Naya Diganta

ঈদুল ফিতর প্রশান্তিময় আনন্দ

লিকুল্লি কাওমিন ঈদ, হাজা ঈদুনা প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব উৎসব রয়েছে। তেমনি মুসলমানদের জন্যও দুটো ঈদ উৎসব রয়েছে। মানুষের প্রকৃতির স্বাভাবিক চাহিদা মোতাবেক দুঃখের পরে সুখ এবং বেদনার পর আনন্দ আসে। এটা একটি অপরিবর্তনীয় রীতি বা নিয়ম পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এমনি আনন্দের সুসংবাদ দিতে গিয়েই বিশ্বমানবতার খাঁটি বন্ধু ও মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সা: স্পষ্ট করে উপরে উল্লিখিত কথাগুলো বলেছিলেন।
পৃথিবীতে যেমন অনেক জাতির মানুষ রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাদের আনন্দ ও বেদনা প্রকাশের কিছু বিশেষ দিন। অন্যান্য জাতির ন্যায় মুসলিম মিল্লাতেরও কতগুলো স্মরণীয় উৎসবের দিন রয়েছে এবং এসব দিনে তারা নানা রূপে আনন্দ-উৎসব পালন করে থাকে। তবে ঈদের আনন্দ ও অন্যান্য আনন্দের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান।
মহান আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের সওগাত সমৃদ্ধ হয়ে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংযম সাধনার শিক্ষা নিয়ে যে রমজানুল মোবারক আমাদের মাঝে এসেছিল, তার বিদায়লগ্নে বিমল আনন্দের অনুপম মাধুরী এনে দিয়েছে ঈদুল ফিতর। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির বিশেষ আনন্দ অনুষ্ঠানের মতো ঈদুল ফিতরও মুসলিম মিল্লাতের এক বার্ষিক আনন্দের মেলা। কিন্তু অন্যান্য অনুষ্ঠানের চেয়ে এর স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্নতর। উৎসবের নামে অনাচার-কদাচার আর নৈতিকতা বিবর্জিত বল্গাহীন অনুষ্ঠান আড়ম্বরের কোনো অবকাশ নেই ইসলাম অনুমোদিত এ আনন্দে। বরং এ আনন্দ সংযম ও আনুগত্যের জন্যই বছরে দু’টি বিশেষ দিনে এরূপ আনন্দের অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। হজরত আনাস রা: বলেন, নবী করীম সা: যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি সেখানকার মুসলিমদের দুটো বিশেষ দিনে নানারূপ খেল-তামাশার মাধ্যমে আনন্দোৎসব করতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন তোমাদের এরূপ করার কারণ কি? তারা বলল, আমরা জাহিলি যুগেও এ দু’টি দিন এমনি খেল-তামাশার মাধ্যমে আনন্দ উদযাপন করতাম। নবী মুহাম্মদ সা: বললেন, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের আনন্দোৎসবের জন্য এর চেয়েও দু’টি উত্তম দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার একটি হলো ঈদুল ফিতরের দিন পয়লা শাওয়াল। অপরটি হলো ঈদুল আজহার দিন ১০ জিলহজ।
হজরত মুহাম্মদ সা: পয়লা শাওয়ালকে ঈদের দিন ঘোষণা করেন। আল্লাহ নবীর ইচ্ছা অনুযায়ী ঈদের আনন্দ মুসলমানদের জন্য আল্লাহপাক বরাদ্দ করেছিলেন। সেই সময় থেকেই চলে আসছে পবিত্র ঈদুল ফিতরের উৎসব। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, রমজানের রোজা ও ঈদুল ফিতর হিজরি দ্বিতীয় বছর চালু করা হয়। ওই বছর রোজা শেষ হওয়ার বারো দিন আগে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আর রোজার শেষে পয়লা শাওয়ালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ঈদুল ফিতরের উৎসব। হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নির্দেশ মতো আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিতে দিতে মুসলমানরা খোলা ঈদের ময়দানে গিয়ে হাজির হয়। নবীজী সা: উপস্থিত সব মুসলমানকে সাথে নিয়ে খোলা ময়দানে দুই রাকাত ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করলেন। তিনি তাদের উদ্দেশে খুতবা পড়ে ঈদের উৎসবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তাই ঈদকে কেবলমাত্র আনন্দের বা পানাহারের উৎসব বলে বিবেচনা করলে চলবে না। ঈদের উৎসব পালনের মধ্যে যে ধরনের সৌভ্রাতৃত্ব ও তাকওয়া রক্ষা করে চলা এবং ত্যাগের মহান অনুপম তাৎপর্য রয়েছে তা উপলব্ধি করতে হবে। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার অনল দহনে দগ্ধ হওয়ার পর মুমিন বান্দার পক্ষে মহান আল্লাহর দরবারে নির্মল ও নিখাদরূপে উপস্থিত হওয়ার দিন হলো ঈদুল ফিতর। এ দিনের স্বচ্ছ সুন্দর ও মধুর প্রভাতে মুমিন বান্দার মন কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়। বস্তুত দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পরে ঈদের আনন্দ হচ্ছে আল্লাহর শুকরিয়ারই বহিঃপ্রকাশ।
মুসলমানদের আদর্শিক লক্ষ্য ও গুরুত্বের মাপকাঠিতে বিচার করলে দেখা যায় ঈদুল ফিতরের এ খুশি মোটেই নিরর্থক নয়। ইসলামের অসংখ্য শিক্ষার ন্যায় ঈদুল ফিতরেও আমাদের জন্য কয়েকটি অনুপম সুন্দর শিক্ষা রয়েছে। যেমন :
১. ঈদের এ মহান দিনে মুসলমানদের জাতীয় জীবনে সাম্য মৈত্রের বন্ধন দৃঢ় করার আবেদন তীব্র হয়ে দেখা দেয়। তা বাস্তবায়ন করা রমজানের অন্যতম শিক্ষা।
২. ইসলাম ত্যাগ-তিতিক্ষার, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যরে যে শিক্ষা দিয়েছে, সেই মহান শিক্ষার তাগিদ নতুন করে বাস্তবায়নের আবেদন আনে এ ঈদের (ঈদুল ফিতর) মধুময় প্রভাতে।
৩. দুস্থ, অসহায়, এতিম ও দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার যে বাস্তব ট্রেনিং এক মাস যাবত মুমিন বান্দা লালন করে, তার ফলাফল প্রত্যক্ষ করার সময় হচ্ছে ঈদুল ফিতরের দিনটি।
৪. এ দিনে পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার আবেদন আসে সকল দিক থেকে।
৫. ঈদের দিন দুই রাকাত বিশেষ নামাজ পড়ে বিশ্ব জাহানের একচ্ছত্র অধিপতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
৬. সামাজিক আদব-কায়দা ও শৃঙ্খলাবোধ বজায় রাখার প্রয়োজন দেখা দেয় নতুন করে।
৭. পৃথিবীর অস্থায়ী জীবনের এই একদিনের আনন্দের পর স্থায়ী ও চিরন্তন জীবনের মহা আনন্দের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার তাগিদ দেয় ঈদুল ফিতর।
৮. ঈদের দিনে নানা প্রকার মিষ্টান্নসহ মানসম্মত খাবারসামগ্রী আমাদের দৈহিক তৃপ্তি লাভের সাথে সাথে আত্মিক তৃপ্তি লাভ করে।
৯. অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ড পরিহার করে তাকওয়া অর্জন করার কাজে আত্মনিয়োগ করার সুযোগ আসে।
ঈদুল ফিতরের শিক্ষাগুলোকে কি আমরা সত্যিকারভাবে ব্যক্তি জীবনে, সামাজিক জীবনে অথবা রাষ্ট্রীয় জীবনে গ্রহণ করতে পারি না? বস্তুত মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: যেভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছিলেন তার কথা ও কাজের সত্যিকার অনুসারী হতে হলে আমাদের ঈদ উৎসবও সে ধরনের হওয়া উচিত। আর তা করতে হলে প্রথমত ঈদুল ফিতরের আনন্দে আমাদের জাঁকজমক তথা বিলাসবহুল ব্যবহার পরিহার করতে হবে। অপব্যয় ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ইসলাম কোনো ক্ষেত্রেই অনুমোদন করে না। কাজেই আমাদের ঈদ উৎসব হতে হবে আড়ম্বরহীন। হিন্দুদের পূজা পার্বণ, খ্রিষ্টানদের বড় দিন পালন ও বর্ষবরণ উৎসবের মতো আমাদের ঈদ উৎসবে থাকতে পারে না কোনো বাহুল্য কর্মসূচি।
ঈদুল ফিতরের আনন্দ আমাদেরকে বিনয়ী, নম্র ও হৃদয়বান করে তোলে। যেন ঈদের প্রভাত থেকেই আমরা পরের সুখে সুখী হওয়ার তাগিদ অন্তরে অনুভব করি। ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা এবং বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তির প্রাণপ্রবাহে আমাদের হৃদয়মন ভরে যায়। আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার সাথে সাথে আমরা যেন সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারি। যেন সৃষ্টিকে ভালোবেসে স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করতে পারি। বস্তুত নিছক এক দিনের হইহুল্লোড় ও মাতামাতিতেই ঈদের সার্থকতা নিহিত নয়। বরং প্রত্যেক ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন মন-মানস ও উন্নত চরিত্রের অধিকার লাভ করাতেই রয়েছে ঈদ উৎসবের আসল সার্থকতা।
মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ যে কত অসীম, ঈদের পবিত্র দিনে মুমিনবান্দা তা চিন্তা করে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। তারা বৃথা সাজ-সজ্জা ও নিষ্ফল আনন্দের পরিবর্তে রাসূলে করীম সা:-এর নির্দেশ পালন করেই পরিতৃপ্তি পায়। ঈদের দিনে আল্লাহর কাছে তওবা করো, কারণ এ দিনে তওবা কবুল হয়। মুমিন বান্দা তাই মুনাজাত করে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার রোজা কবুল করো, আমাকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে নাও। আরো শোনা যায়, মুমিনের কান্না কাতর কণ্ঠের আবেদন : ‘হে আমার জীবন-মৃত্যুর মালিক! তুমি আমার অজ্ঞানপ্রসূত কৃতকর্মের ভুলত্রুটি ক্ষমা করো। আমাকে জাহান্নামের কঠিন আযাবে নিক্ষেপ করো না। হে রাব্বুল আলামিন তুমি আমাদের গুনাহখাতা মাফ করো, আমাদের ঈদকে তুমি সফল এবং সার্থক করো।
রাসূলে করিম সা:-এর সাহাবায়ে কেরামগণ ঈদের দিনে নির্জন একাকিত্বে আল্লাহর দরবারে নিজেদের যাবতীয় গুনাহখাতা ক্ষমা চাইতেন। আল্লাহ ভীতি তাদের নিরর্থক আনন্দ থেকে বিরত রাখত। আনন্দ ও খুশির এ পবিত্র দিনে তারা কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে রোজা কবুলের জন্য দোয়া করত। যানবাহনে আরোহণ করে সুখ ও কৌতূহল প্রকাশ করতে তাদের অন্তর ভীত বিহ্বল হয়ে পড়ত। কেননা তারা রাসূলে মকবুল সা:-এর পাক জবানে শুনেছেন, ঈদের আনন্দ তার জন্য নয়, যে ঊর্ধ্বে আরোহণ করেছে, ঈদের আনন্দ তো সেই মুমিনের জন্য যে রমজানের কৃচ্ছ্রতা সাধনায় নিজ জীবনকে পবিত্র করেছে।
দুঃখ দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে যারা জর্জরিত, ঈদুল ফিতরে তাদেরও বিশেষ আনন্দের ব্যবস্থার জন্য সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে। মক্কা-মুয়াজ্জমার অলিগলিতে লোক পাঠিয়ে নবী করিম সা: ঘোষণা করেছিলেন, জেনে রেখো, সদকায়ে ফিতরা প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষ, আজাদ গোলাম ও ছোট-বড় সবার প্রতি ওয়াজিব। সদকায়ে ফিতরের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে নবী করীম সা: বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সদকায়ে ফিতর আদায় করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার রোজা জমিন ও আসমানের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে।
ঈদুল ফিতরের পবিত্র ও প্রশান্তিময় আনন্দের দিনে সিয়ামের শিক্ষাকে ভুলে গেলে দীর্ঘ এক মাসের সাধনা পূর্ণতা লাভ করবে না। রমজানের সাধনায় কে কতটুকু সংযমী ও পরহেজগার হতে পেরেছে পরবর্তী সময়ের কাজ কর্মেই তা প্রমাণিত হবে। আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগ-তিতিক্ষায় যে সবক দিয়ে গেছে রমজানুল মোবারক ঈদের পুণ্য প্রভাত হতেই তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। সফলতা ব্যর্থতার বাছ-বিচার শুধু একমাসের সাধু জীবনযাপনেই নয় বরং আল্লাহর আনুগত্যকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমেই মাহে রমজানের সফলতা। সারা বছর যারা মনে রাখতে পারে এবং আমল করতে পারে যেমন, যে ব্যক্তি আপন প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেট ভরে খায়, তার কোনো ইবাদতই আল্লাহ কবুল করেন না।
অনেক সময় দেখা যায়, এক শ্রেণীর মানুষ ঈদের বাজারে কেনাকাটার আনন্দে এত ব্যস্ত থাকে যে, শেষ পর্যন্ত ঈদের দু’রাকাত নামাজও আদায় করতে পারে না। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এদের কাছে আল্লাহর এ শুভ সংবাদের কোনো মূল্য নেই। শোন ফেরেশতারা, আমার প্রিয় বান্দারা তাদের ওপর অর্জিত কর্তব্য পালন করে আবার দৌড়ে আসছে আমার দিকে, আমার করুণাপ্রার্থী হয়ে। আমি আমার সম্ভ্রম, আমার উচ্চ মর্যাদার শপথ করে বলছি, তাদের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়ে, তাদের আমার দরবারে কবুল করে নিলাম।
কাজেই সিয়াম সাধনার মাধ্যমে দেহ মনকে নির্মল ও পবিত্র করে নেয়ার পর ঈদুল ফিতরের আনন্দক্ষণ মুহূর্তে আমরা যেন মুনাজাত করে বলি, হে প্রভু, তুমি আমাদের রোজা কবুল করো এবং আমাদেরকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে নাও। সাহাবায়ে কিরামের মতে ঈদের প্রভাতে আমরা যেন রাসূলে পাক সা:-এর এ মহান বাণীর শিক্ষা অনুসরণ করতে পারি। ঈদের দিনে আল্লাহর কাছে তওবা করো, কারণ এ দিনে তওবা কবুল হয়।
বাস্তবে আমরা যদি এভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পারি, তাহলে আমাদের একটি মাসের সিয়াম সাধনা সার্থকতা ফলে-ফুলে ভরে উঠবে এবং আরো পবিত্র মন-মানসিকতা নিয়ে ঈদুল আজহার কোরবানি তথা সকল প্রকার ত্যাগ তিতিক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারব। আর পবিত্রতা ও ত্যাগের মহড়া আমাদেরকে পৌঁছে দেবে সাফল্যের সর্বোচ্চ মঞ্জিলে। হ