Naya Diganta

সুলতানা রাজিয়ার সমাধি দর্শন

সুলতানা রাজিয়ার সমাধি দর্শন

ভারতবর্ষ তো বটেই, মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন সুলতানা রাজিয়া। বিস্ময়কর কাহিনীতে ঘেরা এ নারীর নাম আজো বিশ্বব্যাপী আলোচিত। তার জীবনকাহিনী নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক গল্প, সিরিজ; তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি মেগা সিরিয়াল ও মুভি।

প্রায় সাত শত বছরের মুসলিম শাসনের স্বর্ণালি ঐতিহ্যের ধারক-বাহক, বিশ্বের নানা জাতির ক্ষমতার উত্থানপতন ও রক্তক্ষয়ী পালাবদলের নীরব সাক্ষী ঐতিহাসিক দিল্লি নগরীতে একাধিকবার গেলেও আউলিয়ায়ে কেরাম, সুফি দরবেশের মাজার জিয়ারত ও প্রাচীন মুসলিম স্থাপনা পরিদর্শনই কেবল করেছি। দিল্লি শহরে এবং উপকণ্ঠে অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকা অপরিসীম বীরত্বগাথার অনেক নৃপতিকে বেমালুম ভুলে বসি অন্য পর্যটকদের ন্যায় আমি নিজেও। গত ২০১৮ সালের মার্চে দিল্লি সফরকালে মেহরাউলিতে সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ, দিল্লির কোতওয়ালে বাংলায় স্বাধীনচেতা নবাব মীর কাসিমসহ দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকজন সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, সুলতান, নবাবের কবর জিয়ারত ও পরিদর্শন করেছি। ঠিকানা সংগ্রহসহ প্রস্তুতি আগেই নিয়ে রেখেছিলাম। আজ কেবল সুলতানা রাজিয়াকে নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়াস।

দিল্লি সালতানাতের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট’ হিসেবে খ্যাত শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ তার সাত সন্তানের কাউকে রাজ্য শাসনের উপযুক্ত নয় মনে করে কন্যা রাজিয়াকে তার ইন্তেকালের পর দিল্লির শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য আমির-উমরাহদের উপদেশ দিয়ে যান। রাজিয়া ছিলেন মেধাবী, বুদ্ধিমতী, রূপবতী ও পরিশ্রমী। পিতা ইলতুৎমিশ যখন যুদ্ধের জন্য রাজধানী ত্যাগ করতেন, তখন রাজ্য পরিচালনা করতেন মূলত তার কন্যা রাজিয়াই। এভাবে পিতা ইলতুৎমিশ তাকে গড়ে তুলছিলেন। ১২২৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর বেশির ভাগ আমির-উমরাহ ও আলেমরা নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে ‘বন্দেগান-ই-চেহেলগান’ অর্থাৎ ‘চল্লিশ আমলার দল’ খ্যাত রাষ্ট্রীয় অভিজাত মহল রাজিয়ার সৎভাই রুকন উদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসান। বিলাসী ও অযোগ্য ফিরোজ রাজ্য পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিলে আমির-উমরাহ রাজিয়াকে সুলতানা হিসেবে মেনে নিতে রাজি হলেন। ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজিয়াকে যখন দিল্লির সিংহাসনে বসানো হয় তখন তার বয়স ছিল ৩১। ‘সুলতানা’ উপাধি ধারণ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রাজিয়া গোটা সালতানাতে স্বীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। রাজিয়া তাকে ‘সুলতানা’ না বলে ‘সুলতান’ বলতে নির্দেশ দেন। তিনি বলতেন, ‘সুলতানা’ বলা হয় সুলতানের স্ত্রীকে। কিন্তু আমি কোনো সুলতানের স্ত্রী নই। আমি নিজেই একজন স্বাধীন সুলতান। সুলতান হয়েই রাজিয়া সুন্দর করে গুছিয়ে নিলেন দিল্লি নগরীকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। দিল্লিবাসী তাকে খুব ভালোবাসতেন। তার নামে মুদ্রা জারি করা হয়। উপাধি নেন ‘রাজিয়াত উদ্দীন’।

ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজিয়া পুুরুষ শাসকের রাজকীয় পোশাক পরিধান করে প্রকাশ্যে সিংহাসনে উপবেশন করতেন। যোদ্ধার পোশাকে সজ্জিত হয়ে অশ্বারোহণ করে স্বয়ং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতেন। লাহোরের বিদ্রোহী শাসনকর্তাকে সাক্ষাৎ সংঘর্ষে পরাজিত করেন। কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধের অনুসারী এবং সামরিক কার্যে পারদর্শী তুর্কি আমির ও মালিকরা একজন মহীয়সী নারীর এহেন পুরুষোচিত আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তবে ঐতিহাসিকরা দিল্লির আমীর-উমরাহদের রাজিয়ার বিরুদ্ধাচরণের আরো একটি বিষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুলতানি আমলের ইতিহাসে তুর্কি বংশোদ্ভূত ‘চেহেলগানি’ হিসেবে পরিচিতি অভিজাত আমীর-উমরাহরা ছিলেন খুবই ক্ষমতাশালী। এটি অবশ্য ইলতুৎমিশের সময় থেকেই। সুলতানা রাজিয়া তাদের ক্ষমতা খর্ব করেন। তিনি তাদের বাইরে একজন অতুর্কি জামাল উদ্দীন ইয়াকুতকে ব্যক্তিগত উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন। রাজকীয় আস্তাবলের প্রধানও (সেনাপ্রধান) করা হয় তাকে। এর আগে এসব পদ তুর্কি বংশোদ্ভূত কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এতে করে তুর্কিদের হাত থেকে রাজকীয় কমান্ড অতুর্কির হাতে চলে যায়। ফলে সুলতানা রাজিয়ার প্রতি আমির ও মালিকদের প্রতিহিংসা আরো বাড়তে থাকে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তারা রাজিয়ার সাথে ইয়াকুতের ‘অবৈধ প্রণয় আছে’ বলে গুজবও রটিয়ে দেন। সীমান্ত প্রদেশ ভাথিন্ডার (পাঞ্জাব) গভর্নর ইখতিয়ার উদ্দিন আলতুনিয়ার বিদ্রোহ ঘোষণার মূলে ছিল এ গুজব। বিদ্রোহী শাসনকর্তা আলতুনিয়াকে দমন করতে গিয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে পরাজয় হয় রাজিয়ার। সুলতানার প্রধান সেনাপতি ইয়াকুত নিহত হন এবং রাজিয়াকে বন্দী করে নিজের রাজ্যে নিয়ে যান আলতুনিয়া। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, আলতুনিয়া ছিলেন রাজিয়ার সমবয়সী ও শৈশবের খেলার সাথী। আলতুনিয়া রাজিয়াকে পছন্দ করতেন। রাজিয়ার সাথে তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান জামাল উদ্দিন ইয়াকুতকে নিয়ে বিভিন্ন কুৎসা রটনায় চরম ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন আলতুনিয়া। পছন্দের নারীর এসব ব্যাপার মেনে নিতে না পেরে রাজিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন আলতুনিয়া। পর্যটক ইবনে বতুতা এ ঘটনার ১০০ বছর পর তার ভারত ভ্রমণ বিবরণীতে ‘নারী বাহিনী’র বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার সময় সুলতানা রাজিয়ার প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল হলেও তাতে ‘যথেষ্ট নাটকীয়তা’ যোগ করেছেন।

এদিকে সুলতানা রাজিয়ার অবর্তমানে দিল্লির আমিররা তার সৎ ভাই বাহরাম শাহকে সিংহাসনে বসান। বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেতে অথবা আলতুনিয়ার প্রেমের কারণেই কিংবা হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার বাসনা থেকেই হোক- রাজিয়া আলতুনিয়াকে বিয়ে করতে রাজি হন। বেশির ভাগ ইতিহাসবিদের মতে, রাজিয়া প্রকৃতপক্ষে রাজ্য ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আলতুনিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ে করেই রাজিয়া আলতুনিয়াকে উৎসাহ দিতে থাকেন দিল্লি আক্রমণ করে মুইজ উদ্দিন বাহরাম শাহকে উৎখাত করে সিংহাসন দখল করার জন্য। ১২৪০ সালে রাজিয়া ও আলতুনিয়া বাহরাম শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করেন। যুদ্ধে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার বাহিনীর সাথে যোগ দেন রাজিয়ার অনুগত কয়েকটি রাজ্যের গভর্নরও। তবে দিল্লির উপকণ্ঠে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাহরাম শাহের কাছে তারা পরাজিত এবং পরে উভয়েই এক হিন্দু আততায়ীর হাতে নিহত হন। অন্য এক বর্ণনায়, উভয়েই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছিলেন। এভাবে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় দিল্লির প্রথম ও শেষ নারী সুলতানের।

পুরাতন দিল্লির শাহজাহানাবাদের তুর্কি গেটের বুলবুল-ই-ফরাশখানাতে পাশাপাশি অবস্থিত সুলতানা রাজিয়া ও তার স্বামী আলতুনিয়ার সমাধি। যেখানে চির শায়িত সুলতানা রাজিয়া, সেটা অনেকটা পোড়োবাড়ির মতো অবহেলিত, পরিত্যক্ত। জায়গাটা দিল্লির চাঁদনি চকের পেছনে। দিল্লির সুলতানি আমলের হেরেম ‘কুশক ই ফিরোজি’ প্রাসাদে বড় হওয়া রাজকুমারীর সমাধিসৌধের বেহাল অবস্থা দেখে যে কেউ বলবে, সুলতানা রাজিয়াকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। সমাধি দর্শনের সময় পুরাতন হিন্দি ফিল্ম ‘রাজিয়া সুলতানা’-এ গাওয়া লতা মুঙ্গেশকরের বিখ্যাত গানের কলি-ই বারবার মনে পড়েছিল- ‘এ্যায় দিলে নাদান, আরজু কিয়া হ্যায়, জুসতু জু কিয়া হ্যায়। কিয়া কেয়ামত হ্যায়, কিয়া মুসিবত হ্যায়, কেহ নাহি সাকতে।’

প্রায় ঘণ্টাখানিক সমাধি ও সংলগ্ন স্থান ঘুরেফিরে দেখার সময় রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম বারবার। বিগত ৪০ বছর ধরে পড়েছি এবং পড়াচ্ছি ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশেষ অংশজুড়ে যার স্থান এমন এক কিংবদন্তির সমাধি স্বচক্ষে দর্শনে রোমাঞ্চিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। অপরিসীম দক্ষতা এবং অসীম দৃঢ়তায় সব প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সালে পর্যন্ত প্রায় চার বছর ধরে গোটা ভারত উপমহাদেশ সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন সুলতানা রাজিয়া। শুধুই পাক ভারত, বাংলাদেশ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ইতিহাস নয়, গোটা পৃথিবী ও মুসলিমদের ইতিহাসে একজন রমণীর এমন বিস্ময়কর উত্থান আজো অমলিন।

লেখক : শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক
shabbiraff@gmail.com