Naya Diganta

নির্যাতনে প্রাণ দিলো সুমি

নাহিদা আক্তার সুমি


মিরসরাইয়ের আলোচিত নাহিদা আক্তার সুমি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মূল ঘটনাকে আড়াল করে পুলিশের বিরুদ্ধে তড়িগড়ি করে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ১৩ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশ সুমির পরিবার। মেয়ে হারানোর শোকে মা পারভীন আক্তার পপি পাগলপ্রায়, মেয়ের শোকে প্রবাস থেকে ছুটে এসেছেন বাবা নুরুল আফসার। সুমির লাশ দাফনের পর পরিবার জানতে পারে এ ঘটনায় জোরারগঞ্জ থানায় পুলিশ একটি মামলা করেছে। যেখানে ঘটনার সাথে মামলার বিবরণের কোনো মিল নেই।
জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামের সুনুু মিয়া সওদাগর বাড়ির প্রবাসী নুরুল আফসারের মেয়ে নাহিদা আক্তার সুমিকে হত্যা করে স্বামী মীর হোসেন প্রকাশ ফারুকসহ তার পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় জোরারগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলায় (নং-৪) হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাত জনের বিরুদ্ধে সুমির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হলেও থানা পুলিশ তাদের মনগড়া এজাহার লিখে তাতে শুধু স্বামী মীর হোসেন ফারুককে আসামি করে। এ সময় থানা পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বাকি ছয় জনকে বাদ দিয়ে সুমির ময়নাতদন্তের কথা বলে মামলায় সুমির মা পারভীন আক্তার পপিকে বাদি করে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। এই ঘটনায় পুলিশের প্রতি ক্ষুব্ধ সুমির পরিবার। ১৮ ফেব্রুয়ারি মিরসরাই প্রেস কাবে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদা আক্তার সুমির মা পারভীন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ২০১৩ সালের ২০ মে হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামের চিনকীরহাট এলাকার আক্তার মিয়ার ছেলে মীর হোসেন প্রকাশ ফারুকের সাথে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে আমার মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে পাঁচ পদের ফার্নিচার দিই। বিয়ের পর কিছু দিন তাদের সংসার সুখে কাটলেও বিগত চার বছর যাবৎ আরও যৌতুকের দাবিতে স্বামী মীর হোসেন ফারুক ও তার বাবা-মা আমার মেয়েকে শারীরিক অত্যাচার-নির্যাতন করত। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন সময় তার স্বামীকে আমি প্রায় ছয় লাখ টাকা দিয়েছি। টাকা দেয়ার পর কিছু দিন ভালো থাকলেও পরে আবার তারা নির্যাতন করত। নির্যাতনের জন্য একাধিকবার গ্রাম্য সালিসও হয়। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল জোরারগঞ্জ থানায় আমার মেয়ে বাদি হয়ে স্বামী মীর হোসেন ফারুক, শ্বশুর মো: আক্তার মিয়া, শাশুড়ি নুর খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে থানায় বৈঠক হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর নির্যাতন করবেন না এ মর্মে পুলিশ বিবাদিদের থেকে মুচলেখা নিয়ে সুখের সংসার করবে মর্মে আমার মেয়েকে নিয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই ফারুকের নির্যাতনের মাত্রা কমেনি। বরং দিন দিন তার নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। সবশেষ গত ১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় এক লাখ টাকা আনার জন্য আমার মেয়েকে মারধর করে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় সুমিকে আর মারধর করবে না এবং টাকা দাবি করবে না বলে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে ভাড়া বাসায় নিয়ে আসে। পরের দিন ৯ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার সময় স্বামী মীর হোসেন ফারুক আমাকে ফোন দিয়ে বলে; তোমার মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে, তার লাশ নিয়ে যাও। এটি শোনার পর আমি দ্রুত তাদের ভাড়া বাসায় যাই। সেখানে গিয়ে দেখি সুমিকে মেরে বাসার সামনে ফারুকের প্রাইভেট কারের পেছনের সিটে সুমির লাশকে সোজা করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে গ্রামবাসীর সহায়তায় তার লাশ আমরা বাড়িতে নিয়ে যাই। খবর পেয়ে বেলা ২টায় জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে যায়। একই দিন রাত ৮টার সময় লাশের ময়নাতদন্ত ও জিডি করার কথা বলে ওসি (তদন্ত) মো: মাকসুদ আলম আমার থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেন। মেয়ের শোকে ওই সময় আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। পরবর্তীতে পত্রিকায় জানতে পারি আমার মেয়েকে খুনের ঘটনায় আমাকে বাদি করে জোরারগঞ্জ থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নাদিয়া আক্তার সুমির বাবা মো: নুরুল আফসার, ফুফা মো: মুসা মিয়া, খালা আছমা পারভীন আক্তার, খালু আবুল হাশেম মেম্বার।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জোরারগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো: রায়হান উদ্দিন বলেন, মামলার এজাহারের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমাকে শুধু মামলাটি তদন্ত করতে দেয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে কিভাবে মৃত্যু হয়েছে তা জানা যাবে।
জোরারগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: মাকসুদ আলম বলেন, মামলার বাদিকে সহায়তা করার জন্য থানায় এজাহার লেখা হয়েছিল। তাতে বাদির বক্তব্যের বাইরে কোনো কিছু লেখা হয়নি। তা ছাড়া এজাহারটি অফিসার ইনচার্জ পর্যালোচনা করে মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, বাদির দেয়া এজাহারের ভিত্তিতে মামলা নেয়া হয়েছে। এজাহারে পুলিশের নিজস্ব বক্তব্য সংযোজনের কোনো সুযোগ নেই। পুলিশের তদন্ত শেষে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হবে।