Naya Diganta

থেমে গেছে কোলাহল ভেঙ্গে গেছে মনোবল, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকই শেষ সম্বল

থেমে গেছে কোলাহল ভেঙ্গে গেছে মনোবল, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকই শেষ সম্বল

টানা লোকসানে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের পর খুলনার শিল্পাঞ্চলে থেমে গেছে কোলাহল। একদিকে করোনার প্রভাব, অন্যদিকে অনিশ্চিত আর অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে শ্রমিকদের। দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র ছেড়ে এখন শেষ গন্তব্য গ্রামের বাড়ি ছাড়া কোনো জায়গা নেই। মিল কবে চালু হবে তারও কোনো উত্তর নেই। একটাই প্রশ্ন আমাদের ঘাম ঝরানো টাকাটা আমরা কবে হাতে পাবো? সরকার ঘোষিত গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের এই শেষ সম্বলটুকুই কেবল শান্ত্বনা।

গত ২৫ জুন খুলনা অঞ্চলের ৯টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে পাটকল বন্ধসহ গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপণ জারি করে খুলনাঞ্চলের প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম, কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলের নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেয়া হয়। এতে বিক্ষুব্ধ ও হতবাক হয়ে পড়ে শ্রমিকেরা। এ সময় প্রশাসনের সামনে আনন্দ মিছিল আর মিষ্টি বিতরণের ঘটনায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ মর্মাহত হয়। অনেকে বলতে থাকেন, কষ্টের খবরে আবার মিষ্টিমুখ? তাও প্রশাসনের সামনে।

বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া মিলগুলো চালু করে সরকার যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল তাতে আমরা আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু শেষমেষ মিলগুলো আর বাঁচানো গেল না। তবে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা মেনে নিয়ে নায্য পাওনাটুকু সময়মতো হাতে পেলেই আমরা সন্তুষ্ট।

নগরীর খালিশপুর শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, বন্ধঘোষিত পাটকলগুলোর প্রধান ফটকে পুলিশী পাহারা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে শ্রমিকদের কানাঘুষা। মিডিয়াকর্মীদের দেখামাত্রই চোখের পানি ফেলে দুঃখ, দুর্দশা আর অভিযোগের কথা বলতে পারলেই চাকরিহারা শ্রমিকদের বুক খানিকটা হালকা হয়ে যায়। তাদের শান্ত্বনা আর দাবী আদায়ের কেন্দ্রবিন্দু যেন সংবাদকর্মীরা। চোখের পানি ফেলে আকুতি নিয়ে বলতে থাকেন তাদের মনের কথা।

অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক জালাল মিয়া বলেন, ১৯৮২ সালে বদলি শ্রমিক (অস্থায়ী শ্রমিক) হিসেবে প্লাটিনাম জুট মিলে ঢুকেছিলাম। ২০১০ সালে চাকরি স্থায়ী হয়। হঠাৎ করেই সরকার মিল বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ঘোষণা দিয়েছে, শ্রমিকদের মজুরি কমিশন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দ্রুত পরিশোধ করা হবে। এখন টাকা পেলেই খুশি।

একই মিলের শ্রমিক আলামিনের বাড়ি বরিশাল। এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ঢাকাতে। টাকার অভাবে বাড়িতে যেতে পারছেন না। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাকা পেলেই বেঁচে যাই।

২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্লাটিনাম জুট মিলের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মী আব্দুল জলিল অবসরে গেলেও বেতন আর গ্র্যাচুইটির টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। আজও মজুরি কমিশন আর গ্র্যাচুইটির টাকা পাইনি। প্রভিডেন্ট ফান্ডের ২ লাখ টাকা পেতেও শ্রমিক নেতাদের খুশি (ঘুষ) করা লাগছে। কবে টাকা পাবো জানি না। অনেকে তো টাকা না পেয়ে মরেই গেছে।

অপর অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক আলমগীর হোসেন বলেন, স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে চাকরি করেছি ১৮ বছর। এখন মিল বন্ধ হয়ে গেল। সরকার বলছে, আবার মিল চালু হবে। কিন্তু মিল চালুর পর আমাদের নেয়া হবে কী না জানি না। আমি ৮ লাখ টাকা থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা পাবো। একবারেই এই টাকা পেলে সরকারকে সালাম দিয়ে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে চলে যাবো। আর কোনো দিন মিলের দিকে আসব না। তিনি বলেন, গত বছরের (২০১৯) বৈশাখী ভাতা পাশ হয়েছে তা এখনো পাইনি, মজুরি কমিশন দেয়া হয়নি, শিক্ষা ভাতা পাইনি। যখন এ ব্যাপারে লিডারদের কাছে শুনি তারা বলেন, ওই টাকা হাঁসে খাইছে, পাখিতে খাইছে, শেয়ালে খেয়ে ফেলেছে। এই হচ্ছে সিবিএ লিডাররা। মৃত্যু ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না। আমাদের রক্ত ঝরানো টাকা যাতে সঠিকভাবে পেতে পারি এখন সরকারের কাছে আমাদের সেই দাবি।

অস্থায়ী শ্রমিকরা বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কবে মিল চালু হবে সেই অপেক্ষায় আছি। রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল রক্ষা সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক আব্দুল হামিদ সরদার বলেন, আমরা এখন অসহায়। এই পরিস্থিতিতে এককালীন শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ ও পূনরায় মিলগুলো চালানোর জন্য দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, ২০১৩ ও ১৪ সাল থেকে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল থেকে প্রায় ১ হাজার শ্রমিক অবসর গ্রহণ করেছেন। অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তারা টাকা পাননি। অনেক চেষ্টা-তদবির করে কেউ কেউ প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেলেও মজুরি কমিশন ও গ্র্যাচুইটির টাকা পায়নি। টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এসব শ্রমিক। ইতোমধ্যে রোগ শোকে ভুগে অনেকে মারাও গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেএমসির একজন কর্মকর্তা বলেন, আমলা নির্ভর না হয়ে বিজেএমসির দক্ষ জনবল দিয়ে পাটকল পরিচালনা, দৈনিকভিত্তিক দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ ও অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হলে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আবারো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বনিজ উদ্দিন মিয়া জানান, প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে পাটকলগুলোতে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সদ্য অবসরে যাওয়া খুলনা অঞ্চলের সাতটি জুট মিলের ৮ হাজার ১০০ শ্রমিক ও আগের অবসরে যাওয়া আরো প্রায় ১ হাজার শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের জন্য সরকারের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লাগতে পারে। অবসরে যাওয়া সব শ্রমিকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করা হবে। তবে, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলে দৈনিকভিত্তিতে (অস্থায়ী শ্রমিক) কাজ করা কোনো শ্রমিক সরকারি কোনো সুবিধা পাবে না।

খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী খুলনার সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা হবে। ইতোমধ্যে সরকার পাটকল শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর পঞ্চাশ শতাংশ নগদ এবং বাকি অর্ধেক মুনাফাভিত্তিক সঞ্চপত্রের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। তিনি বলেন, সরকার এবং প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে মিলগুলো আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। যারা দক্ষ শ্রমিক তাদের দিয়েই মিলগুলো চালানো হবে। শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ চাকরিবিধি অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত হারে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের সুবিধাও পাবেন তারা।