Naya Diganta

শিক্ষা সভ্যতা ধর্ম ও সেকুলারিজম

বিশ্বের ইতিহাসকে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, বৈজ্ঞানিকদের মতেÑ প্রত্যেকটি ঈবষষ এর যেমন একটা ঘঁপষবঁং থাকে, তেমনিভাবে একটি আদর্শ হিসেবে সেকুলারিজমের উত্থাপনের আগ পর্যন্ত সভ্যতা, শিক্ষার ঘঁপষবঁং বা কেন্দ্র ছিল ধর্ম। এখানে উল্লেখ্য, নাস্তিকতা ইতিহাসে কোনো সভ্যতারই ভিত্তি ছিল না। শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল একটি নৈতিক ভিত্তি সৃষ্টি করা, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করা।
১৮০০ শতাব্দীর শেষের দিকে যে পরিবর্তন বা মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন হলো, তার আগে ইউরোপে দুটি আন্দোলন হয়েছিল। প্রথমটি রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ। এটি ছিল আর্ট ও লিটারেচারের ক্ষেত্রে; ধর্ম বা রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়। এর পরেরটি হচ্ছে জবভড়ৎসধঃরড়হ গড়াবসবহঃ যার মানে হলো, খ্রিষ্টান চার্চের মধ্যে থেকেই আপত্তি উঠল যে, পাপই কি বাইবেলের একমাত্র ব্যাখ্যাতা? এর কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে বলতে চাই, এরই ফলে চার্চ নানাভাবে বিভক্ত হয়েছে।
তৃতীয় যে আন্দোলন হলো সেটা হয়েছিল ফ্রান্সে। সেটা শুরু হয় ‘মুক্তবুদ্ধি’র আন্দোলনের নামে। ১৮০০ শতকের শেষে এবং ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পরে এর প্রভাব বজায় রইল। যেকোনো কারণেই হোক, এই আন্দোলনের বেশির ভাগ নেতা ছিলেন নাস্তিক বা গুপ্ত নাস্তিক কিংবা নাস্তিকের মতো। মানব ইতিহাসে এই প্রথম তারা দর্শন নিয়ে এলেন যে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাজ থেকে ধর্মকে বিদায় করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ব্যাপারে ধর্মের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ধর্ম থাকতে হলে কারো অন্তরে থাকবে, যদি কেউ রাখতে চায়। অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইনসভা এসব থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে হবে। এ আন্দোলনের মূল বক্তব্য ছিল ওয়াহি বা ঐশীবাণী নয়, যুক্তিই জীবনের ভিত্তি হবে এবং পৃথিবীতে আল্লাহর শাসন কায়েম হবে না। যে কারণেই হোক, এই আন্দোলন ইউরোপের তৎকালীন নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। এটা মোটামুটি গৃহীত হয়ে যায় এবং ক্যাথলিক বা প্রটেস্টান্ট চার্চ এটাকে বাধা দিয়ে কুলাতে পারেনি। এর ফল হয় ভয়াবহ, যা এখন আলোচনা করছি।
এর প্রথম কুফল হলোÑ এই শিক্ষা থেকে ধর্মকে আলাদা করা হলো। এভাবে যে স্কুল ব্যবস্থা গড়ে উঠল তাতে মানুষ নিতান্ত স্বার্থপর হয়ে ওঠে। তারা ভোগবাদী হয়ে গেল। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। যে ধর্ম দিয়ে কোনো কাজ হয় না, তার প্রতি সম্মানও কমে গেল। নীতিবোধের যে শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য তাও লোপ পেল। নীতিহীনতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে মানুষ গড়ে উঠল।
পুঁজিবাদ যখন সেকুলারিজমের (যার প্রকৃত অর্থ, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মবর্জনবাদ) সঙ্গী হলো, তখন ইউরোপে শ্রমিককে এমনভাবে শোষণ করা হলো যে, তাদের শুধু বেঁচে থাকার অবস্থায় রেখে দেয়া হলো; তাও শুধু উৎপাদনের স্বার্থে। পরে এর প্রতিক্রিয়াতেই কমিউনিজমের জন্ম হয়। সমাজতন্ত্রের উদ্ভব হলো। অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধির মতবাদ বা সেকুলারিজম আরোপের ফল হলো, অর্থনীতির ক্ষেত্রে অমানবিকতা ও নীতিহীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল এবং বলা হলো, এটা হচ্ছে পজেটিভ সাইন্স। অর্থনীতি একটি অবিমিশ্র বিজ্ঞান; এর মধ্যে নীতিবোধ থাকবে না, নীতি থাকবে না।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্মকে বাদ দিয়ে যে মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন করা হলো তার মাধ্যমে কী ধরনের লোক তৈরি হয়েছে। তারা দুনিয়া দখল করে বেড়াল। লুটতরাজ করল। নিজেদের মধ্যে লড়াই করল। কিন্তু শান্তি আনল না। এর ফল হলো, তারা দুনিয়াকে শান্তি দিতে পারল না। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ করল। পাশ্চাত্য সভ্যতার গর্ভ থেকে চারটি অত্যন্ত ক্ষতিকর মতবাদের জন্ম হয়েছে; ফ্যাসিজম, কমিউনিজম, ক্যাপিটালিজম ও সেকুলারিজম। এগুলো হচ্ছেÑ কেবল ডেমোক্র্যাসি ছাড়া তারা ভালো কিছু করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।
স্রষ্টাকে যারা কোনো স্থান দিতে রাজি নয়, তারা পরিবার ও জেন্ডার ইস্যুতে পশুর মতো হয়ে গেল। তারা মনে করল, পরিবারের গুরুত্ব নেই। এটি হলো নারীদের দাবিয়ে রাখার একটি প্রতিষ্ঠান তাদের দাস বানানোর জন্য। তারা বরং পশুর মতো থাকাই ভালো মনে করেছে। পরিবার করার কোনো প্রয়োজন নাকি নেই। সুতরাং পরিবারের বর্তমান যে দুর্দশা সেটা অনেকটা সেকুলার মতাদর্শের কারণেই।
এর সমাধান কী? আমাদের জানা মতে, দু’ভাবে এর সমাধান হতে পারে। একটা হলো, মুসলিম হিসেবে আমরা আল্লøাহর কাছে, তাঁর নির্দেশনার দিকে যাই বা নিজেদেরকে সোপর্দ করি। সব সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে, মুক্তবুদ্ধির মিথ্যা দর্শন। তাদের কথা হচ্ছে, গডকে বাদ দাও। অথচ তাকেই সবচেয়ে কাছে রাখতে হবে। তাকে সবসময় অবলম্বন করতে হবে। তাঁর ওপর আস্থা রেখেই জীবনযাপন করতে হবে। তাঁর কাছে আমরা সব দিক দিয়ে আবদ্ধ, দায়বদ্ধ। আল্লাহকে বাদ দেয়া চলবে না। এটা হলো মুসলিম হিসেবে আমাদের বক্তব্য। হিন্দু হিসেবে যদি কেউ বলে, তাহলে বলতে হবে স্রষ্টার দিকে যাওয়া, নৈতিকতার দিকে, ধর্মের দিকে ফিরে যাওয়া। তাই সমাধান হিসেবে বলছি, যেভাবেই হোক মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নৈতিক শিক্ষার ধর্ম ছাড়া আর কোনো ভিত্তি নেই।
মুসলিম দেশে ইসলামকে ভিত্তি করতে হবে এবং অমুসলিমদের জন্য বিকল্প থাকবে। অমুসলিমদের দেশে তাদের ধর্মকে কেন্দ্র করে তাদের নৈতিকতার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেখানে মুসলিমদের জন্য বিকল্প থাকবে বলে আশা করি। এভাবে যদি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তবে আশা করা যায়, ভালো মানুষ তৈরি হওয়া শুরু হবে। ভালো লোক তৈরি হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাবে; রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবার সব ক্ষেত্রে। কেবল থিওরি দিলেই কিছু হবে না। আমার কথাতেই সব কিছু বদলে যাবে না। তবে মানবতাকে পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করতে হবে। এ কথাও আমরা জানি, অসম্ভব বলে কিছু নেই।
বিজ্ঞানের কারণে যে উন্নয়ন হয়েছে কোনো ধর্ম তাতে হস্তক্ষেপ করেনি। খ্রিষ্টিয়ান ইউরোপে যে দু’-একটা উদাহরণ পাওয়া যায়, সেটাকে তাদের ভুল বলে গণ্য করতে পারি। কিন্তু খ্রিষ্টান নেতৃত্ব বা পোপরা কেউই বিজ্ঞানের বিরোধী নন। আমরা বুঝতে পারি, মানবজাতি ছিল মূলত ধার্মিক, সেটাকে সেকুলাররা সেকুলারমনা করে দেয়। তাদের আবার ধার্মিকমনা করতে হবে; ইসলামীমনা করতে হবে। ধার্মিক মন ও সেকুলার মনের মধ্যে পার্থক্য কী? ‘ইসলামী মন’ হচ্ছে, সেই মন যেকোনো সমস্যার সমাধান খোঁজে কুরআন ও সুন্নাহতে। তারপর অন্যান্য দিকে। অন্য দিকে সেকুলার মন চিন্তা করে না, আল্লøাহর কিতাবে কী আছে? সে ভাবে, আমাদের ‘যুক্তিবাদী’ পণ্ডিতরা কী বলেছেন; রাজনৈতিক পণ্ডিতরা কী বলেছেন অথবা রাশিয়া, চীন, আমেরিকা, কানাডা কী করেছে। তারা দুনিয়াকে ধার্মিকমন থেকে সেকুলার মনে নিয়ে গেল। তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সারা দুনিয়াকে একটা নৈতিক ছকে নিয়ে আসা; ধার্মিক মনকে ফিরিয়ে আনা।
সেকুলার শব্দটির ব্যবহার চালু হয়েছে মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের পরে, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে। ‘মুক্তবুদ্ধি’র ধারণা গ্রহণ করে পুরো শিক্ষিতসমাজ মোটামুটি সেকুলার হয়ে গেছে। আমাদের অসংখ্য লোক নামাজি, আবার সেকুলার। তারা সমস্যার সমাধান ইসলামে খোঁজেন না। এসব সেকুলার মনকে ইসলামী মনে পরিবর্তন করতে হবে। এ জন্য তাদের কিছু মৌলিক বই পড়াতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। আশা করি, যথাযথ চেষ্টা করলে আমরা সাফল্য লাভ করব, ইনশা আল্লাহ।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার