Naya Diganta

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ ব্যাংকারদের

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ ব্যাংকারদের

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে বিলাসজাতপণ্যসহ অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির রাস টানার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, করোনার কারণে বৈশ্বিক মন্দায় রফতানি আয় কমে যাচ্ছে। একই সাথে কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্সপ্রবাহ। কিন্তু আমদানির দায় কমছে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলারের। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৮ মাসের আমদানি রফতানির হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতেও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে মোট আমদানি ব্যয়ের বড় একটি অংশই আমদানি হয় বিলাসজাতসহ অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে। যেমন, বড় বিপণিবিতানগুলোতে একজোড়া বিদেশী জুতা বিক্রি হয় ২০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকায়। তেমনিভাবে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত দেশ ব্যবহার করলেও বড় বিপণিবিতানগুলোতে ১০ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় বিদেশী জামা বিক্রি হয়। এমনিভাবে আরো অনেক অপ্রয়োজনীয় পণ্য আছে যা হরহামেশাই আমদানি করা হয়। এর বিপরীতে প্রতি বছরই কষ্টাার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায়।

এ দিকে চলমান করোনাভাইরাসের মধ্যে রফতানি বলা চলে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, গত মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এতে আমাদের রফতানি ও রেমিট্যান্সে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইউরোপে করোনার বড় ধরনের ধাক্কায় রফতানি আদেশের বড় অংশ বাতিল হয়ে যায়। এতে গত দুই মাসে যে পরিমাণ রফতানি আয় হয়েছে, চলতি মে ও আগামী কয়েক মাসে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, ফেব্রুয়ারি মাসের রফতানি আয় মার্চ ও এপ্রিল মাসে এসেছে। কিন্তু গত এপ্রিল মাসে বলা চলে পোশাক কারখানাগুলো পুরোপুরিই বন্ধ ছিল। এর প্রভাব পড়বে আগামী কয়েক মাসে। এতে রফতানি আয় সামনে ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

এ দিকে বৈশ্বিক মন্দায় বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরাও কাজ হারাবে। ইতোমধ্যে অনেক দেশেই শ্রমিক বসিয়ে রাখা হয়েছে। গত এপ্রিলে আগের বছরের এপ্রিলের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স কম এসেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ কমে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নীতিমালা শিথিল করে আপাতত বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কম রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। যেমন, যেসব পণ্যের আমদানি দায় তিন মাসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা, সেটা ৩ মাস বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। ৬ মাসের দায় মেটানোর সময়সীমা আরো ৬ মাস বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছে। এতে আপাতত চাপ কম থাকলেও সামনে বকেয়াসহ নিয়মিত দায় একসাথে পরিশোধ করতে হবে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ভয়াবহ আকারে বেড়ে যেতে পারে।
এমনি পরিস্থিতিতে সামনে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কমানোর বিকল্প নেই বলে মনে করেন ব্যাংকাররা। এ বিষয়ে গতকাল অগ্রণী ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে আমাদের অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কিছু দিনের জন্য হলেও বন্ধ করা উচিত।

কারণ, সামনে আমাদের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। বৈশ্বিক মন্দায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় আপনা আপনিই বিভিন্ন দেশের ভোগব্যয় কমে যাবে। এতে আমাদের রফতানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেই সাথে রেমিট্যান্সপ্রবাহও কমে যাবে। সব মিলে বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ কমে যাবে। সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাহিদা কমাতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। ইতোমধ্যেই ব্যাংকগুলো ঠিকমতো আমদানি দায় পরিশোধ করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাকিতে পণ্য আমদানির অনুমোদন না দিলে এবং রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ না করলে বর্তমান অবস্থা ভয়ারহ রূপ নিতো। এ কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার দায় কমানোর দিকেই নজর দিতে হবে নীতিনির্ধারকদের।