Naya Diganta

ন্যক্কারজনক আচরণ মেনে নেয়া যায় না

ন্যক্কারজনক আচরণ মেনে নেয়া যায় না

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত- গার্মেন্ট খাতের পরপরই এ স্থান। আর এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাঙ্গা রেখে অর্থনীতিতে গুরুতপূর্ণ অবদান ও ভূমিকা রাখেন বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোটিরও অধিক প্রবাসী। আর তাদের নিয়ে বেশ কিছু ন্যক্কারজনক ঘটনা সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটেছে, যা খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা বলে দেখার বা চালিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত ছিল, শক্ত হাতে এ ব্যাপারটি মোকাবেলা করা, যেমনটি ব্রিটিশ সরকার করেছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রথম দিকে ব্রিটেনে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের ওপর কয়েকটি চোরাগোপ্তা হামলা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার শক্ত হাতে তা দমন করার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রবাসীদের সাথে ন্যক্কারজনক আচরণের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরকার কি ভেবে দেখছে? বিশ্বমহামারীর পর অনিবার্যভাবে ধেয়ে আসা বিশ্ব-অর্থনীতির মন্দা ও দুর্ভিক্ষে প্রবাসীরা যদি রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধ করে দেয় বা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির কী ক্ষতি হতে পারে তা কি একবার তলিয়ে দেখা হয়েছে? প্রবাসীদের সাথে অমানবিক আচরণে কোটি প্রবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কেঁদে কেঁদে অনেক প্রবাসী তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছেন, ‘যাদের বছরের পর বছর টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছি, তারাও আজ আমাদের ভাবছে চরম শত্রু।’ এর রেশ অনেক দিন চলবে। এই অবস্থার উন্নতি না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
বিশ্বে মহামারী শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ সরকার চাইলেই দেশে আসা প্রবাসীদের ব্যাপারে সুন্দর একটা ব্যবস্থাপনা করতে পারত। প্রবাসীরা আকাশ থেকে উদ্ভূত হননি বা মাটির নিচ থেকেও উঠে আসেননি। তারা তো দেশের এয়ারপোর্ট (প্রধানত, একটি এয়ারপোর্ট) দিয়েই দেশে প্রবেশ করেছেন। সুতরাং তাদের সঠিক হিসাব বা তাদের বিষয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা কোনো ব্যাপারই নয়। ‘অন অ্যারাইভাল’ তাদের প্রত্যেককে কেন সঠিকভাবে টেস্ট করা হলো না? কেন তখনই সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এয়ারপোর্ট থেকেই তাদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে নেয়া হলো না? ঢাকার কয়েক ডজন আবাসিক হোটেল রিকুইজিশনের মাধ্যমে সরকারের আয়ত্তে এনে এবং ওখানে রেখে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তখন সহজেই কঠোরভাবে কোয়ারেন্টিন পালনে বাধ্য করা যেত প্রবাসীদের।

কিন্তু সরকার করবে কিভাবে? গত জানুয়ারিতে এগুলো করার কথা, তখন প্রায় অর্ধ ডজন মন্ত্রী হাস্যকর, খামখেয়ালি, চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অবিবেচক ও দৃষ্টিকটু কথাবার্তায় ছিলেন ব্যস্ত। আর এয়ারপোর্টে এ সংক্রান্ত ব্যাপারে দায়িত্বে রাখা হয়েছিল দৃশ্যত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, যারা ৫০০ টাকার বিনিময়ে ‘করোনাভাইরাস নেই’ বলে সনদ দিচ্ছিল কিংবা টাকা না দিলে ১৪ দিনের খামোখা কোয়ারেন্টিনে পাঠাচ্ছিল বলে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে। কিছু ভুক্তভোগী যাত্রী তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোডও করেছেন। যা সহজেই করা যেত, যা যথাযথভাবে ও কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তা না করে অযথা প্রবাসীদের দোষ দিয়ে কী লাভ?
মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আমার অনেক প্রত্যাশা। কেননা, দীর্ঘ দিন তিনি নিজেও প্রবাসী ছিলেন। কিন্তু তার ভূমিকা আবারো স্মরণ করিয়ে দিলো প্রবাদের কথাÑ ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’! তিনি মিডিয়ায় মারাত্মক আপত্তিকর মন্তব্য করে বললেন ‘প্রবাসীরা দেশে এলে নবাবজাদা বনে যান’! প্রবাসীদের নির্যাতন ও নাজেহালের ক্ষেত্রে তার এ মন্তব্য অনেকটা ‘আগুনে ঘি ঢালার মতো’। তার এই আপত্তিকর উক্তি থেকে দেশের সাধারণ মানুষ ও কায়েমি স্বার্থবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রবাসীদের নাজেহাল ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে উৎসাহ ও সাহস পেয়েছে। এ কথার নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে দুঃখ প্রকাশ করা তো দূরের কথা, কিছু দিন পর মিডিয়ায় তিনি ঘোষণা করলেন ‘করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া প্রবাসীদের লাশ দেশে আসতে দেয়া হবে না’। অথচ তার জানা উচিত ছিল, করোনাভাইরাসে কারো মৃত্যু হলে কঠোর বিধিমালার আওতায় স্থানীয়ভাবে দাফন করতে হয় এবং পরিবারের অনেক সদস্যও দাফন-কাফনে যোগ দিতে পারে না। দেশের বাইরে লাশ পাঠানো বা অন্য দেশে লাশ আনার চিন্তাই করা যায় না। কোনো এয়ারলাইন্স বা কার্গো বিমান সেই লাশ বহন করে না। এটা তো মন্ত্রীর অজানা থাকার কথা নয়। তিনি চাইলেও করোনাভাইরাসে মৃত কোনো ব্যক্তির লাশ বিদেশ থেকে দেশে আনতে পারতেন না। তাহলে এ ধরনের উক্তির হেতু কী?

শুধু প্রবাসীরাই কি বাংলাদেশে করোনাভাইরাস নিয়ে আসছেন? বিশ্বায়নের যুগে হাজার হাজার বিদেশী নাগরিক প্রতি মাসে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসেন। আবার সরকারি কাজে শত শত কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে বিদেশ সফর করতে হয়। প্রবাসী বাংলাদেশী ছাড়া তারাও তো বিদেশ থেকে করোনাভাইরাস দেশে নিয়ে আসতে পারেন। তাহলে কাকে দুষবেন? শুধু প্রবাসীদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কেন অবমাননাকর ও অপমানজনক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে বা চলতে দেয়া হচ্ছে? আর কোনো দেশে তার প্রবাসীদের সাথে এমন আচরণ করা হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশ এই মহামারীর সময়েও বিমান ভাড়া করে বিদেশে আটকে পড়া স্বদেশের নাগরিকদের ফেরত আনছে।

প্রবাসীদের দোষ দিয়েই যদি সব সুন্দরভাবে সমাধান করা যেত, তাহলে হয়তো তা মেনে নেয়া যেত! কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিটা সন্তোষজনক বলে মনে হয় না। সাধারণ ছুটি বা লকডাউন ঘোষণা করা হলো; কিন্তু প্রথম কিছু দিন দূরপাল্লার যান বা রেল বন্ধ করা হলো না। তাতে লাভ হলো কী? শহর/নগর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ গ্রামে/মফস্বলে গিয়ে ছোঁয়াচে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিলেন। ভাবছেন কি এর সুদূরপ্রসারী পরিণাম?
অনেক বাগাড়ম্বর করলেও এখন একজন মন্ত্রীকেও রাস্তায় দেখা যায় না। অল্প কিছু দিন আগেও কিনা দম্ভ ছিল! পশ্চিম বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে রাস্তায় নেমে লকডাউন মানতে উদ্বুদ্ধ করছেন। একটু হলেও ‘মমতা দিদির’ কাছ থেকে শিখে রাস্তায় নামুন না! জনগণকে সচেতন করুন। আর আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্বব্যাপী মহামারীর অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করি। অযথা প্রবাসীদের অপমান ও দোষাদোষি করে তাদের দূরে ঠেলে দেবেন না। দুর্দিনে প্রবাসীরা দেশের পাশে ছিল, ভবিষ্যতেও তারা দেশের পাশে থাকবে। তাদের সততা ও দেশপ্রেম প্রমাণিত এবং পরীক্ষিত।

লেখক : যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আইনজীবী, বিশ্লেষক ও লন্ডনের নিউহ্যাম কাউন্সিলের ডেপুটি স্পিকার