Naya Diganta

গতানুগতিকতা আর নয়

তিমি মাছের সুনির্দিষ্ট মিলনঋতু আছে। ঋতুকাল এলে মেয়ে তিমিরা ছেলে তিমিদের আহ্বান করে। ওই আহ্বানের সাড়া যেমন-তেমন হলে চলে না, বলতে গেলে রীতিমতো আগমনী গান রচনার প্রতিযোগিতা। ছেলে তিমি তাই ঋতুকাল এসে গেলেই অপূর্ব গুঞ্জনধ্বনির সৃষ্টি করে। সেই গুঞ্জনধ্বনি শুনে মেয়ে তিমিদের মন গললে তবেই ছেলে তিমিদের কদর। তাকে সঙ্গ দেয়া। নইলে মেয়ে তিমি গা করে না, পাত্তা না দেয়ার ভাব নিয়ে থাকে। এটা নিয়ে গবেষকরা তথ্য মিলিয়েছেন তা হলো ছেলে তিমির ওই আবাহনীগান প্রতি বছর খানিকটা বদলাতে হয়, উন্নততর করতে হয়, আপডেট করতে হয়, নতুনের সংযোজন করতে হয়, নতুন গান বাঁধতে হয়। মেয়ে তিমির ব্যাপারটা এমন যে নতুন গান যদি শুনাতে না-ই পারো তা হলে কিসের মিলন সুখ, কিসেরই বা সৃজন আনন্দ। স্ত্রী বাবুই পাখির উৎসাহে পুরুষ বাবুই শিল্পসম্মত বাসা তৈরি করে সমস্ত মেধা ও সৃজন শক্তি দিয়ে, বুক দিয়ে ঘষে মসৃণ করে, শিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করে এবং নারী বাবুইকে ডেকে তার নৈপুণ্য দেখায়, তার পর প্রেম নিবেদন করে। এই বাসা তৈরির ক্ষেত্রেও প্রতিবার বাবুইকে নতুন নতুন শিল্পকৌশল প্রয়োগ করতে হয়। স্ত্রী বাবুইর পছন্দ হলে প্রেম হয়।। তাই বাবুইকেও বদলাতে হয় কৌশল ও উপস্থাপনা।
জীবনের সব ক্ষেত্রে উপস্থাপনা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কী কাজে, কী নির্মাণে, ব্যাবসায় বাণিজ্যে এবং জীবনযাপনে। উপস্থাপনার জোরে বহুজাতিক ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের বাজারজাতে বাজিমাত করেন। প্রতিটি সময়ের চাহিদায় পণ্যের গুণাগুণ মোড়কের রঙ যেমন বদলান, তেমনি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও রয়েছে উপস্থাপনার কদর। উপস্থাপনার অভিনবত্বে ঠুনকো বিষয়ও পাঠককে, শ্রোতাকে, ভোক্তাকে আগ্রাহান্বিত করে। উপস্থাপনা যদি প্রথাগত, পশ্চাৎপদ, সেকেলে ও যুগ ও সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তা হলে পাঠককে শ্রোতাকে ভোক্তাকেও তা আর তেমন আকৃষ্ট করবে না।
অসংখ্য কবিতা রচিত হয় প্রতিদিন, কিন্তু একটি দশক পেরিয়ে গেলেও দেখা যায় রূপদক্ষ শিল্পী,সাহিত্যিক ও কবি ২-৩ জনও মেলেনি। এমনকি কখনো কখনো সময়টা আরো দীর্ঘ হয়ে পড়ে, কিন্তু কবি ও কবিতা পাঠককে তেমন আর আপ্লুত করে না। অথচ সৃজনের অভাব নেই, রূপে, ছন্দে, মাত্রায়, কিন্তু পাঠকের আবেকগ নড়েনি।অথচ কত লেখা, কত অঙ্কন সময়ের ফরমায়েশে, কেউ প্রেম নিয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ে, হারানো দিন নিয়ে, বিদ্রোহ নিয়ে, কেউ হারানো যৌবন নিয়ে, ব্যর্থ যৌন মনষ্কাম নিয়ে বা তার নতুন কৌশল নিয়ে, কেউ লিখেন মরমিয়া জীবন নিয়ে, আউল বাউল ভাবনা নিয়ে, তোয়াজ-তোষণের উপযুক্ত শব্দমালা নিয়ে, মিলমিশ দিয়ে দিয়ে ঝঙ্কার তুলে কেউ পদ্য গদ্যে স্টাইলে ভরিয়ে তোলেন কাগজের পৃষ্ঠা কিন্তু পাঠক নড়ে না/পড়েও না। যেমন কত রাজনীতিবিদ গতানুগতিক প্রথাবদ্ধ ধারায় মাইক নিয়ে চিল্লাচিল্লি করেন মাঠ জমে না কারণ প্রথায় আবদ্ধ ওই সব রাজনীতির বয়ান আর মানুষের মনে আঁচড় কাটে না। তেমনি কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক আঁকেন, গান, লেখেন বটে কিন্তু যাদের কাছে এই আবেগ আরো বেগবান হয়ে অনেক বলার মাঝে ছড়িয়ে যাবে তারা নিষ্পৃহ, নিশ্চুপ। কারণ সময় চাহিদা ও প্রেক্ষাপট এসবের কোনটাই স্পর্শ করে সৃষ্টি, উপযোগী নয় বদলমনের চাহিদার। যদিও সারা বিশে^র সময়টা এমনই যে মানুষ খুন জখম ধর্ষণ এবং গায়েবি, হুর পরি গেলমান নিয়ে, মাছির মতো লেপ্টে থাকে, তেমন নতুন চিন্তার কাছে, নতুন বোধের কাছে, নতুন জীবন প্রত্যাশার চেতনায় এখন আর লাগসই সৃষ্টি অনুপস্থিত। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে কারণের ভেতরে নয় অকারণের মধ্যেই সার্থকতা দাঁড়িয়ে পাখা ঝাপটাচ্ছে। তাই আমাদের সৃষ্টির আর তেমন উপযুক্ত ভোক্তা নেই তাই চাহিদাও নেই। আছে ধারে কাছে দূরে পিঠ চাপড়া-চাপড়ি আছে বাহবা। গতানুগতিকতায় পূর্ণ এই সৃষ্টি তাই স্তূপ হচ্ছে পৌর বর্জ্যরে মতো। চেতনা হারানোর এই কালে কবিতায় যে ভাষার উদগমন দরকার তেমন শক্তি দিশেহারানো শিল্পী-মানসের নেই বলে গতানুগতিকতা ভাঙার কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না কবিতায়; যে কারণে এই দুর্যোগ তা নির্দ্বিধায় বলা যায় সমাজজীবনে সামন্তীয় রীতিনীতি এবং চলমানতায় ঔপনিবেশিক সামগ্রিকের প্রান্তিকে উত্তর ঔপনিবেশিক মানসিকতা। এমন চিন্তা-কবজের প্রভাব থেকে মুক্ত না হলে আজকের শিল্পী কবি-সাহিত্যিকের মুক্তি নেই এবং সৃষ্টিতে প্রোটিনের অভাব ক্রমেই প্রকট হবে।
০২. আমাদের সাহিত্যিক সমাজে এই অসুখ দীর্ঘ দিনের। তাদের অনেকেই বলেন রবীন্দ্রনাথ আমাদের দৈনন্দিন। বলা কি যায় যে আমরা তা হলে ঐখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। অথচ তারকালেই তার পরবর্তী কবিরা শুরুই করেছিলেন রবীন্দ্র-ঐতিহ্য ছেদের মধ্য দিয়ে। সন্দেহ নেই রবীন্দ্রনাথ তার কালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথ তার সময়ের তার কালের চমৎকার সেবা দিয়ে গেছেন। তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির অবস্থানের মধ্যে মুক্তি ও যুক্তি দেখেছেন সামগ্রিকে নয়, সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায়গত পটভূমি তার অনেক সৃষ্টিতে ছড়িয়ে আছে। তার সঙ্গীত শিল্পের আরেক ধারা, শিল্পীরা গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, তার ওপর গবেষণায় অনেক অধ্যাপকের খানা ও পদ মেলে। কবি তার জীবদ্দশায় যেরকম কবি ঔপনিবেশিক শক্তির আরাধনা করে গেছেন তার জমিদারি, আভিজাত্য,ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তার সমাজ ও বিশ্বসমাজের কেউ একজন হয়ে টিকে থাকবার জন্য তেমন প্রাত্যহিকতা নিয়ে এখনো অনেকে মোসাহেবি, দালালি, চামচাগিরি করে সুবিধা বাগিয়ে আঁতেল হয়ে ফিরছেন। উপনিবেশ শক্তির বিদায় ঘটলেও স্বভাবের চাষবাসে তা আরো সূক্ষ্ম, সুদক্ষ, নিপুণ হয়ে তার স্থান দখল করেছে তাদেরই ভৃত্যবর্গ তাদেরই দয়াদাক্ষিণ্যে, পরাধীনতা নয় স্বাধীনতার নামে। কিন্তু বিশ্ব তো একটা গণ্ডিতে আটকে আজ আর নেই, ক্রমাগত পুঁজির একীভূতকরণের মধ্য দিয়ে সে একটা সংহত ও শক্তিশালী রূপলাভ করে এক এবং একক বিশে^র নতুন চাহিদার সৃষ্টি করে চলেছে। ফলে বদলে যাচ্ছে সমাজ রাজনীতির পুরনো ধারা এবং একই সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের অভ্যেস রুচি, গ্রহণ বর্জনের মাত্রা। তাই চিরকালীন বলে কিছু নেই, ক’জন তরুণই বা আজ রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে? যদিও না শোনাদের দেখে আমরা বিরক্ত হই এবং বলি উচ্ছন্নে গেছে, তার কারণ আমাদের মানসিকতায় রয়ে গেছে সেই কলোনির নান্দনিক ভাবনা, যার বদল ঘটেছে এরই মধ্যে। বোর্হেস রবীন্দ্রনাথকে তৃতীয় শ্রেণীর কবি বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও বোর্হেসের সময় ও স্থান আর রবীন্দ্রনাথের সময় ও স্থান একই শর্তে বিদ্যমান ছিল না। আসলে সমাজের বহিরাবরণে পরিবর্তনগুলো যত দ্রুত বিস্তৃত হয়, ততদ্রুত মানুষ তার অন্তর ভাবনা বদলাতে পারে না সেই আয়না পর্বের মতো, যেখানে আমাদের সব মূল্যবোধগুলো অনড় কঙ্করের মতো এবং যার মধ্যে মানুষ কয়েদ হয়ে আছে। পুঁজিবাদ মানুষকে অনেক বিষয়ে স্বাধীনতা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা মানুষকে এমন এক অলিক বিশ^াসের মধ্যে আটকে রাখে যার হদিস পাওয়ার মতো এখনো উপযুক্ত জাগরণের উপায় তৈরি করা যায়নি। তাই মিসটিক বিষয়-আশয়গুলো এখনো বেশ টনটনে এবং ঠনঠন করে হৃদয় তন্ত্রিতে বেজে ওঠে। লাফিয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বিদ্রোহী! না তেমন বাজে না, তবে তার ওই সব গান বেশ বেজে যায়, কারণ ওতে পালাবার উপায় আছে।
গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। সামাজিক রাজনৈতিক উত্থান ছাড়া কেউ কাউকে টেনে বার করে আনতে পারে না।
বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়