Naya Diganta
হতদরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ

হাত বাড়িয়ে দেয়ার সময় এখন

হতদরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ

বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে করোনা সংক্রমণে। কিছু বুঝে ওঠার আগে সব কিছু পাল্টে গেল। মানব ইতিহাসে এ ধরনের অভূতপূর্ব পরিস্থিতি এবারই প্রথম নয়। তবে এবার পুরো পৃথিবী একসাথে আক্রান্ত হয়েছে। অপ্রস্তুত মানুষ ঘটনার আকস্মিকতায় দিশাহীন হয়ে পড়েছে। বিশ্বের দেশগুলো পরস্পর নির্ভরশীল হওয়ায় করোনার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বের সবাইকে স্পর্শ করেছে। রোগে আক্রান্ত হয়ে কষ্টের শিকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের ওপর অর্থনীতির প্রভাব। মানুষ এখন শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য কিনছে। বাকি অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কেনা প্রায় বন্ধ।
এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বাস্তবতার একটা ভিন্ন প্রেক্ষিত রয়েছে। এ দেশে বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। এর মধ্যে একটা শ্রেণী রয়েছে যারা দিন আনে দিন খায়। আর রয়েছে মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল বিশাল একটা শ্রেণী। তারা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপদে। এর মধ্যে উন্নত দেশগুলো মানুষের সহায়তায় বড় বড় তহবিল ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের দেশের দরিদ্র দিনহীন মানুষের দৈনন্দিন আহারের কী ব্যবস্থা হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।
গত বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়েছে। এ সময়ে দেশজুড়ে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দোকানপাট-বিপণিবিতান, গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। জরুরি সেবাগুলো এ সময় চালু থাকবে। ওষুধ নিত্যপণ্য ও কাঁচাবাজার চালু থাকবে। এ অচলাবস্থা চলবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপরে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর মধ্যে আয়-রোজগারের সব পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, অটোরিকশাচালক, গণপরিবহনের চালক ও সহকারী সবাই বেকার হয়ে গেছেন। সবজি-ফল, চা-পান বিক্রেতাসহ ফুটপাথে প্রতিদিন বিক্রি বাট্টা করে চলা লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে গেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বাসাবাড়িতে কাজ করে যারা জীবন নির্বাহ করত তারা। বড় বড় বাজার ও বাসস্টেশন-রেলস্টেশন অন্যান্য জনসমাগমে মানুষের উপস্থিতি শূন্য হয়ে যাওয়া এসব জায়গায় খুচরা ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ঢাকাসহ সারা দেশের সব শহরের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়েছে। ঢাকায় দেখা যাচ্ছে, শ্রমজীবীদের কেউ কেউ পেটের তাগিদে বের হচ্ছেন। যেমন রাস্তায় কিছু রিকশা ও সিএনজি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তারা যাত্রী পাচ্ছে না। একজন পথচারী পেলে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কত টাকা দিতে হবে সেই দরকষাকষিও করছে না। আপনি ইনসাফ করে দিয়েন। তাদের এমন মনোভাব। পরিস্থিতি কতটা দিশেহারা টের পাওয়া যাচ্ছে।
খবরে জানা যাচ্ছে, সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় প্রতিটি জেলায় ২০০ থেকে ৫০০ টন করে চাল বরাদ্দ দিয়েছে। নগদ দেয়া হয়েছে দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে চাল আটা লবণ চিনি তেল নুডলস প্রভৃতি প্যাকেট করে অভাবী মানুষের জন্য সরবরাহ করছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু অভাবী মানুষের চেয়ে এমন উদ্যোগ নিতান্ত সামান্য। যেখানে সারা দেশে দিন আনে দিন খায় এবং অভাবী মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি, সেখানে এমন উদ্যোগ সব মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে প্রকৃত অভাবীদের কাছে পৌঁছা। এ দায়িত্ব সরকারের। রাষ্ট্র্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সেসব মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। আবার সরকারের একার পক্ষে পুরো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ কাজে বিত্তশালীদের এগিয়ে আসা উচিত। করোনার মতো দুর্যোগ পৃথিবীতে সব সময় হয় না। এ সময়টা মানবতার জন্য বড় পরীক্ষার। যার আছে তাকে এ সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা প্রত্যাশা রাখতে চাই একজন মানুষও যেন অভুক্ত না থাকে।