Naya Diganta

নির্মাণের চেয়ে মেরামতে ব্যয় বেশি তিস্তা সেচ প্রকল্পে

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প নতুন করে তৈরী বা নির্মাণের চেয়ে নির্মিত জিনিস মেরামত বা সংস্কারেই খরচ বেশি হচ্ছে। এসবের বেশির ভাগই দেখা যাচ্ছে নদীর তীর রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ ও সেচ প্রকল্পগুলোতে। তিস্তা সেচ প্রকল্পের কয়েকটি খাতে খরচে এসব ব্যবধান পাওয়া গেছে। তবে এক হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদনে দেশের উত্তরাঞ্চলে বছরে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন ধানসহ ৫.২৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবনায় দেখা যায়, তিস্তা সেচ প্রকল্পের পরিধি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। বাড়বে খাদ্যশস্য উৎপাদন। পাশাপাশি ৮৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অনুমোদন পেলে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে চলতি সময় থেকে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি নীলফামারী জেলার সদর, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, ডিমলা ও জলঢাকা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, খানসামা ও চিরিরবন্দর এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া, সদর, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের আওতায় সেচের আওতা বাড়বে। ভূগর্ভের পানির স্তর অধিকতর উন্নীতকরণ, পরিবেশ তথা জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত ৩০ লাখ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলছে, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের পানির অভাবে শস্যসঙ্কট একটি চিরন্তন সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে তো বটেই আমন মৌসুমে বর্ষা ও বর্ষা-উত্তরকালে খরা একটি সাংবাৎসরিক ঘটনা। প্রকল্প এলাকায় সেচের পানির প্রাপ্যতা খুবই সীমিত। একমাত্র তিস্তা ছাড়া অন্যান্য ছোট ছোট নদী ও খালগুলোতে পানিপ্রবাহ খুবই কম থাকে। তাই তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে এ অঞ্চলে একটি সেচ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ব্রিটিশ আমল থেকেই অনুভূত হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালে প্রাথমিক এবং ১৯৬৮-৭০ সালে দ্বিতীয় সম্ভাব্য সমীক্ষা সম্পাদন করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে ১৯৬৬-৬৭ সালে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় ৯১.৫০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বুড়িতিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় ৬৩.৭২ কিলোমিটার সেচ খাল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্পের ৩৩.৭৮ কিলোমিটার খালসহ প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কমান্ড এলাকা তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প প্রথমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১০ সালের পর থেকে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ খালগুলোর নাজুক পরিস্থিতির কারণে সেচের আওতাভুক্ত এলাকা ক্রমেই কমতে থাকে। বর্তমানে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেচ খালগুলোর পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ কাজ সম্পাদন করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচের পানি সরবরাহ করে প্রকল্পের সেচযোগ্য এলাকা বৃদ্ধি এবং ফসলের নিবিড়তাসহ উৎপাদন বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলো ৭৬৬.৩১ কিলোমিটার সেচ খালের ডাইক শক্তিশালীকরণ, ৭২ কিলোমিটার সেচ পাইপ স্থাপন, স্লোপ প্রটেকশন ১০.৮ কিলোমিটার, স্লোপ মেরামত ১.০৬ কিলোমিটার, বাইপাস সেচ খাল নির্মাণ ৭.১৩ কিলোমিটার, ২৭টি কালভার্ট নির্মাণ, ৪টি সেতু নির্মাণ, ১১.৮৯ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ, ২৭০ হেক্টর জলাধার ও খাল পুনঃখনন, সাড়ে ৯ কিলোমিটার চ্যানেল পুনঃখনন, ৬ কিলোমিটার পরিদশন রাস্তা নির্মাণ, ৫২.২৮ কিলোমিটার পরিদর্শন রাস্তা মেরামত, ৫৭টি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ, ৩টি নিষ্কাশন অবকাঠামো মেরামত, ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ এবং ৬টি রেগুলেটর মেরামত। এ ছাড়াও রয়েছে ১৮টি অনাবাসিক ভবন মেরামত ও ৮৭ হাজার ২৪৩টি বৃক্ষ রোপণ।
ব্যয় পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, প্রকল্পে ৩৬৯.৪৩ কিলোমিটার সেচ খালের ডাইক পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করা হবে। তাতে খরচ হবে ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ ১৭ হাজার টাকা। ফলে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে এক কোটি ৬৮ লাখ টাকা। স্লোপ প্রটেকশন ১০.০৮ কিলোমিটার কাজে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ৩৮ লাখ ১১ হাজার টাকা। প্রতি কিলোমিটারে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। আর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১.০৬ কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ৭ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ফলে মেরামতে কিলোমিটারে ব্যয় হবে ৬ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থাৎ নির্মাণের চেয়ে মেরামতেই খরচ ২ কোটি টাকার বেশি। নিকাশ কাঠামোয় সাইফুন নির্মাণে ৫৫টিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৮ কোটি ৬৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। প্রতিটিতে ব্যয় ৫২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। তবে এই সাইফুন ৩টি মেরামত খরচ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। প্রতিটির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ১ কোটি ১৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
এ দিকে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সেচ উইং বলছে, প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন অনুমোদিত নকশা ও রেট শিডিউল অনুযায়ী করতে হবে। মাটির কাজের একক মূল্য রেট শিডিউল অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যয় কমাতে হবে। আর সুবিধাভোগীদের তালিকা উল্লেখ করতে হবে।