Naya Diganta

করোনা যোদ্ধাদের হাজারো সালাম

করোনা যোদ্ধাদের হাজারো সালাম

করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব নেতাদের মনমানসিকতায় কি তেমন পরিবর্তন আনতে পেরেছে? যা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়সসুস গত বুধবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, "এই ভাইরাসকে পরাজিত করতে হলে মানবজাতিকে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি একতাবদ্ধ হতে হবে"।

তিনি বিশ্ব নেতৃত্বকে সতর্ক করে দিয়ে আরো বলেন,"এই ভাইরাস ধবংসযজ্ঞ চালাতে পারে। এটি যে কোনো স
সন্ত্রাসী হামলার চেয়েও ভয়ানক।এই ভাইরাস রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্থান-পতন ঘটাতে পারে।"
হ্যাঁ আমিও মনে করি বিশ্বসভাকে বাঁচাতে এখন হিংসা-বিদ্ধেষ,যুদ্ধ-বিগ্রহের পথ পরিহার করে একতাবদ্ধ হওয়া জরুরি।

"বৈশ্বিক হুমকি দেখায় যে আমাদের প্রত্যেকে নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আসলে কেউই নিরাপদ নই। কোনো অঞ্চল, জাতি বা দেশের জন্য এখন আর সাংস্কৃতিক শ্রেণিবদ্ধতা, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেই"।
প্রতিদিন করোনায় নতুন করে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে।গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ ২৫ হাজার মানুষ। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই এতো মানুষ মারা যাচ্ছে।

বিশ্ব যে কত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এ পপরিসংখ্যানই তা বলে দিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব আর কখনো এ ধরনের কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি।

করোনা বিশ্বকে যেভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে কি বিশ্ব নেতৃত্ব শিক্ষা নিচ্ছেন। এর কোনো নিদর্শন দৃশ্যমান নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্ট যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী আক্রমণ; ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন আর সিরিয়ায় বারুদের গন্ধ বন্ধ করতে পারিনি। তেমনি কিছু রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘু বা ধর্মীয় নির্যাতন বন্ধের মাধ্যমে মানবিকও করতে পারেনি। যেমন বার্মা, ইসরাইল, ইন্ডিয়া, চীন। আবার অনেক দেশ করোনা মোকাবেলায় সফলতা দেখিয়েছে যেমন কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, ইউএই, সৌদি আরব। সারা বিশ্বে তুরস্ক তাদের মানবিক সাহায্যও করছে যেমন ইতালি, ইউকে, স্পেনে, যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিস্তিন ও সার্বিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও পাঁচটি বলকান অঞ্চল ছাড়াও পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকা, ইয়েমেন, মেক্সিকোকে বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা এবং মেডিকেল ইকুইপমেন্ট দিয়ে।

লকডাউন লক্ষ লক্ষ শ্রমিককের আয় রোজগার বন্ধ থাকে, তাই অনাহার খুব বেশি দূরে থাকবে না। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেকার ও দরিদ্রদের জন্য প্রচুর ফেডারেল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে আয়ের অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। আমেরিকাতে এই জাতীয় সামাজিক প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের গ্রহণ এবং স্বীকৃতি হিসাবে, রাজনৈতিক বিরোধীদের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেসিসহ জনসাধারণের আলোচনার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র দ্বারা অনেকটা সহায়ক হয়, বিশেষত যখন প্রেস মুক্ত থাকে, জনসাধারণের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে না এবং যখন সরকারী আদেশগুলি শ্রবণ ও পরামর্শ দ্বারা জানানো হয়। তখনই জাতীয় সমস্যা সমাধান ঐক্যবদ্ধভাবে করা সম্ভব হয়। আবার আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, এবং উন্নয়নশীল বিশ্বেরও প্রাচীনতম। ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস জুড়ে দুর্ভিক্ষ ছিল এক অবিরাম ঘটনা। ভারত প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে হঠাৎ থমকে যায় দুর্ভিক্ষ। গণতন্ত্র দুর্ভিক্ষ রোধে জনগনকে কঠোর পরিশ্রম করার জন্য উৎসাহ দেয়।

করোনা ভাইরাস (কভিড ১৯) গত পাঁচ মাসে পৃথিবীজুড়ে লাখো জীবন কেড়ে নিয়েছে। চিকিৎসা ছাড়া কোনো দেশ বসে নেই। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিচেছ। ইউরোপ-আমেরিকায় মৃত্যুর সংখ্যা যত বেশি হোক না কেন একজনও বিনা চিকিৎসায় মারা যায়নি। এমনকি হাসপাতালে ভর্তির জন্য বাংলাদেশের মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না। কেউ মারা যাওয়ার আগে তাদের দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে হসপিটালে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন। সর্বোপরি যারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তাদের জন্য কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষ বড় দূর্ভাগা। আজ হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা পাচ্ছেনা মানুষ। করোনায় ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তা পর্যন্ত আমরা দিতে পারছি না। অথচ আমরা অনেক বেশি সময় পেয়েছিলাম। এই মহামারিতে তো কারো হাত ছিল না যে এটা লুকোনোর কোন বিষয়। বরং প্রথম থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির তৈরি হতো না।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত মারা গেছেন ১৭০ জন আর আক্রান্ত ৮২৩৮ জন। বিশ্বের সর্বোচ্চ করোনা আক্রান্ত দেশগুলি গ্রাফটা পাহাড়ের মতো প্রথমে লাফিয়ে উঠে পর আস্তে আস্তে নামতে থাকে। আর বাংলাদেশের গ্রাফটা আর কোনো দেশের গ্রাফের সাথে মিলবে না, মনে হয় মনের মাধুরী দিয়ে শিল্পীর হাতের তুলিতে আঁকা।

করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করলেও আসল প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেয়া থেকে অনেক দূরে ছিল যেমন করোনা টেষ্ট অপর্যাপ্ত আর চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশে কয়েকটি হাসপাতালকে করোনা ভাইরাস চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হলেও সেগুলোতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তেমন চিকিৎসাই মিলছে না। জ্বর,সর্দি ঠান্ডায় বা করোনাভাইরাসের উপসর্গে বহু মৃত্যু হচ্ছে এবং এই অগনিত মৃত্যু যা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। আজ বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে কোন চিকিৎসা নেই। রোগি ভর্তি নেয়া হচ্ছে না। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা যে পুরোপুরি ভেঙ্গে পরেছে। তার প্রমাণ সংবাদপরত্রের খবর ও আক্রান্তদের আত্মীয় স্বজনদের বর্ণনা অনুযায়ী বেশিরভাগই বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। বাংলাদেশের ৪টি হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য তৈরী করেছে।এর মধ্যে শেখ রাসেলে কোনো করোনা রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না। এরই মধ্যে খবর এসেছে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। সরকার এটি নিয়ে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু সরকার বলছে না যে এই হাসপাতালে আজ পর্যন্ত কতজন করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে। বাংলাদেশী একজন বিশ্ব ব্যাংকের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তিনি দীর্ঘ দিন ওয়াশিংটনে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দফতরে ছিলেন বর্তমানে কম্বোডিয়া অবস্থান করছেন যার নাম ড. জিয়া হায়দার। তিনি পেশায় চিকিৎসক। তারা তিন ভাই ডাক্তার, এক বোন ডাক্তার, এক বোনের স্বামী ডাক্তার। পরিবারে পাঁচজন ডাক্তার হওয়ার পরেও তার মা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে।

তিনি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন সোস্যাল মিডিয়ায় যার পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায় তাদের মা কার্যত বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। কিছু সংবাদপত্রের খবর এর মধ্য গরিবের ডক্টর নামে খ্যাত সিলেটে ডা. মঈন তিনি তো বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন, তার নিজের জন্যই ভেন্টিলেশন মেলেনি তার নিজের হসপিটালে। সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন দুই হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা পাননি, এম্বুলেন্সে ছিল না অক্সিজেন। মৃত্যুর কিছু সময় আগে, করোনা পরীক্ষার জন্য সাংবাদিক খোকনের নাকের সোয়াপ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। একজন গার্মেন্টস ব্যাবসায়ী তসলিম সাহেবের আর মিরপুরের টোলার বাগে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল, ৫/৬ টা হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার খবর পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে ডা. খালিদ মাহমুদ বলেন, তার মা ইউনাইটেড হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে (ভেন্টিলেটর) থাকার সময় কোভিড-১৯ পজিটিভ হওয়ার কারণে তাকে বের করে দেয়া হয়। তার পর অনেক ফোন করে খোঁজাখুঁজি করে বাইরে থেকে অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করা হয়। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে যখন তাকে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তখন আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাননি। এসব পত্রিকার খবর। কতইবা খবর আসে পত্রিকায়। সারাদেশের হয়তবা ১০% খবর পত্রিকায় আসে।

এদিকে করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত করার পরীক্ষার নিয়ে বেহাল দশা চলছে। তার মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি দল করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট আবিষ্কার করলেও সরকারের টালবাহানায় সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে যায়। গণস্বাস্থ্যের এই কিট সরকারকে হয়তোবা করোনা পরীক্ষা আরো সহজলভ্য করে তুলতে পারতো। কিন্তু সরকারকে কোনো মতেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বোঝাতে সক্ষম হলেন না। অথচ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত করোনা শনাক্তের কিটের সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য ৮০০ কিট চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে সিডিসি। বুধবার দুপুরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এখবর পেয়ে বৃহস্পতিবার গণস্বাস্থ্যের কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে এতো টালবাহানার কোনো কারণ ছিল না।

করোনা টেষ্টে সরকারের এই ধীর গতির কারণে অনেকে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারছেন না। ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা মনসুর রুস্তম বয়স ৩৮ বছর। সপ্তাহখানেক ধরে জ্বর, সর্দি, কাশি আর গলাব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি করোনাভাইরাস টেস্ট করার জন্য বেশ কয়েক দফা চেষ্টার পর ১৮ এপ্রিল তার স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয় এবং ২০ তারিখ তাকে জানানো হয় যে তার করোনাভাইরাস নেগেটিভ এসেছে। তখন তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু পরের দিন তিনি এতটাই অসুস্থ হলেন যে তিনি আর শ্বাস নিতে পারছিলেন না। পরিবারের সদস্যরা তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতাল ও পরে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান, কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করেনি। পরে ইবনে সিনায় নেয়ার পর সেখানে তাকে ভর্তি করা হয় কিন্তু তাকে আইসিইউ বা ভেন্টিলেশনে নেয়ার পথে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুইজন বাংলাদেশী সাংবাদিক যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছে বিবিসিতে, এতে তারা বলেছেন যে কুয়েত মৈত্রী ও কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশার অবস্হা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, করোনা চিকিৎসায় ৭২টি মেডিকেল কলেজ সরকারের পাশে থাকবে ও সবাই মিলে করোনা চিকিৎসা দেবে। একজন প্রতিমন্ত্রীর মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজে সাভারের আক্রান্ত একজনকে ভর্তি করা হয়নি, পরে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ঢাকায় যাওয়ার পথে রোগীটি মারা যান।

কুর্মিটোলা হাসপাতালের ডিরেক্টর একজন ব্রিগেডিয়ার। তিনি তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় তার ডাক্তার-নার্সরা কাজ করছেন। তাদের পিপিই আর মাস্ক নেই। রাজধানীর ৫০০ শয্য বিশিষ্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক শহিদ মো. সাদিকুল ইসলামকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। সম্প্রতি কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে দেওয়া মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এই পরিচালক। তিনি এ বিষয়ে মতামত চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠিও দিয়েছিলেন। কুর্মিটোলা হাসপাতালের ডাক্তার- নার্সরা নিম্নমানের খাবার সবরাহ করার জন্য প্রতিবাদ করেছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হারে ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল স্টাফ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল স্টাফদের সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে তাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের থেকে এই ভাইরাসের চিকিৎসা আশা করা যায় না। এভাবে আক্রান্ত হতে থাকলে কদিন পরে চিকিৎসা তো নাই ডাক্তারেরই দেখা পাওয়া যাবে না। এছাড়াও আবাসন সুবিধা পায়নি এখনো বেশিরভাগ ডাক্তার, নার্স। সরকার বলেছে সমস্ত ব্যবস্থা করেছে কিন্তু হোটেল মালিক পক্ষ বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখনো তাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। ডাক্তার-নার্সদের পরিবার হুমকির মধ্যে আছে। কোন চিকিৎসক বা মেডিকেল স্টাফ যদি চিকিৎসা দিতে গিয়ে মারা যায় আর সে যদি সরকারি দলের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে তার পরিবার কতটুকু সাহায্য পাবে জানিনা। তবে যদি সরকারি দলের সাথে সম্পর্কযুক্ত না থাকে তাহলে তার ভাগ্যে কিছুই জুটবে না।

সরকার তার অবস্থান থেকে সরছে না। তারা বাস্তবতা আমলে নিচ্ছ না। আমরা দেখছি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অন্য কর্মকর্তারা সত্য গোপন করে কিভাবে বলে যাচ্ছেন পিপিই, কোয়ালিটি মাস্ক এগুলোর নাকি কোনো অভাব নেই। অথচ সংবাদমাধ্যমে দৈনিক খবর আসছে প্রায় সব হসপালালেই ডাক্তার-নার্স , স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিইর, হ্যান্ডগ্লাভস অভাব আর মাস্ক একেবারে নকল। কেউ সরকারের এ সমস্ত অবহেলা, প্রস্তুতি হীনতা ও মিথ্যাচার নিয়ে মুখ খুললেই কারণ দর্শানো এবং শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অথচ গত দুই বছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা উপরে। একটা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা ভালো তা কিন্তু সে দেশের ডাক্তার-নার্সের উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সে দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা দক্ষ আর তার সদিচ্ছার উপর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন,'করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তার সংস্থা শুরু থেকেই সকল দেশকে প্রস্তুতি নিতে সতর্ক করেছিল'। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সতর্কবার্তা বাংলাদেশ আমলে নিলে আজ করোনার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতো।

আরেক দিক হচ্ছে,বাংলাদেশে এরই মধ্যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। লক্ষ মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণায় হাহাকার করছে, তার মধ্যে প্রতিমন্ত্রী বলছেন 'কেউ কোথাও না খেয়ে আছে তার যানা নেই'। আজ বাংলাদেশে খাবারের জন্য যখন হাহাকার ঠিক তখনি ত্রাণের চাল/ডাল চুরি হচ্ছে। যদি এমনটি চলতে থাকে তাহলে চারপাশে অপ্রত্যাশিত ও অগণিত হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখতে হবে। বিশ্বে এমন মহামারি আর আমাদের দেশে চলছে চাল চুরি আর লোক দেখানো ত্রাণ বিতরণের সেলফিবাজি। এগুলো মানুষকে আরো ভাবিয়ে তুলেছে।

এর মধ্যে নতুন তামাশা শুরু হয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে যখন হিমশিম খাচ্ছে পুলিশসহ প্রশাসন, তখন দলবল নিয়ে সরকারের দুই মন্ত্রী ও চার এমপি কৃষকের পাকা ধান খেত মারিয়ে ধান কাটার কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার নামে রাজনীতির সস্তা নাটক শুরু করেছে।

বাংলাদেশে করোনার বিস্তার সরকার যা দেখাচ্ছে, আমি মনে করি এটা খণ্ডচিত্র। বাস্তব চিত্র হচেছ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। খাবার না দিয়ে লকডাউন করে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারা যাবে না না হতদরিদ্র এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে। জাতিসকঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় করোনাভাইরাস সংকটে নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষত জনগণের মুক্ত আলোচনা এবং নির্বাচনের সংমিশ্রণের কারণে সরকারকে জনগণের প্রয়োজনে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। আশার পথ দেখাবে মুক্ত সাংবাদিকতা আর আশা জাগাবে সরকার। সরকারতো দায়িত্বে, তাই সমাধান তো সরকারকেই করতে হবে সবাইকে সাথে নিয়ে।

আমাদের এ টু জেড ফোর্সের সম্মুখ যোদ্ধা হাসপাতালের ডাক্তার- নার্স, স্টাফ আর আমাদের সীমানায় আমাদের শত্রু করোনাভাইরাসকে আটকে দেয়ার প্রচেষ্টায় যুদ্ধরত আমাদের সীমানার অতন্ত্র প্রহরী বাংলাদেশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে জানাই হাজারও সালাম। এই যোদ্ধাদের জন্য রইল অফুরন্ত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অনেক দোয়া। ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন, আল্লাহ যেন আমাদের রক্ষা করেন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক