Naya Diganta

চীন-ভারত উত্তেজনা ও আমাদের কূটনীতি

চীন-ভারত উত্তেজনা ও আমাদের কূটনীতি

চীন-ভারত সীমান্তে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুরোপুরি যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চীন স্ট্যাডিলি বাট এগ্রেসিভলি আগাচ্ছে। চীনের প্রচ্ছন্ন আশকারা পেয়ে প্রায় বাংলাদেশের আয়তনের নেপালও ভারতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। মাত্র ১৫ হাজার বর্গমাইলের চেয়েও কম অনেকটা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ভুটানও ভারতের বিরুদ্ধে সাহস দেখাতে পিছিয়ে নেই! ভারতীয় মিডিয়ার খবরগুলো দেখলে বা পড়লে এক ধরনের আবেগী চিত্র দেখা যায়। কিন্তু চীনের বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া দেখলে বা পড়লে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ভারতীয় মিডিয়ার খবরগুলো দেখলে মনে হয়- এই যেন ভারত প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে, চীনকে কড়া জবাব দিতে জওয়ান ও বায়ুসেনা প্রস্তুত! আসলে কি তাই?

নিরপেক্ষভাবে ভূ-রাজনীতির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়- চীনের সাথে যুদ্ধে ভারত কোনোভাবেই পেরে উঠবে না। চীন বিশ্বের একটি অন্যতম বৃহৎ সুপার পাওয়ার, তারা আমেরিকাকে সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি উভয় দিক দিয়ে টক্কর দেয়ার সামর্থ্য রাথে। সৈন্য ও অস্ত্রবলে চীন ভারতের অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। চীন এক সপ্তাহে চার হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরি করতে সক্ষম! চীন অর্থনীতিতে বিশ্বে জায়ান্ট। ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলক খুব দুর্বল। প্রায় অর্ধশত কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এখনো কোটি কোটি মানুষকে খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয়! এমতাবস্থায় একটি সুপার পাওয়ারের সাথে যুদ্ধে ভারত কতটুকু টিকে থাকতে পারবে এটি একটি বড় প্রশ্ন। এটি আবেগে ভাসমান ভারতীয় মিডিয়া না বুঝতে পারলেও মোদি ভালো করেই বুঝেন। আর বুঝেন বলেই দৃশ্যত এত ক্ষতি হওয়ার পরও চীনের বিরুদ্ধে শুধু তর্জন-গর্জন ও ফাঁকা বুলির মধ্যেই তার প্রতিশোধ নেয়ার বা জবাব দেয়ার তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখছেন। আজ এ ক্ষতি যদি পাকিস্তান করত? অথবা ভারত যদি চীনের এই ক্ষতি করত? কী প্রতিক্রিয়া যে হতো বা কী প্রতিশোধ যে নেয়া হতো তা সহজেই অনুমেয়! কেউ না বুঝলেও ভারতীয় জেনারেলরা ভালো করেই বুঝেনÑ চীনের বিরুদ্ধে তথাকথিত সার্জিক্যাল অপারেশনের (যা তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালিয়েছিল বলে বলে থাকে) মতো কোনো অপারেশন চালালে চীন ভারতের বিরোধপূর্ণ হাজার হাজার বর্গমাইলের পুরো এলাকা দখল করে নেবে।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে যদি তার সব প্রতিবেশীদের সাথে সুবিচার করত, তাদেরকে সঠিক মর্যাদা দিত এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার/হিস্যা দিয়ে আসত তাহলে তার বিপদের সময় সেসব দেশ তার পাশেই থাকত। পাকিস্তান ভারতের চিরশত্রু, নেপাল বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, ভুটানও মেরুদণ্ড খাড়া করার আলামত দেখাচ্ছে। যুদ্ধ বাধলে এ দেশগুলো যে চীনের পক্ষেই যাবে তা সহজেই অনুমেয়। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলের চলমান ভূ-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে চীনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে পাকিস্তান যদি হাজার মাইল দূরে ভারতের অন্য ফ্রন্টে আক্রমণ করে বসে তাতে কেউ আশ্চর্য হবে না। যে যাই বলুক দুই ফ্রন্টে দুই পারমাণবিক শক্তিধর (যারা যথাক্রমে বিশ্ব ও আঞ্চলিক পরাশক্তিও বটে) দেশের সাথে যুদ্ধ করার অবস্থায় নেই ভারত। ভৌগোলিকভাবে ভারতের অবস্থান অনেকটা নাজুক। বাকি থাকল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিপুল অংশ বিভিন্ন কারণে ভারতবিরোধী। এমতাবস্থায় নিজের দেশের বিপুল জনসংখ্যা ও পরাশক্তিসম বৃহৎ উন্নয়ন পার্টনারের বিরুদ্ধে গিয়ে যুদ্ধে ভারতের পক্ষে দাঁড়ানো বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে খুব কঠিন হবে।

সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য ভারতের বিদেশ নীতি বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সাথে তার সম্পর্ক ও নীতি বহুলাংশে দায়ী। আঞ্চলিক পরাশক্তি হতে হলে মনকে বড় করতে হয়, হতে হয় উদার। নিজের জন্য যা ন্যায্যতা চাইতে পারেন তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু অন্যের ন্যায্যতা ও সমতা পাওয়ার স্পৃহা এবং আকাক্সক্ষা বুঝতে হবে। এ জন্যই তো আন্তর্জাতিক আইনে ও সম্পর্কে ‘ন্যায্যতা’ ও ‘সমতা’ এবং ‘আনুপাতিক হারে প্রাপ্যতা’ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কনসেপ্ট। ভারতের সত্যিই এ ব্যাপারগুলো নিয়ে সোল-সার্চিং করা দরকার। ভারত যদি মনে করে চীনের সাথে পুরোদমে যুদ্ধ বাধলে অন্যান্য সুপার পাওয়ার যথা আমেরিকা বা রাশিয়া তাদের পেছনে লাইন ধরে খাড়া হবে এবং যুদ্ধ করবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করবে। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো কোনোদিনই এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সরাসরি বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না বা যুদ্ধ করবে না। এমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অলিখিত নিয়ম হয়ে আসছে। ভেটো দেয়ার ক্ষমতা এক মারাত্মক অস্ত্র যা দিয়ে এক সদস্য অন্য সদস্যরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উচ্চাভিলাষকে লাগাম ধরে রাখতে পারে। তাই তারা কোনোভাবেই ওই পর্যায়ে যাবে না। তাছাড়া মোটামুটি শক্তিধর রাষ্ট্রের সাথেও সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে পরাশক্তি কোনো দিন উপনীত হয় না বা হবে না। উদাহরণস্বরূপÑ উত্তর কোরিয়া সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেও আমেরিকা ‘টাগ অব ওয়্যারে’ সীমাবদ্ধ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেছে! কিউবার মিসাইল ক্রাইসিসের সময় দুটি পারমাণবিক শক্তিধর পরাশক্তি মুখামুখি যুদ্ধ করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তারা নিজেরাই পরিণাম দেখে নিজ থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সুন্দর অবস্থানে আছে। সাংবিধানিক স্পিরিট বজায় রেখে কোনো পক্ষের দিকে অবস্থান না নিয়ে বা বিবৃতি না দিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সঠিক কাজ করেছে।

এ জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ। অন্য দেশ বা রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের পলিসি হচ্ছে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’। পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে লেখা আছেÑ ‘...অন্য রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব,অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানো ও সমতা। ভারত আমাদের নিকটতম ও বড় প্রতিবেশী। তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, মুক্তিযুদ্ধে তারা সরাসরি আমাদের সহযোগিতা করেছে। অনেক কিছু পরিবর্তন করা গেলেও প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। অপরদিকে চীন আমাদের বৃহৎ উন্নয়ন পার্টনার ও আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনেকটা চাবিকাঠি। সুতরাং বাংলাদেশকে চলতে হবে ভারসাম্য রক্ষা করে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। ধীশক্তি ও প্রজ্ঞার পরিবর্তে আবেগতাড়িত হয়ে কোনো কিছু করলে বা সিদ্ধান্ত নিলে তার চরম মূল্য দিতে হতে পারে।

আমরা যুদ্ধ চাই না, চাই শান্তি। যুদ্ধ কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। চীন-ভারতের পুরোদমে যুদ্ধ পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলবে যা নিঃসন্দেহে গোটা বিশ্বে প্রভাব ফেলবে। তাই আমরা চাই চীন-ভারতের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কূটনৈতিকভাবে ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান হোক।

লেখক : ব্রিটেনের প্রবাসি আইনজীবী