Naya Diganta

ট্রাম্প যখন ওষুধের ক্যানভাসার

ট্রাম্প যখন ওষুধের ক্যানভাসার

করোনাকাল! মানে এখনকার দুনিয়ায় যখন করোনাভাইরাসের ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাই বর্তমান হয়ে আছে। আমরা এরই জীবন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এর ভেতরেই জীবন-মৃত্যুর মধ্যে প্রতিদিন বসবাস করছি। বিশেষত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণিত ওষুধ বা কোনো প্রতিকার প্রতিষেধক মানুষের নাগালে মধ্যে এখনো নেই।

আমরা অপেক্ষা করছি ভ্যাকসিন প্রতিষেধক হাতে পাওয়ার। কারণ এ ধরনের ভাইরাসের প্রতিষেধক মানবদেহ নিজেই শরীরের ভেতরে তৈরি করে থাকে। আর যত দিন একটা ব্যাপকসংখ্যক আক্রান্তের শরীরে এটা পাল্টা তৈরি না হয়ে যায় তত দিনই আমরা ঝুঁকিতে এবং কষ্টে থাকি। এটাকে আমরা ভাইরাস প্রতিরোধক হয়ে যাওয়া মানুষ বা নতুন শরীর বা অ্যান্টিবডি বলে থাকি। মানব প্রজাতির জন্মলগ্ন থেকে আমাদের দুনিয়াতে মানুষের পাশাপাশি এ ধরনের কোটি কোটি অসংখ্য ভাইরাস এ পর্যন্ত হাজির হয়েছে আর আমরা আমাদের শরীরে এমন ভাইরাস প্রতিটিরই অ্যান্টিবডি হাজির করিয়ে টিকে গেছি। এবারো অবশ্যই সফল হবো। তবে এখনকার সময়কালটা হচ্ছে মেজরিটির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় দেয়ার, আর তত দিন কোনো মতে বেঁচে যাওয়ার। আর ওদিকে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকছি, যা পাওয়া গেলে তা এরপর থেকে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে মানুষকে সহায়তা করবে। এসব বিচারে এখনকার সময় এটাই হলো মানব-প্রজাতির ‘করোনাকাল’। মানে ‘নিও করোনাভাইরাসের’ (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া স্টান্ডার্ড নাম, কোভিড-১৯) নামে জীবাণুর সংক্রমণের কাল এটা। যে কেউ এর শিকার হয়ে পড়লে তা থেকে মৃত্যুও হতে পারে। সেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সবাই সেই করোনাকালে জীবন্ত বসবাস করছি। বলাই বাহুল্য, এটা দুনিয়ার মানব-প্রজাতির জন্য সাময়িক এক অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা।

খারাপ সময়ে অনেক কিছু ধরে রাখা যায় না; অন্তত খুবই কঠিন হয়ে যায়। পরিচিত চিরচেনা দুনিয়াটাও সে সময়ে হঠাৎ করে খুবই অপরিচিত মনে হতে থাকে। কারণ কোনো কিছুই আর আগের অর্ডার বা পরিচিত নিয়মশৃঙ্খলের মধ্যে নেই, থাকে না দেখতে পাই। আমরাও অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকি। কারণ বেঁচে থাকাটাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে।

এ সময় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় মানুষের মূল্যবোধ। তা ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া মানুষের মধ্যে বিপর্যয়ও দেখা দিতে পারে। মানে মানুষ কী করে আর কী করে না; করবে না, করতে পারে না। এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া ও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকা এ নিয়ে নতুন বিকশিত ভাবনা- যাকে আমরা মানুষের মূল্যবোধ বলি, তা ধরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই করোনাকাল মানুষের মূল্যবোধ রক্ষা বা ধরে রাখার পরীক্ষায় চরম এক কাল হয়েও উঠতে পারে।

গত চার শ’ বছরের দুনিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যদি আলোচনায় আনি তবে একে তিনটা বড় কালপর্বে ভাগ করতে পারি। প্রথমটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত যেটাকে ‘কলোনি ইকোনমি’ বা কলোনি-শাসনের ইতিহাস বলতে পারি। এ ক্ষেত্রে অনেকে ক্যাপিটালিজম শব্দ ব্যবহার করে। আমরা ইউরোপের নেতৃত্বে ‘কলোনি ক্যাপিটালিজমের যুগ’ বলতে পারি। এরই দ্বিতীয় পর্যায় বা রূপটা হলো আমেরিকার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত শতকের মোটা দাগে শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুগ। আর তৃতীয় রূপটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে চলতি শতকের শুরু থেকে (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল থেকে) চীনের নেতৃত্বে এবং ক্রমেই যা আমেরিকার বদলে চীনের প্রভাব দখল বা জায়গা নেয়া হয়ে বেড়েই চলছে।

দ্বিতীয় পর্যায়টায় ভালো অথবা মন্দ বহু দিকই আছে, যার সবকিছু আমেরিকার নেতৃত্বে ঘটেছে। ভালো-মন্দ দুটো মিলিয়েই সেখানে একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়মশৃঙ্খলা প্রথম হয়েছে। কিন্তু তৈরি হওয়া সেই নেতৃত্ব ও অর্ডার এই প্রথম মানে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে আমেরিকা নিজেই গ্লোবাল নেতাগিরি ও দায় এক প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছায় ত্যাগ করছে। এতে পুরনো গ্লোবালিস্ট নেতা আমেরিকা হয়ে যাচ্ছে ন্যাশনালিস্ট, মানে এক জাতিবাদী আমেরিকা। গত এক শ’ বছরে আমেরিকার এই রূপ দুনিয়া আগে দেখেনি।

যেকোনো সমাজে যার অর্থসম্পদ বেশি সমাজের দাতব্য কাজের উদ্যোগগুলোতে এর ব্যয়ভারের বড় অংশ তাকেই বইতে দেখা যায়। এটা বাস্তব এবং তিনি সামর্থ্যবান বলে এটা গ্লোবাল সমাজসহ সবখানেই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই গ্লোবাল নেতা তো বটেই, এ ছাড়া আমেরিকা বড় জনসংখ্যা মানে বড় অর্থনীতির দেশ বলেও জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ব্যয়ভারগুলোর বড় অংশের আমেরিকা থেকে জোগান এসেছে, গত ৭০ বছর ধরে। প্রথম এসব ব্যয়ভার আর বইবে না বলে এমন হুমকি দেয়া শুরু হয়েছিল জুনিয়র বুশের আমল থেকে। আর এবার করোনাকালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পুরো চাঁদাদানই বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তাও আবার খুবই ঠুনকো ও অপ্রতিষ্ঠিত কিছু অভিযোগ এবং বিশেষত দুনিয়া যখন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলা ও লড়াইয়ে প্রায় স্থবির। খোদ নিউ ইয়র্ক যখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা মৃত্যুর শহর। অথচ এ ফ্যাক্টগুলোর কোনোটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। অর্থাৎ করোনা-উত্তরকালেও যে সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারতেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি এখন কোন বিবেচনায় নিলেন- এর সদুত্তর নেই। অর্থাৎ এই প্রথম আমেরিকা শুধু গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে নিজেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে না বরং খোদ রাষ্ট্রটা নিজের জন্যও মূল্যবোধে খামতি বা সঙ্কট তৈরি করছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটা ওষুধ কোম্পানির পণ্য বা ওষুধের পক্ষে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। তিনি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের পক্ষে ওকালতি শুরু করে দিয়েছেন যেটা মূলত ম্যালেরিয়া নিরাময়ের ওষুধ। এর কার্যকারিতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরীক্ষিত নয়।
সাধারণত কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্টের ব্যক্তি-ব্যবসায়িক স্বার্থ যদি প্রেসিডেন্টের কোনো সিদ্ধান্তের ইস্যুতে জড়িয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সেই নির্বাহী ওই স্বার্থের ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মূলত এজন্যই কেউ প্রধান নির্বাহী বা মন্ত্রী হলে শপথগ্রহণের আগেই তিনি কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির নির্বাহী পদ ত্যাগ করে থাকেন যাতে স্বার্থ সঙ্ঘাতের বালাই না থাকে। যেমন, কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো ওষুধ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হলে তিনি ওই কোম্পানির ওষুধ সরকারকে দিয়ে কেনাতে প্রভাবিত করে ফেলতে পারেন। এমনটা যেন না হয় তাই তিনি আগেই কোম্পানির মালিকানা-পদত্যাগ করে থাকেন।

অথচ এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ‘সানোফি’ নামের এক ওষুধ কোম্পানির পণ্য, যে কোম্পানির মালিকানায় আছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনেরা; এমনকি খোদ ট্রাম্পও এক ক্ষুদ্র শেয়ারের মালিক- এমন খবর ছেপেছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ইঙ্গিত করছেন তারা এ কারণেই ট্রাম্পের এই ওষুধের পক্ষে টাউটিং।
অথচ ট্রাম্প সেসব ফ্যাক্টসের পরোয়া না করে, উল্টো এই ওষুধ ব্যবহারের পক্ষে অন্ততপক্ষে পাঁচটি পাবলিক হাজিরাতে যুক্তি খাড়া করেছেন। তার এক কুখ্যাত আরগুমেন্টের মূল বক্তব্য হলো- ‘আপনার আর কী ক্ষতি হবে’ (হোয়াট ডু ইউ হ্যাভ টু লুজ)। এই কথা তুলে তিনি অপ্রমাণিত কার্যকারিতার ওষুধের দালালি করে থাকেন যা কোনো প্রেসিডেন্টের মুখে অশোভন। ট্রাম্প বলতে চান যেহেতু ‘করোনাভাইরাসের ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো নেই, তাই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত না হলেও এটা ব্যবহার করে দেখুনই না। এটা কাজে লেগেও যেতে পারে। এতে ক্ষতি কী?’

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হলো, এক. ওষুধসহ যেকোনো পণ্যের পক্ষেই কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট টাউটিংয়ে নামতে পারেন না। এটা আইনি দিক থেকে গর্হিত কাজ। কিন্তু ট্রাম্প এখানে আরেকটা আড়াল নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে এই ওষুধ তার সরকারকে দিয়ে কিনিয়ে বিপুল স্টক গড়েছেন। তিনি দাবি করছেন এই খারাপ সময়ে এর যতটুকু কার্যকর ওষুধ পাওয়া যায় তার সবটাই তিনি সংগ্রহ করছেন।

কিন্তু কোনো ওষুধ কার্যকর কি না, তা বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারেন কিন্তু তিনি পেশাদার ডাক্তার নন বা ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত-মন্তব্য করা তার এখতিয়ারের ভেতরেও পড়ে না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার সরকারের একজন এক্সপার্ট এই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, এখনো এটা ‘কান কথা (এনেকডোটাল এভিডেন্স)পর্যায়ের তথ্য, প্রমাণিত সত্য নয়। এমন একজন হলেন ডা: এন্থনি ফাউচি। তিনি হলেন, সরকারি অ্যালার্জি ও সংক্রামক রোগবিষয়ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং ট্রাম্পের করোনা সম্পর্কিত টাস্ক ফোর্স কমিটির একজন লিড মেম্বার। ফাউচি তার আপত্তির কথা সরকারি অভ্যন্তরীণ এক সভায় উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিএনএনের সাংবাদিক প্রকাশ্যেই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ওষুধের কার্যকারিতার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে বিফ্রিংয়ে উপস্থিত, ফাউচির বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বাধা দেন, ফাউচি কথা বলবেন না বলে থামিয়ে দেন। মানে, যা বলার ট্রাম্প নিজেই বলবেন।

অর্থাৎ কোনো ওষুধের টেকনিক্যালবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারকে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেয়া এখতিয়ার বলে চালিয়ে দিলেন যেন কোনো রোগী দেশের প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করে ওষুধ খাবেন- এটাই ট্রাম্প দাবি করলেন। ট্রাম্প এই ওষুধের ব্যবসাটা ধরতে এতই মরিয়া যে, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হুমকি ধমকি দিয়ে বসেন।

ম্যালেরিয়া মূলত এশিয়ায় বা আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। তাই দুনিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ উৎপাদনে বড় দেশ হলো এশিয়ায়, বিশেষত বড় জনসংখ্যার বা বাজারের দেশ। ভারতের তিনটি কোম্পানি ভারতের বার্ষিক চাহিদার চেয়েও ১০ গুণ বেশি পর্যন্ত কাঁচামাল উৎপাদন ও তা থেকে এ ওষুধ পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষম। তাই ট্রাম্প ভারতের মোদিকে ফোন করে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ রফতানি-সরবরাহের অনুরোধ জানান। অর্থাৎ ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত হোক আর না হোক, ট্রাম্প আমেরিকার সরকারি স্টক হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের সরবরাহ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। যেন ট্রাম্প একটা পাবলিক ইমেজও চাচ্ছিলেন যে, করোনার কথিত ওষুধ সংগ্রহে তিনি কত তৎপর। ওদিকে মোদিও দেখলেন এটা তারও ‘দেশপ্রেম’ দেখানোর এবং গলাবাজি একটা বিরাট সুযোগ। তিনি পাল্টা ট্রাম্পকে জানিয়ে দিলেন, নিজ দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তিনি সাপ্লাই করতে পারছেন না। আসলে এটাও একটা মিথ্যা কথা। কিন্তু মোদি আসলে নিজ দেশে দেখাতে চাইছিলেন, তিনি কতই না দেশপ্রেমিক। কারণ ভারতের বছরের চাহিদা সর্বোচ্চ ২২ মিলিয়ন পিস। আর উৎপাদন সক্ষমতা ২০০ মিলিয়ন। বড় কথাটা হলো, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনার পরীক্ষিত ওষুধও নয়। ভবিষ্যতে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ, ভাইরাসের প্রতিষেধক মূলত ভ্যাকসিন বা টিকা। হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ব্যবহার বড়জোর যেন টোটকা। তাও হার্টের অসুখের রোগীর ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মারাত্মক, সে রোগীকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলার মতো হতে পারে।

তার মানে মোদি আর ট্রাম্প দু’জনই পাবলিককে বোকা বানাচ্ছেন আর দেশপ্রেম বেচছেন!

কিন্তু হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট মোদি আমেরিকাকে সরবরাহের অপারগতা জানানোকে ট্রাম্প খুবই সিরিয়াসলি নিয়ে মোদিকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বসেন। ট্রাম্প পাবলিকলি বলে দেন, হয় মোদি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন সাপ্লাই করবেন, না হলে এর পরিণতি ভোগ করবেন। তামাশার কথা হলো, দুই চাপাবাজ এবার মুখোমুখি হয়ে যাওয়াতে শেষে মোদি দ্রুত সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এবার ‘উল্টো গান’ ধরেন। করোনাকালে দরকারের সময় তিনি মহান উদার সরবরাহদাতা সেজে গেলেন। এবার তিনি আমেরিকার ট্রাম্পকে তো বটেই; সার্কের পড়শিদের মধ্যে বাংলাদেশকেও নিজে থেকে তা সরবরাহের অঙ্গীকার ঘোষণা করলেন।

এদের বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান আর সরকারপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা কতটুকু তা এখানেই ধরা পড়ে যায়। যেমন- ওষুধ আর পাঁচটা পণ্য নয় যেটা যেকোনো ব্যবসায়ীই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিজেই যথেষ্ট। কাজেই বাংলাদেশ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের আমদানির অনুমতি দেবে কি না সেটি মোদি তো নয়ই, এমনকি এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইস্যু বা এখতিয়ারই নয়। আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের টেকনিক্যাল সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া এই ওষুধ আমদানিযোগ্য নয়। বলাই বাহুল্য, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের প্রমাণিত কার্যকারিতার সার্টিফিকেট না পেলে সে প্রশাসন এই অনুমতি দিতে পারে না।

আসলে ওষুধের ব্যাপারে আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) দুনিয়ায় আদর্শ স্থানীয়। এর নিজস্ব ল্যাবে প্রমাণিত ও অনুমোদিত না হলে আমেরিকার কোনো উৎপাদক তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক পণ্য আমেরিকায় বাজারজাত করতে পারে না। কারণ নাগরিক ভোক্তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক সঠিক ও অক্ষতিকর পণ্য ভোগের অধিকার রক্ষার্থেই এফডিএ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। আর এটাকে আদর্শ মেনেই ১৯৮২ সালে এ অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ১৯৮২ সালের বিখ্যাত ওষুধ নীতিতে বাংলাদেশেও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর খোলা হয়েছিল। আমেরিকার এফডিএর সমতুল্য ইউরোপেরও প্রতিষ্ঠান আছে। তবে সুনাম ও স্ট্যান্ডার্ডের দিক থেকে এফডিএ দুনিয়ায় সেকালে অনুসরণযোগ্য মানা হতো।

কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা শুধু তার গ্লোবাল নেতৃত্বের কৃতিত্ব ও গৌরবই হারায়নি, বহু বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডও ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। ব্যবসা ও মুনাফার স্বার্থের কাছে কোনটা ওষুধ কোনটা নয়, এর ভেদাভেদ গুণ বিচারও লুটিয়ে দিয়েছে। আর ট্রাম্প নাকি সবচেয়ে বড় ওষুধ বিশেষজ্ঞ! তাই নিউ ইয়র্ক টাইম বলেছে, ট্রাম্প যে মূলত একজন ব্যবসায়ী মূলত হাউজ বিল্ডিং ডেভেলপার, তার মানে যিনি ‘একজন সেলসম্যান তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন’, তিনিই এখন করোনা সংক্রমণে কোন ওষুধ খেতে হবে, এর বিশেষজ্ঞ বনে গেলেন!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]