম যাই হোক এটা হিন্দুত্ববাদ। এই হলো সার কথা। তবে তিনি হয়তো বাস্তবের সমাজে হিন্দুত্বের প্রবল চাপের মধ্যে টিকে ও বেঁচে থাকতে চেয়ে কৌশলগতভাবে এমন লিখেছেন। কিন্তু তবু মোহন ভাগবতের প্রশংসা করতে যাওয়ার কৌশল নেয়াটা তার ঠিক হয়নি। তিনি তাকে স্বাধীনচেতা ও অন্য কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের তুলনায় ভালো বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেজন্যই নাকি মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদের এসব অন্যায়কে অন্যয় বলতে পেরেছেন- এমন মন্তব্য করেছেন।

আসলে মোস্তফা বাস্তবতার চাপে সম্ভবত চরম আর সহনশীল বলে দুটো হিন্দুত্ববাদ আছে এ কথা বলেছেন। তবু এভাবে কথা বলাও আসলে কৌশলগতভাবেও ভুল পথ। তবে তিনি প্রশ্ন তুলে একটা শেষ বাক্য লিখেছেন মারাত্মক। বলেছেন, ‘রাজা রামমোহন রায়ের কথিত হিন্দু রেনেসাঁ কি আসলে বেদ ও উপনিষদে আবার ফেরত যাওয়ার তাগিদ ও আহ্বান নয়? তার লেখার শেষের এই অল্প কটা শব্দের বাক্য আসলে তার মনের কথা- তিনি বাইরে না এনে পারেননি। এ জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

কেন এই সময় মোহন ভাগবতের পিছু হটা?
নিঃসন্দেহে এটা আরএসএস-বিজেপিরই পিছু হটা; তাতে এটা গরম থেকে নরমে অথবা আগের হিন্দুত্ববাদই তবে সেটা এবার লিবারেল করে হাজির করা ইত্যাদি- সেটা যাই হোক না কেন, এটা পিছু হটাই। কিন্তু কেন? আর এখন কেন? এর সম্ভাব্য দু’টি কারণ বলব।

এক. মোদি সরকারের অবস্থা ভালো নয় বলে আরএসএস-বিজেপি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এসেছে। এর মূল বিষয় অর্থনৈতিক দুরবস্থা। মনে রাখতে হবে, করোনা এবং দ্বিতীয় ঢেউ অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু যারা ভারতের অর্থনীতি মনিটর করে আসছেন তারা মানেন, করোনা ফ্যাক্টর হওয়ার বহু আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতিতে দুর্বলতা চলে আসছিল। আর সেটা দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরও। এবার কুম্ভমেলায় গঙ্গাস্নানের আয়োজন ও রাজ্য নির্বাচনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কারণে সবকিছুতে মোদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। সহসাই আর অর্থনীতিতে রিকভারি হচ্ছে না। মুখ্যত প্রথম এক বছর যাবে করোনা রিকভারি করতে; এরপরে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মনোযোগ দেয়ার সময় আসতে পারে।

এ ছাড়া সব কিছুতে অপ্রয়োজনে মিথ্যা হামবড়া দেখানো ভারতের এক পুরনো স্বভাব। তবে অনেক হামবড়া দেখানোর ক্ষেত্রে বাইরের মানুষ পরে জেনে যায় ওই অংশটা লোক দেখানো ছিল আর তাতে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভারত ‘টিকা কূটনীতির বড় প্লেয়ার’ এই মিথ্যা হামবড়া ভাব এবার ভারতকে একেবারে ফুটা করে দিয়েছে। খোদ ভারতই এখন সারা দুনিয়া থেকে নিজের জন্য টিকা সংগ্রহে নাকাল হয়ে গেছে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট একেবারে চেপে ধরেছেÑ এর সত্যিকার অবস্থা জানাতে বলছে। এতেও ভারতের যোগ্য সবার জন্য টিকা দেয়া শেষ করতে ক’বছর লাগবে সেটা এখনো অনিশ্চিত।

এর পরে আরো বড় সমস্যা আছে। এখন টিকার বড় অংশ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে বলে এই টিকার মূল্য জোগাড় করতে আর সাধারণভাবে ‘স্বাস্থ্য খাতের’ অর্থ পেতে ভারত এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশ হয়েও নিজের হামবড়া সে টিকা কূটনীতিতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী এই ফাঁপা ইমেজ ভুলে, পশ্চিমের দাতা অনুদান চক্রের কাছে খোলাখুলি হাত পেতে ‘লাইন ধরেছে’। এক কথায়, ভারত এখন দাতব্যে টিকা পেতে আর হাসপাতালের খরচ চাইতে নেমেছে। কারণ এখন লোকলজ্জার সময় নেই। কেন?

এক কথায়, যতই ভারত তার নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পেতে দেরি করবে ততই অর্থনীতি ন্যূনতম স্বাভাবিক হতে তা পেছাতে থাকবে, এর পরে অর্থনৈতিক রিকভারির কথা আসতে পারবে না। টিকাদান শেষ না হলে অর্থনীতি, মানে ন্যূনতম অবাধে মানুষের মুভমেন্টই শুরু হবে না। আর এর ভেতরে আবার যদি করোনার তৃতীয় কী চতুর্থ ঢেউ না দেয় তো সব শেষ। এ জন্যই সব দেশের জন্যই টিকাদান সবার আগে শেষ করা একেবারেই মুখ্য কাজ। মোদির জন্য কাজটা এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।

ইতোমধ্যে ভারতের জন্য এক মহাবিপর্যয় এবং ইজ্জতের সওয়াল উঠে এসেছে। শুরুটা করেছিল লন্ডনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস ম্যাগাজিন। তারা এক বিস্তারিত রিপোর্টে ভারতের অর্থনীতি থেকে দেখিয়ে রিপোর্ট করে যার শিরোনাম হলো, কোয়াডের (আমেরিকা, জাপান অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের এক আন্তর্জাতিক জোট) মধ্যের সবচেয়ে দুর্বল দেশ (উইক লিঙ্ক) হলো ভারত। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে এই জোটের মধ্যে ভারত দুর্বল বলে সে কম্পটেবল বা বাকি সবার সাথে তুলনীয় দেশ নয়; ফলে সে বাকি সবাইকে ডুবাবে। অর্থাৎ আবার সেই খামোখা হামবড়া দেখানোর পরিণতি। ভারত ঋণদাতা হওয়া দূরে থাক গ্রাহক হওয়ার মতোও নয় যেন, বরং অনুদান চাওয়া অর্থনীতির দেশ; মানে যে ঋণের সুদ দূরে থাক, আসল ফেরত দেয়ার যোগ্যতা রাখে না তাকে বিশ্বব্যাংক ফেরত দিতে হবে না এমন অর্থ অনুদান দেয়। এখন এমন দেশ কি কোয়াডের সদস্য হতে পারে বা হওয়া ঠিক হয়েছে? এই প্রশ্নটাই যেন এখানে তুলে দিয়েছে ওই পত্রিকা।

মোহন ভাগবতের পিছু হটার দ্বিতীয় কারণ : এই কারণটা হলো, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফেরত চলে যাওয়া। ভারতের ওপর এর সোজা প্রভাব হলো, এতদিন আমেরিকার আড়ালে থেকে ভারত জঙ্গিবাদ বিরোধিতার নামে ইসলামোফোবিক, ইসলামবিদ্বেষী সব ঘৃণা জাগিয়ে সারা ভারত এবং প্রতিবেশীদের ওপর হিন্দুত্ববাদের ছড়ি ঘুরাচ্ছিল। এখন আমেরিকা নেই তো ভারসাম্য নেই, ভেঙে গেছে। সশস্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক গ্রুপ প্রায় সবাই এতে মুক্ত হয়ে ভারসাম্য ভেঙে গেছে বলে তাদের সবার সাথে এখন ভারতকে মোকাবেলা করতে হবে। এ কারণে ভারতের কাশ্মির রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। অথচ গত দু’বছর ধরে কাশ্মিরে কেবল রাজনৈতিক তৎপরতা নয়, সাধারণ অর্থনৈতিক তৎপরতাও স্তব্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছিল। মোদির ‘হামবড়া’ ছিল এই যে হিন্দুত্ববাদের জোশ তুলে কাশ্মিরকে দখল করে রাখা সম্ভব ছিল, ভারতের স্বাধীনতার সেকালে। সেটাই সে নাকি এখন করে ভারতের বিজয় ঘটাল।

অথচ এখন উল্টা ভারতীয় কাশ্মির রক্ষা ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরাটাই সশস্ত্রমুখী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। অবস্থা আঁচ করে আমেরিকার পরামর্শে মোদি দ্রুত আপস করার পথ খুঁজছেন কিন্তু তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ওই অঞ্চলের ইরান বা পাকিস্তানের সহযোগিতা এমনকি কিছু পরামর্শ পাওয়ারও পথ রাখেননি মোদি। কারণ যেমন ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে অবিবেচক ভারতের ভারত-ইরান সম্পর্ক হাতছাড়া হয়ে ভেঙে গেছে। আর ও দিকে পাকিস্তানবিরোধী অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী জজবা তুলে হিন্দু মেরুকরণে ভোট সাজতে গিয়েছেন তিনি সবসময়। আর এতে এখন পাকিস্তানের সহযোগিতা পাওয়ার পথও তিনি নিজেই বন্ধ করে রেখে গেছেন।

অতএব, থুতু ফেলে সেই থুতু গেলা। হিন্দুত্ববাদের নরম ভার্সানকে বাইরে নিয়ে আসা! কিন্তু এতে ভরসা? অনিশ্চিত সেটা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com