Naya Diganta

ড. ফজলুল হক সৈকত

সাহিত্যে ধর্ম কিংবা ধর্মের সাহিত্য সব সময়ই আলোচনার অন্তরালে থেকে যায়। সাহিত্যে নৈতিকতা কিংবা আধ্যাত্মিক চিন্তা কিভাবে প্রবেশ করে, তা নিয়ে কম বিবেচনা হয়নি। তবে সাহিত্যকে সম্ভবত নৈতিকতার পাঠ-প্রদানের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক বিবেচনায় তার খানিকটা যৌক্তিক কারণও রয়েছে বটে। কিন্তু বিশেষ বিবেচনায় অবশ্যই মনে হবে ধর্ম ও সাহিত্য পরস্পর দূর-সম্পর্কস্থিত কোনো বিষয় নয়। এই দুইয়ের মধ্যে নিবিড় বন্ধন আছে। ধর্মে যে রয়েছে সাহিত্য আবার সাহিত্যেও আছে ধর্মের প্রভাব। সাহিত্যে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গটিও সেখানেই।
‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার/ চরণধুলার তলে।/ সকল অহংকার হে আমার/ ডুবাও চোখের জলে।/ নিজেরে করিতে গৌরব দান/ নিজেরে কেবলই করি অপমান,/ আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া/ ঘুরে মরি পলে পলে।/... আমারে না যেন করি প্রচার/ আমার আপন কাজেÑ/ তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ/ আমার জীবন মাঝে।’Ñ নোবেল বিজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই ‘গীতাঞ্জলি’তে তাঁর মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। প্রভুর প্রতি প্রবল মিনতি, সংশয় আর আস্থার সমাবেশ আছে তার ওই সব গীতে। সৃষ্টি-রহস্য-সন্ধান আর ‘সব চাওয়া সব পাওয়ার’ হিসাব মেলাতে গিয়ে তিনি বারবার প্রভুর মৌনতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি নিঃসংশয়চিত্তে আত্মসমর্পণ করেছেন। আর্জেন্টিনার কবি ‘সুর’ পত্রিকার সম্পাদক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ১৯১৪ সালে দাম্পত্য-অশান্তি আর ব্যক্তিগতভাবে মানসিক জটিলতায় ভুগছিলেন, যখন তিনি প্রায় আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে উপনীত, তখন রবিঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’র সুর তাকে নতুন করে প্রাণ-প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল। সৃজনশীলতার বিকাশে সৃষ্টিকর্তা যে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র ভরসা হতে পারেÑ তা সেদিন ভিক্টোরিয়া টের পেয়েছিলেন। তার পরের ইতিহাসটা তো অনেকেরই জানা। রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্ব হয়েছিল প্রায় ৩০ বছরের ছোট ভিনদেশী এই কবির। ভিক্টোরিয়া রবির কাছ থেকে মানসিক পরিভ্রমণের, বিশেষ করে স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন।
যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে মানুষের চিন্তার অস্পষ্টতা ও ভাবনার দূরত্ব বিষয়ে তাদের ধারণা প্রকাশ করেছেন। মানবজীবনে সময়ের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে নিজেদের অনুভূতির কথাও ব্যক্ত করেছেন। তবে সবকিছুর ভেতরে যেন এক অবিরাম অগ্রগমন আর আনন্দধারার অনুসন্ধানে নিয়োজিত সাহিত্য-সাধকগণ। কখনো কখনো কারো কারো বাউল মন এক-অভিন্ন ও প্রিয় স্রষ্টার প্রতি নিমগ্ন হয়েছে। অদৃশ্য বিধাতার বিচিত্র-দৃশ্য রহস্য কিংবা উপাদানের প্রতিও কারো কারো প্রখর নজর নিবদ্ধ হয়েছে। দৃশ্য-দেবতার বাসনার কথাও আমরা দেখেছি সাহিত্যের নানান স্তরে ও চিন্তায়। জীবনের সমাপ্তি-জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েও কোনো কোনো সাহিত্য-শিল্পী স্পর্শ করতে চেষ্টা করেছেন নীরব অনাদি-অনন্ত সুর। সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির অপার সমাহার যে মানুষের সব প্রেরণা ও শক্তির উৎস এ বিষয়ে অনেকেই নিশ্চিত ধারণায় পৌঁছতে পেরেছেন। সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য ও সহানুভূতি প্রার্থনার প্রকাশ আছে বহু কবিতায়-ছোটগল্পে-উপন্যাসে ও নাটকে। সঙ্গীতে সঙ্গীতে বেজে চলেছে চিন্তার জড়তামুক্তি আর সর্বত্রবিস্তারি স্রষ্টার রহমতের বাণী। ‘নীরব নাথ’ ‘নীরব রাতে’ যে ‘বীণাখানি’ বাজিয়ে চলেছেন, তার কতটুকুইবা আমরা চিন্তা করতে পারি!
Dan Millman এর Way of the Peaceful Warrior উপন্যাসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এক অ্যাথলেটের জীবনকাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। লেখক ওই অ্যাথলেটের রোমান্টিক ও ম্যাজিক্যাল জীবন-জার্নিতে আলো ও অন্ধকার, শরীর, মন এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি অপার নিমগ্নতার কথা পাঠককে জানাতে চেষ্টা করেছেন। আমরা জানি, ভবের হাটের ‘সভা’ একদিন ভেঙে যাবে। মিলিয়ে যাবে মানবের কোলাহল। ‘বিশ্বগানের ধারা বেয়ে’ বাজতে থাকবে সৌরজগতের অপার সঙ্গীত। ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অনেক সংশয়ের কথাও আছে। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছেন : ‘ভগবান, ভগবান, রিক্ত নাম তুমি কি কেবলই?/ নেই তুমি যথার্থ কি নেই?/ তুমি কি সত্যিই/ আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন?/ তপন্ত তপন/ সাহারা-গোবির বক্ষে জ্বলে না কি তোমার আজ্ঞায়?/ চোখের ইঙ্গিতে তব তমি¯্রা করাল/ ভারাক্রান্ত গগনেরে করে না কি স্বচ্ছন্দে নিক্ষেপ/ উন্মত্ত, উদ্বেল আৎলান্তিকে?/ স্তব্ধ গৌরীশংকরের বুকে/ দিগম্বরী ঝঞ্ঝা, সে কি বাজায় না তোমার বিষাণ/ তাণ্ডবের উন্মথ হিন্দোলে?... আজিকে আর্তের কাছে পারিবে কি করিতে প্রমাণ/ নও তুমি নামমাত্র/ তুমি সত্য, তুমি ধ্রুব, ন্যায়নিষ্ঠ তুমি ভগবান?’Ñ সুধীনের ভাবনায় আমরা যেমন সংশয়ের উপস্থিতি দেখি, তেমনি দেখি সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি-বিষয়ে নানান রহস্যের আর উপাদানের ইঙ্গিত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসে জীবনের ব্যর্থতা আর গ্লানি বহনকারী নারী বসন্তের মুখে আমরা একটি আকুতির কথা শুনতে পাই : ‘এই খেদ মোর মনে/ ভালোবেসে মিটল না সাধ কুলাল না এ জীবনে।/ হায়! জীবন এত ছোট কেনেÑ? এ ভুবনে?’
গল্পকার জো লিওনার্দো বলেছেন : ‘ I’ve known God’s love through its many manifestations: my husband, the myriad of other Souls who came and went in my life, even my cats. But it was never enough. I wanted to know God, up close and personal.’ ¯্রষ্টা-সম্বন্ধে লিওনার্দোর ধারণা কী তা জানতে, তার একটি ছোটগল্প থেকে খানিকটা পাঠ নিচ্ছি : One fragrant spring morning, after a particularly discourse, we decided to venture to a nearby town for lunch. We drove along a stretch of country road bordered on either side by tall grasses. Suzie, her pale blue eyes large and watery, called out a tortoise had just emerged from the grasses on our right side. Following her pointing finger, we spotted it, bobbing head and all, slowly ots way across the gravelly edge of the road. Suzie was clearly distraught. `It’ll get hit by a car! We gotta stop and something! Please, let’s stop’
Our spiritual conversations had put us in a loving-all-life. Of course, we would stop and help the tortoise. How could we do otherwise? Unfortunately, while our love and compassion may have been plentiful, our talk had not oncreased our wisdom by much. Our encounter with the creature would bring a starling realization into sharp focus our little group of God-seekers.
আত্মতত্ত্বজ্ঞান বা আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারে। এটি মানসিক, পারমার্থিক ও আত্মা-সম্বন্ধীয় ব্যাপার। আত্মশুদ্ধির এক চিরন্তন ধারা। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন : ‘পয়গম্বর নবী ও রসুলÑ এঁরা ত খোদার দান!/ তুমি রাখিয়াছ, হে অতি-মানুষ, মানুষের সম্মান!/ কোরান এনেছে সত্যের বাণী, সত্যে দিয়েছে প্রাণ,/ তুমি রূপÑ তব মাঝে সে সত্য হয়েছে অধিষ্ঠান।’ তবে এ কথা ঠিক যে বিধাতার প্রতি বিশ্বাস হয়তো সবার খুব সহজে ঘটে না। এর জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য ও সাধনার। নিরন্তর পাঠ, জ্ঞান-অন্বেষাই পারে ¯্রষ্টার সাথে মানুষের মনের মিলন ঘটাতে। আধ্যাত্মবাদে নিবিষ্ট সাহিত্যিকরা সে চেষ্টাই করে চলেছেন। এশিয়ার বিখ্যাত দার্শনিক ও ধর্মীয় গুরু নোবেল বিজয়ী তিব্বতি চিন্তাবিদ দালাই লামা তার ‘দ্য আর্ট অব হ্যাপিনেস’ গ্রন্থে ¯্রষ্টার সান্নিধ্যের কথাই বলতে চেষ্টা করেছেন। সংলাপ, কাহিনী এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে তিনি সুখের প্রতি মানুষের পজিটিভ মানসিকতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন: "the very motion of our life is toward happiness." বার্ট্রান্ড রাসেলও ‘সুখ’ গ্রন্থে আত্মার সুখের সন্ধান করেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তাই মানুষের বেস্ট ফ্রেন্ড। তার মতো করে আর কেউ ভালোবাসতে পারে না। তার মতো করে আর কেউ আমাদের কেয়ার নিতে পারে না। সবকিছুই তার নির্দেশে চলেÑ তিনি সব শক্তির উৎস। কবি Corina Coburn ২০১১ সালের জানুয়ারিতে রচিত I Will See You Again কবিতায় জানাচ্ছেন ¯্রষ্টাবিষয়ক অনুভবের কথা : ‘The sun shall rise,/ and sure to set./ Her time has come,/ have no regret./ Her life she lived,/ we sure all know./A better place,/ she has to go./ Rejoice today/ it's at an end./ And she will see us,/ once again.’
মৃত্যু আমাদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়। ‘কী ঘটবে, যখন আমাদের আত্মা শরীর ত্যাগ করবে?’Ñ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা এবং এর জবাব আমাদের জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। যখন আমাদের প্রিয়জন মারা যায়, তখন আমরা বলি এবং অনুভব করিÑ ‘সে এখানে ছিল এবং এখন নেই’, ‘কোথায় চলে গেলে সে?’, ‘কোথায় গেল তার আত্মা?’ মুক্ত আত্মার চিরঞ্জীব সত্তা, তার বিশেষ থেকে নির্বিশেষে যাত্রা, সীমা থেকে অসীমে পরিভ্রমণ, আকারবদ্ধতা থেকে নিরাকারে মিলিয়ে যাওয়াÑ এই মহামুক্তির বারতা পাঠের জন্য আমরা কবি ফররুখ আহমদের ‘ডাহুক’ কবিতা থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করে বর্তমান নিবন্ধ শেষ করতে চাই: ‘গাঢ়তর হলো অন্ধকার।/ মুখোমুখি ব’সে আছি সব বেদনার/ছায়াচ্ছন্ন গভীর প্রহরে।/ রাত্রি ঝ’রে পড়ে/ পাতার শিশিরে.../ জীবনের তীরে তীরে.../ মরণের তীরে তীরে.../ বেদনা নির্বাক। সে নিবিড় আচ্ছন্ন তিমিরে/ বুক চিরে, কোনো ক্লান্ত কণ্ঠ ঘিরে দূর বনে ওঠে শুধু তৃষাদীর্ণ ডাহুকের ডাক।
জীবন আমাদের অতি সামান্য। খুব ছোট। এই ছোট্ট জীবনকে সুন্দর ও আলোকিত করতে হলে, অর্থময় ও আনন্দঘন করে তুলতে হলে তাতে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে নৈতিকতার পথ ও পাঠ। আর আধ্যাত্মিক জীবনবোধ মানবসমাজের জন্য বয়ে আনতে পারে বিরাট কল্যাণ। আর সাহিত্য যেহেতু জীবনেরই একটি বিশেষ ধারা ও অংশ, তাই এখানে নৈতিকতার প্রবেশ এবং আধ্যাত্মিকতার আলো-প্রক্ষেপণ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। হ