Naya Diganta

তন্ময় পৃথিবী মন্ময় জীবন

‘প্রতি নিঃশ্বাসে বপন করি প্রার্থনার বীজ
আমি হৃদয়ের কৃষক
দিন ও রাতজুড়ে দেখি পুনর্মিলনের মুখ
আমি খোদার আয়না
প্রতি মুহূর্তে গড়ি নিজের ভাগ্য
আত্মার কাঠমিস্ত্রি আমি নিজেই।’
Ñজালালুদ্দিন রুমি
অসীমের প্রতি অনুরক্ত থেকে আত্মতত্ত্ব-জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজে চলেছে কাল থেকে কালান্তরে। নানা মত ও নানা পথ ধরে আজও সংসার ত্যাগী এক শ্রেণীর মানুষ গুংঃরপরংস বা মরমিবাদের ক্ষীণ ধারাকে প্রবাহিত রেখেছেন। এদের কেউ বাউল, কেউ বয়াতি, কেউ বা বৈষ্ণব-ফকির বলে আখ্যায়িত। আজও এ দেশের হাটে-মাঠে-ঘাটে একতারা/দোতরা হাতে এদের অবাধ বিচরণ লক্ষণীয়। আজও লোকায়ত জীবনে চারণ-কবিদের পদচারণা উঁকি দিয়ে যায়। বাংলা ভাষায় মরমী সাহিত্যের উপাদান খুঁজতে হলে, দৃষ্টি দিতে হবে বাঙালির নাড়ির এসব লোকগাথা, বাউল, কীর্তন, জারি-সারির দিকে। কেননা এগুলোর মধ্যে গ্রোথিত থাকতে পারে আধ্যাত্মিক কোনো গূঢ়তত্ত্ব, যা গুংঃরপরংস বা মরমিবাদের মূলকথা।
‘মিষ্টিসিজম’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অতিন্দ্রিয়বাদ বা মরমিবাদ। অতিন্দ্রিয়বাদ হচ্ছে এমন এক গূঢ়তত্ত্ব, যা স্রষ্টা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্থাৎ সর্বত্রই বিরাজমান তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি। বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান, ইহুদি-প্রত্যেকটিতে অতিন্দ্রীয়ের চর্চা অদ্যাবধি চলে আসছে। পথ, মত ও পদ্ধতি হয়তো ভিন্ন, কিন্তু উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক। আর এর প্রভাব বিশ্বের প্রচলিত সব ভাষার সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা ও গানে অতি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
বাংলা সাহিত্যের আদিপর্ব অর্থাৎ চর্যাপদ থেকে আধুনিক কাব্য ও সঙ্গীতপ্রবাহে চিন্তার স্পষ্টতায়, ভাষার স্বচ্ছতায়, উপলব্ধির গূঢ়তায়, প্রত্যয়ের দৃঢ়তায় মরমিচেতনা তীক্ষè ও বহুকৌণিক পাঠক্রিয়ার এক অসাধারণ ব্যতিক্রমী নমুনা।
ইংরেজি সাহিত্যে মহাকবি দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রূপক কাব্য। এ কাব্যের উপজীব্য বিষয়Ñ মানবাত্মার পরমাত্মার সন্ধান লাভ। মানবাত্মার বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে স্বর্গলোকে পরিপূর্ণ আত্মিক উপলব্ধি ও মোক্ষলাভ। সেকশপিয়র তার নাটকে জীবনেররহস্য অনুধাবন করতে চেয়েছেন। ম্যাকবেথ নাটকে জীবনের সব দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের শেষ অন্তিম মুহুর্তে নায়ক উচ্চারণ করছে জীবনের অসারতাÑ ওঃ রং ধ ঃধষব ঃড়ষফ নু ধহ রফরড়ঃ, ভঁষষ ড়ভ ংড়ঁহফ ধহফ ভঁৎু, ংরমহরভুরহম হড়ঃযরহম। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও শেলীর সাথে বাঙালি পাঠক মাত্রেই পরিচিত। ‘স্কাইলার্কের’ কবি শেলী যার কল্পনা উদ্দাম উধাও হয়ে অনন্তে ধাবমান। অমর শিল্পী বিটোফেনের সুর-সৃজনেও সেই একই তন্ময়তা। উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যের মহত্তম কবি মির্জা গালিবের কবিতাÑ ‘হম কঁহা হোতে, অগর হুসন না হো খুদবি’Ñ আমরা কোথায় থাকতাম যদি রূপ আত্মদর্শী না হতো।
জার্মান সাহিত্যের প্রধানতম প্রাণ-পুরুষ গ্যোটে, রাশিয়ান কবি পুশকিন, উর্দু সাহিত্যের আল্লামা ইকবাল প্রমুখ দার্শনিক মনীষীদেরও জীবন সম্পর্কে প্রায় একই জিজ্ঞাসা। এই জিজ্ঞাসাই গুংঃরপরংস তথা অতিন্দ্রিয়বাদের মূলকথা। আধুনিক বাংলা কাব্য ধারায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিহারিলাল মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন প্রমুখ এদের দ্বারাই প্রভাবিত।
‘মিষ্টিক’ শব্দটি এসেছে গুংঃরপরংস থেকে। গুংঃরপরংস এসেছে ‘সুবরহ’থেকে যার অর্থ ‘চোখ বন্ধ করা’। গুংঃরপরংস-এর বাংলা প্রতিশব্দ মরমিবাদ। তবে অতিন্দ্রিয়বাদ অর্থেই আমরা ব্যবহার করে থাকি। আগেই বলেছি অতিন্দ্রিয়বাদ এক গূঢ় তত্ত্ব, যা স্রষ্টা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং তার উপলব্ধি বোঝায়। অধ্যাত্ম-বিজ্ঞানের চরম কথাÑ আমি কে, আমি কেন? সাধারণত আমরা মনে করি, আমরা অতিক্ষুদ্র, আমরা অতি সীমাবদ্ধ, আমরা জন্ম-মৃত্যুর অধীন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা বিরাটও বটে, অসীমও বটে। ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্র শিশু যেমন আতঙ্কে কেঁদে ওঠে, বুঝি তার সর্বনাশ হলো। তেমনি আমরাও দুঃখ, দৈন্য ও মৃত্যু দেখে শঙ্কাবোধ করতে থাকি। অথচ আমি সগুণও বটে নির্গুণও বটে, সসীমও বটে অসীমও বটে। অতএব, এই ‘আমি’কে প্রত্যক্ষ করাই যরমযবৎ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ড়ভ ড়ঁৎ বীরংঃবহপব.
বিশ্বের প্রায় সব ধর্মের সাধকগণ ‘আমি কে’ প্রশ্ন করে করে মূলে পৌঁছে দেখেছেন-স্রষ্টাই সবÑ‘আমি’ তাঁরই আনন্দময় একটি সুন্দর প্রকাশ মাত্র। স্রষ্টা থেকে আমি পৃথক নই। তাঁর থেকে পৃথক কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তাঁকে দেখবার চোখ নেই বলেই আমাদের আত্মার অনন্ত বেদনা ও অবিরাম ক্রন্দন।
আমি কে? এই প্রশ্ন করে যদি নিজেকে জানার চেষ্টা করি তবে দেখব, আমার যত দুঃখ-শোক, দৈন্য, অভাব-অতৃপ্তির মুখ্য কারণ একমাত্র আমিই। আমি-চেতনা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ আমি ক্ষুদ্র, বস্তুসচেতন ও অতৃপ্ত। এই আমি চেতনা বা আমি-চিন্তা থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টাই হলো গুংঃরপরংস-এর একমাত্র লক্ষ্য।
সম্ভবত এ কারণে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘ফাকাদ্ আরাফা নাফছাহু, ফাকাদ্ আরাফা রাব্বাহু’Ñ অর্থাৎ যে নিজেকে জানতে পারে, সে তার প্রভুকে চিনতে পারে।
মহামতি দার্শনিক সক্রেটিসও বলেছেন, শহড়ি ঃযুংবষভ। ভারতীয় ষড়-দর্শন তথা বেদান্তের চিন্তানায়ক স্বামী বিবেকানন্দের উক্তিÑ আত্মানং বিদ্ধি, অর্থাৎ নিজেকে জানো। মহামতি গৌতম বুদ্ধেরও প্রায় একই উচ্চারণÑ ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’Ñ অর্থাৎ প্রভুর স্মরণেই নির্বাণ।
মূলত ইন্দ্রিয়গত দৃষ্টিশক্তির সীমা খুব বেশি দূরগামী নয়। মরমি সাধকগণ চোখ বন্ধ করে অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর চিন্তা-তন্ময়তার দ্বারা সত্য ও সুন্দরকে উপলব্ধি করতে প্রয়াস পান। এই প্রয়াসে মনীষা ও ভাবাবেগের এক প্রকার সংমিশ্রণ ঘটে। এই মিশ্রণের বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ রূপক ও উপমা ছাড়া সম্ভব নয়। এই সহজ তত্ত্বের সহজ উপলব্ধি একমাত্র বিশুদ্ধ প্রেমের দ্বারাই সম্ভব।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কি কবিতা কি গানে গুংঃরপরংস-এর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। চর্যাপদের আদি সিদ্ধাচার্য লুইপা বাংলা সাহিত্যের আদি কবি বলে আখ্যায়িত। অপর সিদ্ধাচার্য কানুপা বলছে, ‘ভরকইসে সহজ বোলবা জাই কাঅ বাক চিন জসুন সমাই।’ অর্থাৎ বলো কী করে সহজতত্ত্ব বলা যায়, কায়বাক্য-চিত্ত যাতে প্রবেশ করতে পারে না।
বাংলার আউল, বাউল, মারফতি ও মুর্শিদী গানের মধ্যে হেঁয়ালি কথায় চর্যাপদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব আজো স্পষ্টতর। চর্যাপদের গুঞ্জরি, বঙ্গাল, পটমঞ্জুরি, বরাড়ী, দেশাখ, ধানশী প্রভৃতি রাগ-রাগিনী, বাংলা সঙ্গীতের এই যে গানের ধারা, তা বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলী থেকে আরম্ভ করে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পর্যন্ত চলে আসছে।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের আর একটি বিশেষ ধারা, যা সুফিতত্ত্বকে আশ্রয় করে উদ্ভূত ও বিকশিত হয়েছে। সুফিতত্ত্বের মর্মকথা : হৃদয়ে তোমার চলে যেন আলিফের (আল্লাহ) খেলা। পবিত্র দৃষ্টি দিয়ে যদি তুমি জীবনকে দেখতে শেখো, তুমি জানবে আল্লাহর নামই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রেমময় ও সৌন্দর্যময়। তিনি অনন্ত, অবিনশ্বর ও সর্বত্র বিরাজমান। প্রেম ও ভক্তির পথে আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারাই তাঁকে পাওয়া যায়। আল্লাতে অনুগত বা লীন হওয়া সুফি সাধকের চরম লক্ষ্য।
বলাবাহুল্য, ইন্দ্রিয়মুক্তি ও চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নিকট নিঃশর্ত আত্ম-সমর্পণের সাধনাই সুফিদের আধ্যাত্মিক সাধনা।
সুফিগণ মানবসেবার কাজেও নিজেদের জীবন কোরবান করেছেন, কেননা মানবসেবাকে তারা একটি পবিত্র ব্রত এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বলে বিশ্বাস করেন। সুফি-শ্রেষ্ঠ জালালুদ্দিন রুমী বলেছেন : ‘মানুষের হৃদয় জয় করাই হলো সবচেয়ে বড় হজ।’
বাংলা ভাষায় সুফিতত্ত্ব বিষয়ে বেশ কিছু মৌলিক শাস্ত্র-কাব্য এবং পদাবলি রচিত হয়েছে। এগুলোতে সৃষ্টিতত্ত্ব, যোগতত্ত্ব, ধর্ম ও নীতিবিষয়ক বর্ণনা আছে। এ ছাড়া দেহতত্ত্ব, জন্ম-মৃত্যুর রহস্য ইত্যাদির বর্ণনাও পাওয়া যায়। সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানপ্রদীপ ও জ্ঞান চৌতিশাকাব্যে দরবেশতত্ত্ব, এবাদত, আত্মতত্ত্ব, জিকির, ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি রয়েছে। সুফিতত্ত্বের কবিরা আবেগ, উপলব্ধি, আবেদন, নিবেদন ইত্যাদি সরাসরি কিংবা রূপক-প্রতীকের মাধ্যমে ব্যবহার করেছেন। এযাবৎ প্রায় শতাধিক মুসলমান পদকর্তার নাম জানা যায়।
প্রথম শ্রেণীর পদকর্তা হিসেবে আইনুদ্দীন, আফজাল, আলাওল, আলী রজা, শেক কবির, শেখ চাঁদ, সৈয়দ মর্তুজা, সৈয়দ সুলতান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলার মুসলমানদের সুফিধর্ম সাধনা ও তত্ত্বচিন্তা এবং তার অন্তর্মুখী ভাবনার পরিচয় এদের কাব্য-গাথায় নিহিত রয়েছে। এসব কাব্য-গাথা সে কালে মুসলমানদের ঘরে ঘরে সুর করে পাঠ করা হতো।
আসলে সব ধর্মই একটা বিশিষ্ট ভঙ্গি লয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে মরমি বা মিষ্টিক কবিতার রূপ গ্রহণ করেছিল। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে কত যে বিচিত্র অধ্যাত্ম-সাধনার পন্থা দেখতে পাওয়া যায় তার অন্ত নেই।
বাউল তথা যোগী-দরবেশদের সাধনা মূলত বিশুদ্ধ প্রেমভিত্তিক। বাউল দর্শনের প্রধান কথা-ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করা, নিয়ন্ত্রিত করা, ঊর্ধ্ববাহু করা। এদের সমস্ত সাধনা, ধ্যান-ধারণা জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, বিশেষত দেহ ও নাড়িজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। এই সাধনা জীবনরহস্য উদঘাটনের সাধনা, সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মূলতত্ত্ব সম্যকভাবে জানা।
লালন শাহ বাউলদের রাজা। লালন ফকির যে একজন অসাধারণ প্রতিভাশীল লোক ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। তার খোঁজখবর তেমন কেউ রাখত না বলে রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলেছেন, আমাদের আশপাশের খবর আমরা রাখি না। লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে জানা যায়।
লালন শাহকে আমরা তার অফুরন্ত সাধন-সঙ্গীতের ভাবরসে স্পষ্ট করে পাই। সুফি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলেও মূলত তিনি ছিলেন বাউল তত্ত্ববাদী এক মরমি কবি। কাছে থেকেও যিনি দূর রচনা করেন, যাকে পেলে সব শোক-দুঃখ ও ভবযন্ত্রণা থেকে মুক্তিলাভ হয় এবং যে সাঁই বস্তুরূপে শুরু করে অনন্তরূপে প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলেন, তাকে খোঁজাই ছিল লালনের জীবন-সাধনা। তাই দেহকে জরিপ করে অর্থাৎ বস্তুচেতনার ভেতর দিয়ে তার অলক্ষ্য পড়শীর সন্ধান শুরুÑ ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’ সীমা-অসীমের তত্ত্ব লালন বিস্ময়কর সহজতায় ও সঙ্গীত-রসে প্রকাশ করে বলেছেন, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। বাউল সাধনার গূঢ়-যোগক্রিয়া, মরমিবাদের সাঙ্কেতিক শব্দচিত্র ও নানা তত্ত্বকথার অবতারণা করলেও লালনের সহজ কবি-মন সেই পরম-জনের সন্ধানে কেমন উচ্ছ্বাসিত ও অধীর হয়ে উঠেছে, যখন শুনিÑ ‘আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যেরে।’
রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার সাথে লালনের আধ্যাত্মিকতার একটি সগোত্রতা আছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুরেরও। যেমন লালনেরÑ ‘যা করবি তুই এই দুনিয়ায়, সেই জিনিস তোর সঙ্গে যাবে’Ñ গানটির সুর সাদৃশ্যে রবীন্দ্রনাথ তার ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি/নিয়ে যাবি কে আমারে’ গানটির সুররূপ দিয়েছিলেন। আসলে লালনের ভাব-সাধনার দ্বারা রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিলেন।
লালন শাহর সঙ্গীত আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ দেশে বাউল গানের অন্ত নেই। সহজ ও স্বচ্ছন্দ প্রকাশভঙ্গির ভেতর দিয়ে কতকালের ক্রম বিবর্তিত সাধনা ও লোকোত্তর চেতনায় সমৃদ্ধ বাউল হৃদয় উচ্ছ্বাসিত ও আবেগদীপ্ত হয়ে উঠেছে। তাই লালন সঙ্গীত তথা বাউল গান আমাদের আধ্যাত্মিক এক বিশিষ্ট অংশ অধিকার করে আছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবিভক্ত বাংলার সিলেট অঞ্চলের আরো দু’জন সমসাময়িক মরমি কবি হাসন রাজা ও রাধারমণের নাম ও ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হাসন রাজার গান আজও সিলেটের নরনারীর কণ্ঠে কণ্ঠে ঘোরে ফেরে।
হাসন রাজা জমিদার হয়েও অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। নিজের ঘরবাড়ি সম্পর্কে তাঁর জনপ্রিয় সেই গানটিÑ ‘লোকে বলে, বলেরে ঘরবাড়ি ভাল না আমার। কি ঘর বানাইলাম আমি শূন্যেরও মাজার।’ তার ‘হাসান উদাস’ গ্রন্থ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সমভাবে আদৃত। অসংখ্য বাউল গান রচনা করেছেন তিনি। তার গানে অপূর্ব কবিত্ব শক্তি রয়েছে। ভাষা অত্যন্ত সরল ও উদার। হাসন রাজার তত্ত্বমূলক আর একটি গান ‘রূপ দেখিলামরে নয়নে/দেখিলামরে আপনার রূপ, আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল মোরে।’
রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায় অলৌকিক জ্যোতির্ময়তা তখনই সম্ভব যখন চিত্তে আনন্দ রূপলাভ করে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার গানের মধ্যে সঞ্চিত হয়েছে দিনে দিনে আলোকের প্রকাশ-সৃষ্টির প্রথম রহস্য আর সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত।’ কবি বিশ্বাস করতেন, বিশ্ব-ব্রহ্মাÑ এক মৌলিক সঙ্গতিতে সংরক্ষিত। বিভিন্ন কবিতায় তিনি এই সঙ্গতির সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছেনÑ ‘ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে... তোমার বীণায় কতনা তার আছে, কতনা সুরে/আমি তার সাথে আমার তারটি দিবগো জুড়ে।’ এই উপলব্ধিতে মিষ্টিকভাব রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্য ও গানে প্রবাহিত। তিনি অন্তরের মধ্যে এই উপলব্ধিকে আজীবন জাগ্রত রেখেছেন, যে উপলব্ধিতে রয়েছে কবির ‘একটি চন্দ্র অসীম চিত্ত গগনে।’
রস, রসাবেগ ও রসবোধ চিত্তের বেদনায় উজ্জ্বল। এই মধুররসে আর্দ্র ও সিক্ত হওয়াই সাধকের প্রেম। এ প্রেমের সাধনাই মিষ্টিকের ধর্ম। বাংলার বাউল বলেছেন, ‘নিত্য দ্বৈতে নিত্য ঐক্য, প্রেম তার নাম।’ সাধক কবি রবীন্দ্রনাথের বহু গানে সীমা-অসীমের এই মিলন-তত্ত্বের দ্বন্দ্বলীলা বিদ্যমান। চিত্তের গভীরে সাধক যখন আত্ম উৎসের সন্ধান লাভ করেন, তখন নিমেষে সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংশয়ের অবসান ঘটে। সত্য তখন সহজ হয়ে তার মুক্ত স্বচ্ছ দৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়। কবি রবীন্দ্রনাথের চোখেও এই ভাবালোক বা স্বপনপারের রূপ ধরা পড়েছেÑ “খুঁজে যারে বেড়াই গানে, প্রাণের গভীর অতল-পানে, যে জন গেছে নাবি, সেই নিয়েছে চুরি করে স্বপ্ন লোকের চাবি।’
ব্যাকুল চিত্তে নির্জনে বসে পরমকে স্মরণ করাইতো সাধনা। সংসারের সকল কোলাহল ও চিত্ত বিক্ষোভের মধ্যে প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছতায় বাস করেও গভীর নির্জনে, শান্ত ও সংযত অবসরে পরমের জন্য আকুল হওয়া, কবি রবীন্দ্রনাথের লেখনিতে আমরা সেই আশ্বাস পাই- ‘দুঃখের বরষায় চক্ষের জল যেই নামলো, বক্ষের দরজায় বন্ধুর রথ সেই থামলো।’
পবিত্র কুরআনে উচ্চারিত ‘মালিক’ শব্দটির অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক ও ভাবগম্ভীর। সুফি সাধকগণ ‘মালিক’ শব্দের মরমি অর্থে প্রবেশ করে স্রষ্টার অন্তরতম ও অন্তরঙ্গ হতে আজীবন প্রয়াস পেয়েছেন। ‘আমার আমি’ সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণভাবে তার। এই চিরন্তন মধুরতম যোগসম্পর্ক আন্তরিক সাধন-সৌন্দর্যে সাধক-হৃদয়ে ফিরে আসে বারবার। বিশ্বকবি, মহাকবি, সাধককবি, রবীন্দ্রনাথের কথায় সমস্ত আবেগ ও মন প্রাণ দিয়ে আমরাও যেন বলতে পারিÑ ‘তুমি আর আমি/মাঝে কেহ নাই/কোন বাধা নাই ভুবনে।’ হ