Naya Diganta

পেঁয়াজ আমদানি না করলে বাঁচতো কৃষক

এ বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় পর আমদানি শুরু হওয়ায় বাজারে দামও কমেছে। কিন্তু কৃষকের দাবি, আমদানি অব্যাহত থাকলে তারা লাভের মুখ দেখতে পারবেন না।

নিজেদের বাজার সামাল দিতে গত বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে ভারত প্রথমে পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বেঁধে দেয়। তাতেই দেশের বাজারে রাতারাতি এ নিত্যপণ্যটির দাম কেজিতে ১৫-২০ টাকা বেড়ে গিয়েছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী দেশটি রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করলে দেশের বাজারে রীতিমতো হাহাকার শুরু হয়ে যায়। এক কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম তখন ২৫০ টাকার উপরে উঠেছিল।

প্রায় পাঁচ মাস পেঁয়াজের বাজারে এ আগুন অবস্থা ছিল। তুরস্ক থেকে আমদানি করে এবং কৃষকরা আগাম পেঁয়াজ তুলে বাজার সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। পেঁয়াজ আমদানি শুরু হলে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে বাজারেও স্বস্তি ফেরে৷ কমতে থাকে পেঁয়াজের দাম। কিন্তু ওই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার নিজ নিজ দেশে লকডাউন ঘোষণা করে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।

প্রায় দেড় মাস বন্ধ থাকার পর গত ৯ মে দর্শনা-গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজবাহী প্রথম ট্রেন বাংলাদেশ আসে।

দেশে শুক্রবার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০-৪৫ এবং প্রতি কেজি বিদেশি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এক মাস আগের তুলনায় দেশি পেঁয়াজের দাম ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং বিদেশি পেয়াজের দাম ১৫ শতাংশ কমেছে।

ভারত থেকে আমদানি অব্যাহত থাকলে দাম আরো কমে যাবে বলে আশঙ্কা কৃষক এবং আড়তদারদের।

পাবনার বেড়া থানার নলভাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি আব্দুস সালাম টেলিফোনে বলেন, ‘‘বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। এখন প্রতিমণ ১৪০০/১৫০০ টাকায় বিক্রি করছি। দাম আরো কমে গেলে লাভ আর থাকবে না৷ উৎপাদন খরচ উঠা নিয়েই তখন কষ্ট হবে। এ বছর আমি ১০০ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছি। আমাদের এলাকার প্রায় ৯৮ শতাংশ জমিতেই পেঁয়াজ আবাদ হয়৷ ভারত থেকে আমদানি বন্ধ না হলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়বে। কৃষকদের বাঁচাতে সরকার যদি আমদানি বন্ধ করতেন তবে আমরা বাঁচতাম।’’

শরীয়তপুরে এ বছর ৩ হাজার ৩৩৩ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়েছে।

জেলার জাজিরা উপজেলার বিকেনগর ইউনিয়নের কৃষক রবিন মিয়া বলেন, এ বছর ৩ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলাম। গত দুই বছর লোকসান হলেও এ বছর উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ৩০ হাজার টাকার উপরে লাভ হয়েছে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাঁচিকাটা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হক বলেন, ‘‘সরকার যদি প্রতিটি এলাকায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতো এবং ফসল উৎপাদনে সহজ শর্তে ঋণ দিতো তাহলে আমরা গরিব কৃষকরা আরেকটু লাভবান হতাম।

‘‘আমরা এত কষ্ট করে আবাদ করে কেজিতে ৭-৮ টাকা লাভ করি। অথচ আড়তদাররা আমাদের থেকে পেঁয়াজ কিনে নিয়ে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে লাভ করে।’’

শ্যামবাজারের আড়তদার শামসুর রহমান অবশ্য উল্টো কৃষকদের বিরুদ্ধে পেঁয়াজ মজুদ করে রাখার অভিযোগ তোলেন।

তিনি বলেন, ‘‘এ বছর বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠে পেঁয়াজ নষ্ট হয়নি। কৃষকদের ফসল সংরক্ষণেও সুবিধা হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সেই আশায় এখন কৃষকরা পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছেন না। অথচ পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে৷ বাজার সামাল দিতে সরকার পেঁয়াজ আমদানি করছে।

‘‘আমরা আড়তদার। আমরা যত বিক্রি করবো তত লাভ হবে। দেশি উৎপাদন হোক বা বিদেশ থেকে আমদানি করা, তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। আমাদের লাভ পণ্য বিক্রির পরিমাণের উপর। তবে একজন নাগরিক হিসেবে আমি বলবো পেঁয়াজ আমদানি না করাই ভালো। তাতে পরনির্ভরশীলতাও কমবে। গতবার ভারত নিজেদের সুবিধার জন্য পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে দেশের বাজারে আগুন ধরে গিয়েছিল। সরকার তখন কৃষকদের বেশি আবাদ করতে বলেছেলি। কৃষকরা সে অনুযায়ী আবাদ করেছে। এখন যদি ফসলের ন্যায্য দাম না পায় তবে তারা নিরুৎসাহিত হবে। কৃষকদের উৎসাহ না দিলে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া যাবে না।’’

কৃষকদেরও বেশি লাভের আশায় পেঁয়াজ মজুদ না করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘‘না হলে পরে তাদের অনেক লোকসান হবে। কারণ, ভারতেও এবার পেঁয়াজের আবাদ ভালো হয়েছে।’’

শ্যামবাজার আড়তে শুক্রবার প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩৮/৩৯ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ২৮/২৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি।

গত বছর পেঁয়াজ নিয়ে সংকটকালে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও একাধিকবার কৃষককে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘তিন বছরের মধ্যে সরকার পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চায়। এ জন্য মৌসুমের সময় আমদানি নিয়ন্ত্রণের চিন্তা রয়েছে সরকারের।’’ ডয়চে ভেলে।