Naya Diganta

‘টাকা’ নাকি সেকেন্ড গড

‘টাকা’ নাকি সেকেন্ড গড

লোকে বলে, ‘টাকা’ নাকি সেকেন্ড গড (!) কেউ কেউ বলেন, ‘টাকা হলে বাঘের চোখ পাওয়া যায়’। টাকায় কী না হয়? এটাই মানুষের ধারণা। সমাজের বিত্তশালী লোকদের সবাই সমীহ করে। সংশ্লিষ্ট লোকেরা কিভাবে বিশাল টাকাওয়ালা বা বিত্ত-বৈভবের মালিক হলো কেউ তার খোঁজ নিতে যায় না। টাকার কাছে নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই। বর্তমানে সমাজে একজন চরিত্রবান মানুষের কোনো মূল্য নেই, যদি তার টাকা না থাকে। সমাজ তার নিজস্ব রূপ চরিত্র বদলে ফেলেছে। টাকার কাছে ‘সমাজ’ নির্বিকার হয়ে যাচ্ছে। আগে দেখেছি, যে ব্যক্তি অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে তার বাড়িতে মসজিদের ইমাম সাহেবরা খেতে যেতেন না। এখন মসজিদে মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই সমাজে চিহ্নিত অসৎ ব্যক্তিকেই মসজিদ কমিটির সভাপতি বা সেক্রেটারি করা হয়। কোন চাকরি পেলে ঘুষ খাওয়া যায়, জমিজমা বিক্রি করে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে মানুষ সে চাকরির খোঁজে থাকে। বাংলাদেশে খুঁটির জোর বা অঢেল টাকা না হলে চাকরি পাওয়া যায় না। স্কুলশিক্ষক বা সুইপার, পিওন, দারোয়ান ও দফতরি পদে টাকা ছাড়া চাকরি হয় না। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও এমপিদের টাকা না দিলে স্কুলে কোনো শিক্ষক বা কোনো পোস্টে চাকরি হয় না। হাইকোর্টের নির্দেশে সম্প্রতি এমপিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এমপিদের রাহুগ্রাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেঁচে যাওয়ায় শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে।

সমাজের নৈতিকতাবোধ আজ তলানিতে। যাদের নৈতিকতাবোধ রয়েছে তারা আছেন সবচেয়ে কঠিন মানসিক যন্ত্রণায়, তারা অনৈতিকতার প্রতিরোধ বা প্রতিকার করতে পারছেন না; এ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই তাদের দিন কাটে। ‘মিথ্যা’ কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য বা মিথ্যা প্রতিবেদন দেয়া যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লোকে এখন সহসাই বলে থাকে, ‘সত্যের ভাত এ দেশে নাই’। তবে ‘সদা সত্য কথা বলবে’ এ কথাগুলো কি শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যই সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি মানুষের ‘অভ্যাসের’ অন্তর্ভুক্ত হবে এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘কারাগার’ সবচেয়ে দুর্গম এলাকা হওয়ার কথা, যেখানে হাজতি বা কয়েদি এবং কারারক্ষী ছাড়া অন্য লোকের প্রবেশের ন্যূনতম সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু টাকা হলে বাংলাদেশের যেকোনো জেলখানায় নারীসঙ্গ থেকে শুরু করে কারাগার কর্তৃপক্ষ সব কিছুই ব্যবস্থা করে দেয়। ইতঃপূর্বে নিজে কয়েকবার জেল খেটেছি। ওয়ান-ইলেভেনের অবৈধ সরকারের আদেশে ২৬ মাস কারাগারে ছিলাম। সেখানে দেখেছি, টাকা হলেই যেকোনো নেশার দ্রব্য কারাগারে পাওয়া যায়। তখন মোবাইলে কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আমাদের সাথে ডিভিশন সেল ছাড়াও প্রভাবশালী সাধারণ কয়েদিদের হাতেও মোবাইল দেখেছি। এগুলো সবই হয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষকে অর্থের বিনিময়ে রাজি-খুশি করার মাধ্যমে। অর্থের পরিমাণ বেশি হলে কারাগার থেকে বাড়িতে গিয়ে দু-এক রাত কাটানোর ইতিহাসও রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, হলমার্ক কেলেঙ্কারি মামলার অন্যতম আসামি হলমার্কের মহাব্যবস্থাপকের সাথে বহিরাগত এক নারীকে ৪৫ মিনিট অবস্থান করার সুযোগ দিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ। কারাগারের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত এ ভিডিও চিত্রটি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হলে তা ভাইরাল হয়ে যায়। অথচ করোনাকালীন সময়ে কারাগারের বন্দীদের সাথে কোনো দর্শনার্থীর সাক্ষাৎ করা নিষিদ্ধ রয়েছে।

আদালতকে বলা হয় একটি পবিত্র জায়গা। কিন্তু সময়ের সন্ধিক্ষণে মানুষ তা বিশ্বাস করে কি না সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু কথায় বলে, অযাচিত টাকার জন্য কোর্টের ইট-পাথরও হাঁ করে থাকে। ব্রিটিশ আমল থেকে এ পদ্ধতি শুরু হয়েছে। এখন বাড়তি টাকা দেয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এ রেওয়াজ বন্ধ করার জন্য ‘লোক দেখানো’ কথা বলা হয় সত্য, কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই।

দেশের সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষগুলো দিন দিন কর্মহীন এবং গরিবির দিকে যাচ্ছে। অন্য দিকে দেশ ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ২৩ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রতিটি শিশু জন্মগ্রহণ করে। অন্য দিকে প্রকাশ পাচ্ছে, ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেয়া হয়েছে তা আদায় হচ্ছে খুবই ধীর গতিতে। বোদ্ধা মহলের ধারণা, এই ঋণ বাবদ গৃহীত অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিদেশে বাড়ি গাড়ি হচ্ছে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের অর্থে। দেশটিকে দেউলিয়া পরিণত করতে যা যা দরকার একশ্রেণীর পুঁজিপতি যারা সরকারি ঘরানার লোক হিসেবে পরিচিত তারা সবই করে যাচ্ছে। দেশকে লুট করার উদ্যোগ প্রতিরোধ করার জন্য সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। একটি জাতিকে সামগ্রিকভাবে গতিশীল করার জন্য যে উদ্যোগ সমষ্টিগতভাবে হওয়া দরকার, তা দেখা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম হতে যাচ্ছে, কিন্তু জাতি আজ নানা কারণে দ্বিধাবিভক্ত। এ বিভক্তি সহসা দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা চোখে পড়ছে না।

একটি জাতিকে গতিশীল করতে হলে তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশপ্রেম থাকলে রাতারাতি কেউ ধনী সম্মৃদ্ধশালী হওয়ার অপকৌশল খুঁজতে পারে না। এ দেশে এক শ্রেণীর মানুষের মুখের জোর এত বেশি যে, তাদের বক্তব্যে বোঝাই যাবে না, কে দেশপ্রেমিক এবং কে নয়।

বিভিন্ন অপকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য একশ্রেণীর সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজ কর্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চালিয়ে দেয়। গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের জনগণ। কিন্তু মানুষের সেই স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়েছে? গরিব দিন দিন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা, যাদের একটি অংশ সরকারি ঘরানার, বাকি অংশ হচ্ছে নব্য আওয়ামী লীগার। নব্য আওয়ামী লীগারদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগের মূল স্রোতধারা অসন্তোষ প্রকাশ করলেও নব্যরা বহাল তবিয়তে রয়েছে। তবে ক্যাসিনো বা এ ধরনের কোনো অপরাধে ধরা পড়লে মন্ত্রীরা বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিএনপি থেকে এসেছে। বিএনপির প্রতি সরকারি দলের অ্যালার্জি আছে বিধায় প্রতি ক্ষেত্রেই সরকারি দল বিএনপিকে দোষারোপ করে।

জনগণের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে পুলিশ। লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে পুলিশকে অনেক সমৃদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জনগণ পুলিশকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পেরেছে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এখনো মানুষের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, থানায় যেতে হলে টাকা নিয়ে যেতে হবে এবং টাকা ছাড়া থানায় কোনো কাজ হয় না। একটি জিডি করতে গেলেও ডিউটি অফিসারের জন্য টাকা নিয়ে যেতে হয়; এ ধারণা থেকে গণমানুষ সরে আসতে পারেনি। কারারক্ষী বা পুলিশের একটি অংশ মাদক কারবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত।

সরকারের কোনো দফতরেই অযাচিত অর্থ ব্যয় না করলে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। ইদানীং বিভিন্ন সরকারি অফিসে লেখা রয়েছে, ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা এই, ‘নো টাকা, নো সার্ভিস’। এই নীতিতেই সরকারি অফিসগুলো চলছে। মাঝে মধ্যে দু-চার জন হাতেগোনা সরকারি কর্মচারী পাওয়া যায় যারা ঘুষ নেন না। ঘুষ ছাড়া একমাত্র সেবা পাওয়া যায় ব্যাংক কর্মচারীদের কাছ থেকে যারা নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারী, যাদের দায়িত্ব শুধু টাকা জমা করা বা প্রদান করা। কিন্তু ব্যাংক যারা পরিচালনা করেন এবং নীতিনির্ধারক তারা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বিভিন্ন অযাচিত ঋণ দিয়ে ব্যাংক খালি করে দেয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো পরিচালনায় রয়েছে সরকারি ঘরানার লোকেরা।

অযাচিত লেনদেন একটি সামাজিক ব্যাধি। দেশে শিক্ষিত লোকের অভাব নেই এবং শিক্ষিত লোকেরাই সরকারের বিভিন্ন দফতরে চাকরিতে রয়েছেন। শিক্ষার পাশাপাশি যদি নৈতিকতা না থাকে তবে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিতের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না। নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেকে নিজে নৈতিক আদর্শ গড়ে না তোলেন। নৈতিকতা কোনো বই-পুস্তক ও স্কুল-কলেজের বিষয় নয়, এটা পুরাপরি মনমগজ ও নিজ বিবেকের বিষয়। বিবেক কী তা-ও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা লাভ করা যাবে না।

নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেই ‘বিবেক’ জবাব দেয়- কোন কাজটি নৈতিক ও কোন কাজটি অনৈতিক। ধর্মীয় পুস্তক পড়ে নৈতিকতা শিক্ষা লাভে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু নিজ থেকে সচেতন না হলে কেউ নৈতিকতাপূর্ণ জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে পারে না। এ জন্য দরকার কোনো কাজ করার আগে বা কোনো বক্তব্য দেয়ার আগে নিজেকে নিজে জিজ্ঞাসা করা, তবেই নিজ ‘বিবেক’ কম্পিউটারের মতো সঠিক রাস্তা প্রদর্শন করবে, নতুবা নয়। ফলে শিক্ষা এবং নৈতিকতা একটি ভিন্ন দিক, যা অর্জন করতে হবে নিজ প্রচেষ্টায়।

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com