Naya Diganta
৫০ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা

তালিকা প্রণয়নে ঘাপলা

৫০ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দেশের দিন আনে দিন খেটে খাওয়া মানুষেরা পড়েছেন কঠিন বিপদে। কাজ-কর্ম না থাকায় অভাব-অনটনে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই খাদ্যসঙ্কটে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এসব ক্ষতিগ্রস্ত অসচ্ছল পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার জন্য ৫০ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে নগদ আড়াই হাজার টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নে বড় ধরনের ঘাপলা দেখা দিয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগী গরিব মানুষকে বাদ দিয়ে স্থানীয় সচ্ছল আওয়ামী লীগের পরিবার ও তাদের আত্মীয়স্বজন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম যুক্ত করে তালিকা জমা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার একই মোবাইল নম্বর সর্বোচ্চ ২০০ সুবিধাভোগীর বিপরীতে ব্যবহার হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা কার্যক্রমে তালিকা প্রণয়নের জন্য জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড পর্যায়ের ওই কমিটিতে রয়েছেন চেয়ারম্যান, মেম্বার, শিক্ষক ও স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। আর উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে রয়েছে একটি কমিটি। ওয়ার্ড পর্যায় থেকে যে তালিকা জমা দেয়া হবে উপজেলা প্রশাসন ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেয়ার কথা। কিন্তু ওয়ার্ড পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা তালিকা করার সময় বেশির ভাগ প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারের নাম বাদ দিয়েছে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে তাদের ভোটের রাজনীতি ঠিক রাখার জন্য ওই জায়গায় স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের পরিবার ও তাদের আত্মীয়স্বজন এবং ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা তাদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নাম তালিকায় যুক্ত করে দেয়। এ রকম ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ৭২০টি পরিবারের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে মুড়িয়াউক ইউনিয়নে চারটি মোবাইল নম্বর ব্যবহৃত হয়েছে ৩০৬ জনের নামের সাথে। আর এই নম্বরগুলো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মলাইয়ের ঘনিষ্ঠজনের। ৩০টি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে অন্তত একডজন নামের পাশে। এ ছাড়াও বাগেরহাটসহ দেশের বেশির ভাগ ইউনিয়নে তালিকা প্রণয়নে অসঙ্গতির কারণে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এর আগেও গরিব, অসহায় ও কর্মহীন মানুষের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত ওএমএস, ভিজিডি ও ভিজিএফর চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বণ্টনে দুর্নীতি ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ইতোমধ্যে ৬৬জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তালিকা প্রণয়নে বিষয়টি সরাসরি মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রকৃত হতদরিদ্র উপকারভোগী পরিবারকে তালিকায় সংযুক্ত করার জন্য আগের তালিকা সংশোধন করে নতুন তালিকা করার জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। নতুন তালিকা অনেক জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে। তবে আগের যে তালিকা দেয়া হয়েছিল সেখান থেকে প্রথম ধাপে টিকেছে সাড়ে সাত লাখ হতদরিদ্র উপকারভোগীর নাম। আর নানা অসঙ্গতি থাকায় যাচাই-বাছাইয়ের শুরুতেই ১০ লাখ নাম বাদ পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বাররা দায়ীতো আছে, এর সাথে সরকারও কম দায়ী নয়। কারণ জনপ্রতিনিধি হতে এখনতো নির্বাচন লাগে না। সরকারি সিদ্ধান্তে হয়। এখানে ভালো মানুষ বাদ দিয়ে খারাপ মানুষকে সিলেকশন করা হয়। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সবাই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তদবির করেন। তারা জানেন, দলীয় মনোনয়ন পেলেই চেয়ারম্যান হওয়া যাবে। আর এভাবে জনপ্রতিনিধি হলে তো জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা থাকে না।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনতো জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নাই। এর কারণে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও নাই। যারা এগুলো করছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে যদি শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত তাহলে সবার মনে একটি ভয় সৃষ্টি হতো। তখন ব্যাপকভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ত না। এখন বিচারও হয় না। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও এগুলো হচ্ছে। যারা এগুলো করছে তারা মনে করে তাদের উপরেতো বড় বস আছে। ফলে তারা ধরেই নিয়েছেন, যা কিছু করুক না কেন তাদের কোনো বিচার হবে না, তারা পার পেয়ে যাবেন। এ ধরনের মানসিকতা থাকায় তারা বেপরোভাবে দুর্নীতি করছে। সরকারের উচিত হবে, এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে এই দুর্নীতির প্রবণতা বন্ধ করা।