Naya Diganta

নীরবে চলে গেল সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

মাহফুজ উল্লাহ
মাহফুজ উল্লাহ

ধন্যবাদ দৈনিক নয়া দিগন্তকে। কেউ মনে না করলেও নয়া দিগন্ত ২৯ এপ্রিল খ্যাতিমান সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি সংবাদ ও ৩০ এপ্রিল সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে।

গত বছর ২৭ এপ্রিল ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। একজন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে মাহফুজ উল্লাহ ভাই বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও পরিবেশবিদ। 'সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট' নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে তার হাত ধরেই পরিবেশ সাংবাদিকতার সূচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন 'ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের' আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০০৭ সালে এক-এগারোর পর জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ ও ফখরুদ্দিন আহমেদের সরকারে জরুরি আইনের সময় রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে যে কয়জন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে যৌক্তিক মতামত জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাদের মধ্যে মাহফুজ উল্লাহ ভাই অন্যতম।
তিনি যেমন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, তেমনি মার্জিত ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবধারা শেষ দিন পর্যন্ত বজায় রেখে গিয়েছেন। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্মী থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

উনসত্তরের ১১ দফা দাবির আন্দোলনে অংশ নেবার দায়ে ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি ছাত্র ইউনিয়নে (মেনন) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যাবার আগে জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য বিশেষ করে ৫৬ হাজার বর্গ-মাইলের স্বাধীন ভূখণ্ডের জনগণের জাতিসত্তা 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'-এর প্রবক্তা, 'স্বাধীনতার ঘোষক' শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। জিয়ার অক্লান্ত পরিশ্রমে স্বনির্ভর বাংলাদেশ হয়েছিল। এই নেতাকে নিয়ে তিনি 'প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ' বইটি লিখেছেন।

গণতন্ত্রের মাতা দেশনেত্রী, বিএনপি'র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করর জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ান, মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীসহ অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনিই। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময় দেশনেত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিনে প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল 'ইর্মাজিং টাইগার' হিসেবে।

এই সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে ২০১৮ সালে ৮ ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে বন্দী করে রাখে।
গণতন্ত্রের মাতা দেশনেত্রী যখন কারাগারে, ওই সময় মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সম্পাদনায় তার জীবনের গল্প নিয়ে বই প্রকাশিত হয় ১৮ নভেম্বর ২০১৮ সালে 'বেগম খালেদা জিয়া হার লাইফ হার স্টোরি' নামে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নূরুল কবির, অধ্যাপকর আসিফ নজরুলসহ অনেক গুণীজন বক্তব্য রাখেন।

মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সম্পাদনায় অসাধারণ বইগুলোর মধ্যে থেকে এই দুটি বই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে ভাবাপন্ন জনগণ হাজার বছর দেখবে, পড়বে, বুঝবে। এর মধ্যই তিনি জীবিত থাকবেন। উল্লেখ্য, মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সম্পাদনায় বাংলা ও ইংরেজিতে পঞ্চাশের বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে নাগরিকরা জীবন অতিবাহিত করছে। এই সঙ্কটকালে মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী কারো পক্ষ থেকে গুরুত্বসহকারে পালন করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যরা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দুস্থদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন। তবে অনেকটা দুঃখজনক হলো, তিনি যাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ে পরস্পর পরস্পরের সহায়ক ছিলেন তারা কিংবা বর্তমানে অনেক গুণীজন যারা আছেন- কেউ একটি লেখার মধ্যে দিয়ে স্মরণে আনাতে পারলেন না।

২০১৫ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে শত নাগরিক কমিটির ব্যানারে বিএনপি'র সমর্থনে মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির অন্যতম ছিলেন মাহফুজ উল্লাহ ভাই। তিনি নিজে আমাকে ডেকে নিয়ে মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী প্রচারণার মিডিয়া টিমের দায়িত্বে এনে যেভাবে বুঝিয়ে দিয়ে ছিলেন তা আমার জন্য পরম পাওয়া। মহান আল্লাহ শ্রদ্ধেয় মাহফুজ উল্লাহ ভাইকে বেহেশত নসিব করুন আমিন।

মনীষীদের কাজ থেকেই প্রেরণার উৎস তৈরী হয়। বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে সুন্দর করে তুলতে প্রেরণার দরকার।
অতীতের প্রেরণায় বর্তমান এবং ভবিষ্যত সুন্দর করার পরিপ্রেক্ষিতটা অনেকের দৃষ্টির সামনে হাজির থাকে না বলেই হয়তো সবকিছু প্রাণহীন নীরস বক্তব্যসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের দীনতাই বড় বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। এমন দেশে আমরা বাস করছি।

লেখক : সহ-সভাপতি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাস