Naya Diganta
আর্থিক সঙ্কট আর করোনা আতঙ্ক

ঈদের আনন্দ নেই অনেক পরিবারে

আর্থিক সঙ্কট আর করোনা আতঙ্ক

ঈদ সামনে। পয়সা নেই। দেশজুড়েই করোনা আতঙ্ক। পেশায় চাকরি কিংবা ব্যবসা। অথবা খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। এবার কারো মনেই নেই ঈদের আনন্দ। সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেরই নেই বেতন। ঈদের কাক্সিক্ষত বোনাসও পায়নি অনেকে। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় প্রিয়জনদের সাথে ঈদের ছুটিতে দেখা করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত তারা। ফলে এবার অনেকটাই নিরানন্দ ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে অনেক পরিবারের। সার্বিক বিবেচনায় এবার সারা দেশেই উদযাপিত হচ্ছে আনন্দহীন এক ঈদ।
করোনার এই সঙ্কটের সময়ে সব শ্রেণিপেশার মানুষই রয়েছেন আর্থিক সঙ্কটে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্কটই বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন একদিকে যেমন তাদের সঙ্কটের কথা কারো কাছে বলতে পারছেন না, অন্য দিকে পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ভাড়া ও সন্তানদের খরচাদি বহন করে সংসারের সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ করার সামর্থ্যও নেই তাদের। এবার ঈদের আনন্দ ছুঁইবে না তাদের পরিবারকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে বেশি আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন নিম্নআয়ের লোকজন। বিশেষ করে দৈনিক শ্রমজীবী মানুষের হাতে একটি কানাকড়িও নেই। দিন আনা দিন খাওয়া এসব খেটে খাওয়া মানুষের পরিবারে এবার ঈদের আনন্দের ছোঁয়া লাগছে না। লগডাউনের কারণে শুধু ঢাকা শহর নয় অন্যান্য জেলা শহর এমনকি গ্রামের অনেক লোকজনও রয়েছেন চরম আর্থিক সঙ্কটে। তাদের কারো পরিবারেই এবার ঈদের আনন্দ অন্য বছরের মতো দোলা দিচ্ছে না। অন্য দিকে আর্থিক সঙ্গতি রয়েছে এমন পরিবারও করোনার আতঙ্কে ঈদের আনন্দ উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন না। মার্কেট বিপণিবিতান বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ঈদের আনন্দের পরিবর্তে এখন তাদের পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
করোনায় বেশি সঙ্কটে রয়েছেন আমাদের শিক্ষকসমাজ। বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মার্চ বেতন দেয়া হলেও এপ্রিল এবং মে মাসের বেতন তারা পাননি কিংবা আংশিক পেয়েছেন। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার এবং যারা বেকার যুবক টিউশানি করে নিজের এবং সংসারের খরচ চালান তারাও রয়েছেন বিপাকে। গত দুই মাসে কোনো ইনকাম তারা পাননি।
ঢাকা শহরের বিভিন্ন শ্রমিজীবী মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা করোনার এই লগডাউনের সময়ে নিদারুণ আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বিশেষ করে রিকশাচালক, হকার, ফুটপাথের দোকানদার, ফেরিওয়ালা, ভাসমান ব্যবসায়ী, নির্মাণ শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষই কমবেশি এই সঙ্কটে রয়েছেন। এসব পেশার লোকজনের পরিবারে এবার ঈদের আনন্দ আসছে না।
গত প্রায় দুই মাস ধরেই ঘরে বসা দেশের কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিক। তারা অনেকটাই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। তারা অভিযোগ করেন প্রতি বছর শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের নামে কোটি কোটি টাকা আদায় হলেও করোনার এই কঠিন সময়ে কোনো নেতাই শ্রমিকদের কল্যাণে দুই টাকা নিয়ে সহায়তার হাত বাড়াননি। ঈদে লোকজনের চলাফেরা বাড়ে আর সেই সুযোগে পরিবহন শ্রমিকদের আয় ইনকামও বাড়ে। কিন্তু এবার ঈদেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের পকেটে কানাকড়িও আসছে না। তারা ঈদে পরিবার পরিজন নিয়ে নিরানন্দ ঈদ কাটাবেন।
গত ২৫ এপ্রিল থেকে সীমিত পরিসরে দেশের অনেক এলাকায় পোশাক কারখানা চালু হলেও অনেক স্থানেই পোশাক শ্রমিকদের মে মাসে এসে বেতনের মাত্র ৬০ ভাগ দেয়া হয়েছে। অনেক পোশাক কারখানায় দেয়া হয়নি বোনাসও। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহ থেকে শ্রমিক আন্দোলনও হয়েছে। শতভাগ বেতন বোনাস না দিয়েই গতকাল থেকে ছুটি দেয়া হয়েছে পোশাক কারখানা। পোশাক খাতে দেশের ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। সব মিলিয়ে শুধু পোশাক খাতেই ৪০ লাখ শ্রমিকের পরিবারের দেড় কোটি মানুষের মনেও ছুঁইবে না ঈদের আনন্দ।
মিডিয়াকর্মীদের পরিবারেরও এবার ঈদের আনন্দ ফিকে। অনেক মিডিয়াহাউজ আর্থিক সঙ্কটের অজুুহাতে সাংবাদিক ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধ করছে না। অনেক হাউজ আংশিক বেতন দিলেও বোনাস দেয়নি। যেকোনো আনন্দ-দুর্যোগে ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে সবার আগে সবার ঘরে সংবাদ পৌঁছে দেয়ার কাজটি যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দিনে-রাতে পালন করছেন তাদের অনেকের ঘরেও এবার ঈদের আনন্দের সুখকর সেই বার্তাটিও পৌঁছছে না।