Naya Diganta

মাধ্যমিকের আগেই ঝরে পড়ে বালিয়াকান্দির ঋষিপল্লীর ছেলেমেয়েরা

‘পড়ালেহা করি চাকরি ভাগ্যে জোটে না। টাহা পয়সা খরচ করে কী হবি। তাই আগেভাগেই হাতের কাজ শিহা ভালো। স্কুলে গেলে খাবার দিবি ক্যাডা? পড়ালেহা করি চাহরি হয় না, তাই সংসার চালাতে ৮-১০ বছর বয়স হলেই কাজে লাইগে যাতি হয়।’ এমনিতেই বাঁশ-বেতের মূল্য চড়া হওয়ায় যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার পরিচালনা করা দুষ্কর। তাই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে অভিভাবকদের ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক অনটনের কারণে তা সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের আগেই ঝরে পড়ে। সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ নজর ও বৃত্তির ব্যবস্থা করায় দলিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার আগ্রহ বাড়লেও পরিবারের আর্থিক অনটন এখানে বড় বাধা। সুপেয় পানির জন্য ব্যক্তি উদ্যোগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নলকূপ বসিয়েছেন অনেকে। পল্লীতে প্রবেশের কোনো রাস্তাও নেই। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকার পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।
এ অবস্থা রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পূর্বমৌকুড়ি গ্রামের ঋষিপল্লীর। এ পল্লীর পরিবারগুলোর প্রধান আয়ের উৎস বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্র ও তেজসপত্র তৈরি করে বিক্রি করা। এ দিয়ে যে অর্থ আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এখন অনেকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে সেলুনসহ অন্যান্য কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। ঋষিপল্লীর শিশুদেরকে স্থানীয় ব্যাপিস্টচার্চ স্কুল, ব্র্যাক স্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আটজন ছেলে, ১০ জন মেয়ে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন ছেলে, চারজন মেয়ে, ব্র্যাক স্কুলে আটজন ছেলে, ছয়জন মেয়ে লেখাপড়া করে। কলেজে পড়ে দু’জন। ঋষিপল্লীর জন্য কোনো পয়নিষ্কাশন সুবিধা নেই। নিজেদের অর্থায়নে নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবস্থা করে তারা। ব্যক্তি উদ্যোগে ও বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় অন্তত আটটি নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। ব্র্যাকের মাধ্যমে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার স্যানিটেশন সুবিধা পেলেও বেশির ভাগ পরিবার এখন ব্যক্তি উদ্যোগে ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করেছে। অসুস্থ হলে বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যরা পল্লী চিকিসকের পরামর্শ নেয়। দু-একজন হাসপাতালে গেলেও ডাক্তার সঙ্কট ও ঠিকমতো ওষুধ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ে। গর্ভবতী মায়েদেরকেও ব্র্যাকের সামান্য সহায়তায় রাজবাড়ী কিংবা ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। ঋষিপল্লীর বাসিন্দা কানু দাস, নিরান দাস, পরেশ দাস, মিলন দাস, সুবোধ দাস, রতন দাস, নারায়ণ দাস, সুজন দাস, প্রদীপ দাস তাদের জীবনের এসব দুর্দশার কথা জানালেন।
এ পল্লীর ছেলেরা বেশির ভাগ পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে। মেয়েরা বেশি দূর এগোতে পারে না, বেশির ভাগের হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পরই বিয়ে হয়ে যায়। প্রায় সব ক’টি পরিবারের ছেলেমেয়েকে ১৪-১৫ বছর বয়স হলেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। মাঝপথে ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই বলেছে পরিবারের আয় না থাকায় লেখাপড়ার খরচ জোগাতে ব্যর্থ হওয়ায় তার স্কুল ছেড়েছে। এদের বেশির ভাগই পঞ্চম শ্রেণী থেকে লেখাপড়া বাদ দিয়েছে। ঝরে পড়ার কারণ দারিদ্র্য।
পূর্ব মৌকুড়ি গ্রামের সচেতন ব্যক্তি মিলন দাস ও বিপুল দাস জানান, ঋষিপল্লীতে ৩৩টি পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা দুই শতাধিক। বেশির ভাগই সদস্য বাঁশ ও বেত দিয়ে জিসিসপত্র তৈরি করে বিক্রি করে। আবার কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজায়। এখন এ পেশা ছেড়ে অনেকেই সেলুনের কাজে ঝুঁকে পড়েছে। বাপ-দাদার পেশা ছাড়া তাদের আর অন্য কোনো আয়ের উৎস নেই।