Naya Diganta

আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না

আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না

[সার সংক্ষেপ : আমেরিকা চীন ঠেকানোর (কনটেইনমেন্ট) জোট গড়তে চায়। কিন্তু এই জোটের বৈশিষ্ট্য কী হবে সেটাসহ এর চেহারা গত দুই দিনে অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের জন্য খারাপ খবর হলো, সে ‘নৌকায়’ তারা চাইলেও ভারতকে তুলে নিতে পারছে না। এটি গত ৯-১০ তারিখে তাদের নিজের মুখের কথাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটা আর্টিকেলে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলে দু’টি শর্ত যুক্ত করে আর ভারতের সেই শর্তপূরণ সাপেক্ষে ওই নৌকায় তুলে নেয়া যেতে পারে বলে ওই আর্টিকেল সিদ্ধান্ত টেনেছে। শর্ত দু’টি হলো- যদি ভারতের পতিত অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আবার জোয়ার আনা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র রাজনীতি ও দলে ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্য’ ফিরে আসে- মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করে ও প্লুরাল সমাজ গড়তে রাজি হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে এটাও পরিষ্কার যে, সাধারণভাবে ভারত তো বটেই বিশেষত মোদির সরকার এ দুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সাত মণ ঘি ঢালা হচ্ছে না, রাধাও নাচবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অন্তত একটা অর্থ হলো, বিজেপি-আরএসএসের নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করা।

সে জন্যই কি আমরা আরেকটা ডেভেলপমেন্ট দেখছি- রাশিয়ার পুতিনের মধ্যস্থতায় চীন-ভারত ‘পাঁচ দফা ঐকমত্যের’ এক যৌথ বিবৃতির ঘোষণা প্রকাশ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে এটি সমাপ্ত হয়েছে। রয়টার্সের নিউজ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায়। এর ফলে পরবর্তী বিস্তারিত দিক বিশেষত ভারত-চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর প্রায় সবকিছুতে যে অবরোধ এবং ঘোষিত-অঘোষিত বাধা আরোপ ও প্রপাগান্ডা চালু করা হয়েছে এসবের কী হবে, আমরা এর সম্পর্কে এখনো কিছুই জানি না। বিবিসি ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের এ দিকটার করুণ অবস্থা নিয়ে ‘উঠতি বহু ব্যবসার চোখে অন্ধকার’ বলে এক রিপোর্ট করেছে।]

আমেরিকা তাদের হাতের কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে। আমেরিকা কী করতে চায় বা কী আশা করে- তা আর্টিকেল লিখে প্রকাশ করে ফেলেছে। অনেকে এ পর্যন্ত এটা-সেটা বলে পেটের কথা বাইরে আনতে চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। ফাইনালই তারা এখন উপস্থাপনের একটাই ভাষ্য ঠিক করেছে। গুছিয়ে থিতু হয়ে বলা সেই ভাষ্যটা হলো- এশিয়ার দেশগুলো কোনদিকে যাবে; চীনের বেল্ট-রোডে নাকি আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে, সেটা তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের চ্যানেল২৪ টিভি একটা নিউজ প্রচার করছে, তাতে বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলার বাংলাদেশ এটা না ওটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এখানে ‘চোঙ্গা ফুকতে’ দেখা গেল। তবে কোনোটাই না নেয়ার অপশন আছে কি না স্পষ্ট বোঝা যায়নি। ফলে যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে ‘চীনা প্রভাব’ ছুটানোর জন্য ভারতীয় সর্বাত্মক তৎপরতা চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে হাজির হয়েছে, তাদের অনুমান ‘ভুল’। বিষয়টা হলো- এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে একটা শেষ লড়াই লড়ার খায়েশ এখন আমেরিকার দুই দলেরই (বাই-পার্টিজান) খায়েশ, এই হলো বাস্তবতা। খালি তফাত এটুকুই যে, ট্রাম্প জিতলে একটু কৌশলে ভিন্নতা থাকবে যেটা বাইডেন জিতলে তুলনামূলকভাবে সফট কৌশল হবে। অর্থাৎ এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকান লড়াইয়ের চেষ্টা হবে আসন্ন আমেরিকান নির্বাচনের পরের বিজয়ী প্রশাসনের হাত দিয়ে। কিন্তু লড়াই একটা কমবেশি হবে সেটা নিশ্চিত।

সেটা হলেও এটাকে শেষ লড়াই বলছি এ জন্য যে, ঠিক এটাই ওবামার প্রথম টার্মে চেষ্টা করা হয়েছিল ২০১১ সালে ‘এশিয়া পিভোট’ নাম দিয়ে যা ওবামার সেকেন্ড টার্মেও বিস্তৃত থাকলেও বোঝা গিয়েছিল যে, এটা অকেজো, কাজ করছে না; মানে ভুয়া চেষ্টা। ব্যাপারটা সার কথায় বললে, ‘পিভোটে’ অনুমানে ধরে নেয়া হয়েছিল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করে, চীন এক আগ্রাসী শক্তি। আর তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে একটা চীনবিরোধী জোটে আমেরিকা শামিল করতে পারবে বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান সঠিক ছিল না। তাই এটা ফেল করে যায়, কারণ এশিয়ার দেশগুলো বলতে চায়- চীনের অনেক কিছুতেই তাদের বিরোধিতা বা অপছন্দ থাকলেও সে জন্য আমেরিকান নেতৃত্বে কোনো চীনবিরোধী জোটে বা যুদ্ধজোটে তাদের ঢুকতেই হবে, এটি হবে আত্মঘাতী। এতে ‘ওভার অ্যাক্ট’ করা হয়ে যাবে। এর চেয়ে চীনের সাথে যদি কোনো দেশের সীমান্তবিরোধ থাকে তা নিয়ে আপত্তির কথা নিয়মিত বলে যাওয়া ও ডায়ালগের চেষ্টা করে যেতে হবে।

আর একই সাথে, উঠতি অর্থনীতির চীনের সাথেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা হবে নিজ দেশ পরিচালনার সঠিক কৌশল। কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনার মধ্যে নিজ দেশকে ফেলে দেয়ার মানে হবে অর্থনৈতিকভাবে নিজ দেশকে শেষ করে দেয়া। কাজেই ওই আমেরিকান কৌশলে প্রায় কেউই নামেনি। তাই ওবামার শেষ বছর, পুরো ২০১৬ সালটাই ছিল আসলে তার ‘পিভোট’ গুটানোর বছর। কিন্তু পরের ট্রাম্প আমলে নিজের টার্মে চীনবিরোধিতাও তিনি অবশ্যই করেছেন, কিন্তু নিজে জাতিবাদী আমেরিকান হিসেবে কোনো জোট গড়তে অনাগ্রহী থাকেন। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের পেন্টাগন আগে ‘চীন ঠেকানোর’ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারা জারি রাখা বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলোর গাইড হিসেবে যে ভূমিকা রাখছিল সে কাজ থেকে পেন্টাগনকে প্রত্যাহার করে নিতে হয়। এ কারণে গত দুই বছর ধরে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আবার নিজেরাই ‘চীন ঠেকানোর’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। এবারের এই মিশনের মুখ্য ভূমিকায় আছে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’। এর ভূমিকাটা হলো, প্রায় সর্বক্ষণ মোদি সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখছে জয়শঙ্করের মাধ্যমে। এ ছাড়া ভূমিকা রাখছিল থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্ট’।

এই অ্যান্ডোমেন্ট সেই বুশের আমলে ২০০৬ সাল থেকে ভূমিকা রাখছে। তখন থেকে যার রেজিস্ট্রার্ড ইন্ডিয়ান শাখা আছে। ভারতের চীনবিরোধী বয়ান ভাষ্য যা আমরা ভারতে দেখি বিশেষত সব ভারতীয় থিঙ্কট্যাংকের যে কমন অবস্থান, এটাকে সাজিয়ে দিয়েছে এই কার্নোগি অ্যান্ডোমেন্ট। যেমন চীন ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলছে বা চীনা ঋণের ফাঁদে সবাইকে ফেলছে ইত্যাদি। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নিজের জাতিবাদী রাজনীতি হাজির করার আগে পর্যন্ত অ্যান্ডোমেন্ট প্রবলভাবে ভারতে নিজের ফান্ড ঢেলে তৎপর ছিল। নিয়মিত তরুণদের মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য স্কলারশিপ বরাদ্দ করেছে আর ওসব বয়ান মুখে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান তাদেরকে এর পর থেকে তৎপরতা ছোট করে আনতে বাধ্য করেছিল। এই কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে এশলে জে তাল্লিস আমেরিকান আগামী সম্ভাব্য অবস্থানের ডকুমেন্টটা তৈরি করেছেন। এই লেখাকে কার্নেগি অ্যান্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক পলিসি ব্রিফিং হিসেবে উল্লেখ করে হিন্দুস্তান টাইমসে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে। লিখেছেন মঞ্জরি চ্যাটার্জি মিলার, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির প্যাড্রি স্কুলের অধ্যাপক। তিনি নিজের লেখাটা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে- ‘আমেরিকার দীর্ঘ দিনের এক খায়েশ, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে কাজে লাগায়। ভারত কী তা করবে?’

ওই পুরো লেখাতেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো এই ‘কাউন্টার-ওয়েট’, বাংলায় চীনের পাল্টা ওজনের বাটখারা। অধ্যাপক মঞ্জরি এশলের এই লেখাটা ছাড়াও আরেকটা লেখার কথা তুলেছেন। তা হলো- ড্যানিয়েল টেনরিরোর লেখা; যার শিরোনাম ‘এশিয়ায় চীনের পাল্টা বাটখারা হিসেবে ইন্ডিয়া’।

ড্যানিয়েলের লেখাতে পরিষ্কার যে, ভারতকে চীনের কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে এশিয়ায় পাওয়া- এর প্রয়োজনটা ভারতের না, খোদ আমেরিকার ও ড্যানিয়েলের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টদের। তাই ড্যানিয়েল বা মঞ্জরি আশা রাখছেন, ভারত কি আমেরিকার হয়ে এই ভূমিকায় নামবে? কিন্তু কেন?

কারণ তাদের চাহিদা হলো- চীনের পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে হতে হবে আমেরিকার হাতের পুতুল। চীনের মতো না হলেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হতে হবে। আর মি. এশলে কোনো লাজলজ্জার বালাই না রেখে বলেছেন, ভারত বা সেই পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে দু’টি শর্ত মানতে হবে- ‘ইকোনমিক অগ্রগতি’ ফেরত আনতে হবে আর ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্যের’ হতে হবে।

কিন্তু কেন এশলেকে ভারতের নাম শর্ত আকারে বলতে হলো? এশলে লেখাটার শিরোনাম হলো ‘বড় লিগে যোগ দিতে হলে ভারতের রাস্তা’। আসলে এশলে তার লেখাটা শুরুর আগেই বুঝে গেছেন, ভারত তাদের পেয়ারের কাম্য চীনের পাল্টা হবু ওজনদার দেশ হচ্ছে না। তাই তিনি আসলে লিখতে বসেছেন- কেন ভারতকে দিয়ে হবে না। সে কারণে উল্টা করে লিখতে বসেছেন কোন শর্ত পূরণ করলে হবে। যেখানে এশলে জানেন, এই শর্ত ভারত পূরণ করতে পারবে না। তাই তিনি শর্ত লাগিয়ে বলছেন।

আবার সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখে বললে, এশলে অ্যান্ড গং-এরা চীনের কাউন্টার-ওয়েট বলে কাউকে খুঁজেই পাবে না যদিও ভারতের প্রবল আর বিশেষ ‘খামতি’ আছে। কিন্তু ভারতের খামতি না থাকলেও এশলেরা ভারতকে বেছে নিতে পারতেন না। কেন?

কারণ আমেরিকার দরকার এমন এক ভারত যাকে সে চীনবিরোধী তাদের মডেল দেশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। চীন খারাপ, চীন আদর্শ না, চীন কথিত লিবারেল দেশ নয়, ইত্যাদির বিপরীতে যেন তারা ভারতকে তুলে ধরতে পারে- ভারত আমেরিকার চোখে আদর্শ দেশ, এভাবে। আবার ভারতকে এমন আদর্শ দেশ বলে ফুলানোর কী দরকার? দরকার এ জন্য যে, ভারত লিবারেল- এই প্রশংসা করে এর বিনিময়ে ভারতের ওপর মাতব্বরি করতে চায় আমেরিকা, তাদের বিপুল বিনিয়োগ আর লাভালাভের কেন্দ্র বানাতে চায় ভারতকে। সে জন্য ভারতে তাদের ইচ্ছামতো একটা সংস্কার করে সাজিয়ে নিতে চায়। যেমন- এশলের লেখায় আরো দু’টি বিশেষ শব্দ আছে- ‘ফাস্ট-গ্রোয়িং ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’। এর মধ্যে সোনার পাথরের বাটিটা হলো ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’। এখানে ‘ফ্রি মার্কেট’ শব্দের সাথে ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দের কী সম্পর্ক? এসবের অর্থহীন কথা ও শব্দের ভেতর দিয়ে তারা বুঝাতে চায়- ভারতকে আমেরিকার ডমিনেটেড বাজার ব্যবস্থা করে গড়ে পেতে চায় তারা। কিন্তু জবাব দিতে চায় না ভারত কেন এটা তাদেরকে দেবে?

যে কথা বলছিলাম, ভারতের নিজস্ব অন্য খামতি নাই তা নয়। যেমন ভারতের রুট সমস্যা তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’। মোদি বলতে ভালোবাসেন, তিনি আত্মনির্ভর অর্থনীতির লোক। ভালো কথা। তার যা ইচ্ছা হতে চান, হবেন। কিন্তু মোদি তাহলে আবার রফতানি করতে ডলার গুনতে ভালোবাসেন কেন? ওসব ডলার পেয়ে জমিয়ে তিনি কী করবেন? ডলার জমানো মানেই তো তিনি আমদানিও করবেন! তাহলে উনার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ কোথায় রইল? আবার মোদির খুব খায়েশ কেবলই রফতানি করা। যেন সবাই তাকে রফতানি করতেই দিক! অথচ এটা তো অসম্ভব। তবু ভারতের খায়েশ, দরকার হলে সুযোগ পেলে অন্যকে পুরনো কায়দায় কলোনি শাসন করা। আবার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ তার বাস্তবে যতটা না দরকার এর চেয়ে বেশি শব্দটা প্রপাগান্ডা হিসেবে দরকার। কারণ উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোস তুলতে তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ শব্দগুলোর প্রপাগান্ডা-মূল্য অনেক। এই কথিত জাতিবাদী স্বদেশিয়ানার উদ্ভট ধারণা বিজেপির একার নয়, নেহরু আমল থেকেই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের অবস্থানই এটা; কমবেশি এটা একই সমস্যা ভারতজুড়ে।

মজার ব্যাপারটা হলো, একমাত্র চীন-ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বেলায় এই সমস্যাটার তুলনায় কম। কারণ চীন ব্যাপারটা দেখে এ জায়গা থেকে যে, তার পার্টনার সমস্ত সমস্যারই ডিপো হতে পারে। তাই এটা ধরে নিয়েই চীন পার্টনারের সমস্যা কী সেদিক থেকে না গুনে বরং প্রাকটিক্যালি মাঠে ঠিক কী হলে চীন কাজ করতে পারে সেটা পূরণ আছে কি না সেদিক থেকে মাপা শুরু করে। নইলে বলে দেয়, সে পারবে না। এ জন্য চীনের সাথে ভারতের কাজের সম্পর্ক তুলনায় ভালো। আর চীনের অ্যাপ্রোচ ব্যবহারিক দিক থেকে বলে ভারতীয়রাই বদলে যায়; মেনেও নেয়। কারণ তারা দেখে তারা এই ব্যবহারিক বদলটা না করলে চীনের সাথে সম্পর্ক বা ডিলটাই হবে না। চীনাদের এই অ্যাপ্রোচে সুবিধার দিক হলো- পার্টনারের মধ্যে প্রবলেম কী এটা নিয়ে আগেই তারা ঝগড়া করে না। যাই হোক, সার কথাটা হলো- আমেরিকানদের সাথে কোনো ভারতীয় জাতিবাদী একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাতে দোষ কার অথবা কে কতটা ভালো-মন্দ সে আলাপ তুলে রাখি।

তাহলে এখন কী হবে?
বাস্তবতা ভারতের সাথে আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ কাউন্টার ওয়েট হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের কোনোই সম্পর্ক কার্যকর হচ্ছে না; যদিও এমন ভাব নেয়া অঙ্গভঙ্গি সম্ভবত জীবিত থাকবে। অনেক সময় প্রমাণিত সত্য জিনিস মেনে নিতে কষ্ট হয়। তেমন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মোদির কাছে প্রমাণিত যে, চীন তার হিন্দুত্বের রাজনীতির জন্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প। তবু চীনের বেলায় যেটুকু সঙ্ঘাত বারবার সামনে এসে পড়বেই সেটা বারবার এড়িয়ে হলেও মোদি চলতে পারবেন। কিন্তু যেটা সহসা চীন-ভারত সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরতে দেবে না তা হলো- সারা ভারতে ‘চীন আমাদের শত্রু’ বলে যে ক্যাম্পেইন ভারত চালিয়েছে তা সহসাই লোপ পাবে না।

আবার অন্য দিকে, আমেরিকা ও তার বন্ধুরা যেটাকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’ বলে ড্রাম পিটাচ্ছে এই প্রপাগান্ডা সহসাই থেমে যাবে না; ভারতের সাথে সম্পর্ক হোক আর নাই হোক তা জারি থাকবে। দ্বিতীয়ত, এর আরেকটা নাম আছে এশিয়ান-ন্যাটো। মানে ইউরোপে যেমন ১৯৪৫ সালের পরে সোভিয়েতবিরোধী সবাইকে ন্যাটো সামরিক জোটে জড়ো করা হয়েছিল, সেই ন্যাটোই যেন এবার এশিয়ায় জাগতে যাচ্ছে এমন ভাব শুরু করেছে। মোদির প্রো-আমেরিকান মন্ত্রী জয়শঙ্কর তাই একবার বলেন, ভারত জোটনিরপেক্ষ দেশ; আরেকবার বলেন, এশিয়ান ন্যাটোর কথা। ব্যাপারটা নিয়ে জয়শঙ্করের সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন প্রচণ্ড ক্ষেপা এমকে ভদ্রকুমার, তিনি এক সিনিয়র সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ও কলাম লেখক।

তামাশার দিকটি হলো- এই জয়শঙ্করই আবার মস্কোতে সাংহাই করপোরেশনের মিটিংয়ে হাজির হওয়ার উছিলায় চীন-ভারত মস্কোর মধ্যস্থতায় যে পাঁচ দফা আপস সমঝোতা করল সেখানে ভারতের প্রতিনিধি। জয়শঙ্করের গা থেকে তখনো আমেরিকান কোনো ডিনারের ঢেঁকুর উঠছিল হয়তো। রয়টার্সই একমাত্র এর ব্যাপক রিপোর্টিং করেছে। তাতে তারা দু’টি ছবি ছেপেছে যেখানে রাশিয়া, চীন ও ভারতের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তিনজনই ‘ফানি’ভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলেছেন, যেটা অবশ্যই কূটনৈতিক আচরণ নয়; যেন আমেরিকাকে তিনজনে ঠাট্টা করতে এসব করেছেন। এর বটম লাইনটা হলো, চীন-ভারতের সম্পর্ক সহসাই আগের লেভেলে ফিরে যাচ্ছে না। আর দ্বিতীয়ত, চীন ঠেকানোর কাজে ভাটা পড়লে আমেরিকার কাজের অভাবেই মারা যাবে! একমাত্র একটু ভরসা, নির্বাচনে বাইডেন যদি জিতেন। সে ক্ষেত্রে চীনের থেকে বাণিজ্যে অনেক বড় ছাড় আনতে পারবেন তিনি। ফলে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্যযুদ্ধের অনেকটাই স্মৃতিতে পেছনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন অনেক বেশি চীনকে ঘায়েল করবেন। এ ব্যাপারে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মার্ক এস্পারের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনকল তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া ‘রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তার’ ওপর জোর দিলেও ঢাকার দূতাবাসের বিবৃতিতে ‘একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির’ ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর অভ্যন্তরীণ আমেরিকান মেসেজটা হলো- যেন বলতে চাচ্ছে, আমরা চীন ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্তভাবে চেপে ধরতে আসছি। ফলে আমরাও আপনার কাছে গুরুত্ব চাই। ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে তাই আমাদের ক্যাম্পে আসুন। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা পাচ্ছে না, আপাতত এটাই সারকথা মনে হলেও মিয়ানমার বা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য এগুলো ডমিনেটিং বিষয় হতে যাচ্ছে সম্ভবত। তবে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোথায় সম্পর্কিত তা এই ফোনকল স্পষ্ট করতে পারেনি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]