Naya Diganta

গ্রামবাংলার ফাল্গুন-চৈত্র

শহরের কোলাহলে ফাল্গুন কিংবা চৈত্র আদতে কতটা প্রভাব পড়ে তা কেবল বলাবাহুল্য। শুধু চৈত্রের প্রচণ্ড দাবদাহ ভাব শহুরে মানুষকে খুব রকম নাড়া দিতে না পারলেও বেশ কিছুটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
গ্রামবাংলায় ফাগ্লুন-চৈত্র আসে মায়া ছড়িয়ে, শোভা ভরিয়ে, ভালোলাগার গান গেয়ে। কোকিলের মিঠে সুর, বটের তলে রাখাল রাজার মিষ্টি মধুর বাঁশির ধ্বনি, দোয়েলের মুহুর্মুহু ডাক, পায়রার বাকুম বাকুম বোল আর নৃত্য হৃদয়কে আন্দলিত করে, করে কাব্যময়। এ সময় গাছে গাছে স্বপ্নিল পাতা ধরে। ফুলের সুরভিতে বাতাস মৌ ছড়ায়। ভ্রমর মাতে, গায় গান। অলি আর প্রজাপতি পাখনা মেলে। ফড়িং এ ফুল ও ফুলে দোল খায়। ফিঙে, শালিক, চড়–ই ফাঁকা মাঠে জটলা বাধায়, ঝগড়া করে।
এ সময় ডিমের কুসুম রঙ নিয়ে সূর্য ওঠে। আলো ছড়ায়। দিকে দিকে পড়ে যায় সাড়া। গোয়ালঘরে একটানা হাম্বা হাম্বা গরু ডাকে। হালকা পরিবেশ ভারি হয়ে যায়। আসে গৃহস্থ। ক্ষেতে নিয়ে যায়। খোঁপ থেকে বেরিয়ে পড়ে হাঁস-মুরগি। উঠোনজুড়ে ওরা খেলে বেড়ায়। হাঁস নেমে পড়ে পাশের পুকুরে কিংবা দিঘি অথবা ছোট্ট খালে।
অতঃপর আসে দুপুর। কিছুটা নেমে আসে নীরবতা। মাঝে মধ্যে নীরবতা ভেঙে পাশের বনে একটানা ডেকে ওঠে ঘুঘু। দামাল ছেলেরা ঘুড়ি নিয়ে প্রচণ্ড দাবদাহে মাঠে-ময়দানে ছোটে। কড়কড়ে রোদে আকাশের বুকে ঘুড়ি উড়িয়ে দেয়। করে হইহুল্লোড়। দৌড়ে এসে ছোট্ট খালে লাফঝাঁপ আর ডুব সাঁতারে মাতে। মাঝে মধ্যে ঝিরিঝিরি হাওয়া বয়। জুড়ায় শরীর।
সূর্যের কাঠফাটা তেজে মাঠ ফেটে চৌচির হয়। রসালো তরমুজসহ নানাবিধ ফলের সমারোহ ঘটে। বেলা গড়ায়। হাটুরে হাটে যায়।
তার পর আসে বিকেল। দুরন্ত ছেলেমেয়েরা হাডুডু, দাঁড়িয়া বাঁধা, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, ক্রিকেট, ফুটবল প্রভৃতি খেলায় মাতে।
সময় পার হয় আসে গোধূলি লগন। পাখিরা নীড়ে ফেরে। অতিথি পাখি মাথার ওপর দিয়ে শাঁই শাঁই শব্দ তুলে দূরে কোথাও মিলিয়ে যায়।
হাটুরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ি ফেরেন। কাছের কিংবা দূরের মসজিদ হতে ভেসে আসে মিষ্টিমধুর মন হরণ করা আজান ধ্বনি। নামাজিরা অজু করতে পুকুর আর দীঘির পানে ছোটেন। ডাহুক থেকে থেকে বিরহ সুর ছড়ায়। ঝিঁঝিঁদের পালা গান ঐদিনের জন্য থেমে যায়। কাছে কিংবা দূরের গাঁয়ে জ্বলে ওঠে সন্ধ্যা প্রদীপ।
আকাশের গায়ে শোভা ছড়িয়ে ওঠে চাঁদ। মখমল জোছনা আর জোনাকির নিভে-জ্বলা দৃশ্যে মনপ্রাণ উদাস হয়ে যায়। কবিরা লেখেন শাশ্বত কবিতা। ছড়াকার লেখেন অনাবিল ছড়া। গীতিকার লেখেন গান। দেন সুর।
এ সময় গাঁয়ে গাঁয়ে শুরু হয় পালাগান আর যাত্রাপালা। চলে সোনা বান ভানু আর রহিম বাদশার পুঁথি। উঠোনে বসে দাদা-দাদী শুরু করেন রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প। বলেন রূপ কাহিনী।
তো সব মিলে এ আমার দেশ। প্রিয় মাতৃভূমি। ছয় ঋতুর মোহে মুগ্ধ হয়ে হৃদয় আমার আকুলিবিকুলি করে। করে তোলপাড়। আমি যেন হারিয়ে যাই দূরে বহু দূরে। হয়ে যাই কবির ভেতর কবি। আঁকি মন প্রাণ উজাড় করে এই দেশেরই ছবি। আমি ধন্য তার কোলে জন্ম নিয়ে, ধন্য পাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়ে। এ আমার অহঙ্কার।