Naya Diganta

জাতীয় ঐক্যের সোনার হরিণ

রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ

রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ সম্প্রতি দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই জনপদের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী রাষ্ট্রপতি নিজের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা এবং বিপুল অভিজ্ঞান সঞ্জাত উপলব্ধি থেকে যে আহ্বান জানিয়েছেন, আজকের সমাজ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সেটা অত্যন্ত সময়োপযোগী তো বটেই, সেই সাথে তা গভীর তাৎপর্য বহন করে।

রাষ্ট্রের শীর্ষ অবস্থান থেকে নির্মোহভাবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সুবিবেচনাপ্রসূত যে বার্তা রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে হাজির করেছেন- সেটা উপলব্ধি করা এবং সেই আহ্বানে সাড়া দেয়া ব্যতীত কালক্ষেপণ করলে সেটা হবে আত্মহননের শামিল। রাষ্ট্রপতির এই ডাক সর্বসাধারণের প্রতি তো বটেই, তার চেয়ে বেশি লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যারা নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব করেন সেই শ্রেণীর প্রতি। কেননা, সমাজ ও রাষ্ট্রে ঐক্য উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসে। সেজন্য তাদের প্রতি রাষ্ট্রপতির এই আহ্বান বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আর জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে অন্তরায়গুলো রয়েছে, সেগুলো নেতৃত্ব-কর্তৃত্বকারীদের বোধ-বিবেচনার মধ্যেই বিদ্যমান। তাই রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান দেখিয়ে এ নিয়ে তাদের নিজেদের ভেতরকার নেতিবাচক ধারণাগুলো সংশোধন করে নেয়া উচিত। এমন ভূমিকা পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। তা ছাড়া প্রজাতন্ত্রের একনম্বর নাগরিক হিসেবে তাদের এই সম্মান পাওয়াটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও সৌন্দর্যের মধ্যে পড়ে। অপর দিকে, এই আহ্বানের প্রতি যদি কান দেয়া না হয়, তবে জাতির কোনো ক্রান্তিকালে কাউকেই আর মধ্যস্থতার জন্য হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন ভাগ্যাহত হওয়াটা হবে নৈরাজ্য আহ্বান করে নিজেদের অস্তিত্বের বিনাশ ঘটানোর মতো মর্মান্তিক বিষয়।

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার পরিবর্তে তিনি তো এই আহ্বান না জানিয়ে নির্দেশ দান ও কর্মনীতির ঘোষণা দিতে পারতেন। এমন পরামর্শের স্থলে তার আদেশ না দেয়ার বিষয়টি সাধারণভাবে জিজ্ঞাস্য হয়ে উঠতে পারে। আসলে তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে পারেন মাত্র। সংবিধান তাকে যতটুকু ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী করেছে, তার সেই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটি একান্তই আলঙ্কারিক। সংবিধান তাকে এই অবস্থানে রেখেছে এবং তার ক্ষমতা ও কার্যাবলি অত্যন্ত সীমিত। এ দেশের শাসনতন্ত্র বাহ্যত তাকে দুটি বিষয়ে ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু এর বিশ্লেষণে দেখা যাবে, সেখানেও তিনি পরিপূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী নন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে তাকে ক্ষমতা দেয়া হলেও বস্তুত নির্বাহী বিভাগের অদৃশ্য পরামর্শের বাইরে গিয়ে তার পক্ষে স্বীয় বিবেচনায় কিছু করা অসম্ভব। দ্বিতীয় যে ক্ষমতা তার রয়েছে সেটা হলো- রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী তথা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ দেয়া। তবে এ ক্ষেত্রে যে প্রথা-প্রক্রিয়া রয়েছে তার ভিন্নতা করার কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। জাতীয় সংসদের কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ অলকৃত করা এবং মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আহ্বান জানানো ছাড়া রাষ্ট্রপতির গত্যন্তর নেই। সংসদীয় ব্যবস্থায় দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সব কর্ম ও কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি ও তার মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির কাছে নয়, বরং সম্মিলিতভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। তাই রাষ্ট্রপতির জাতীয় ঐক্যের যে প্রয়োজন ও উপলব্ধি, সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকেই প্রথা অনুসারে সবিশেষ উদ্যোগী হতে হবে। তবে এটা ঠিক, রাষ্ট্রপতির ঐক্যের যে বোধ-বিবেচনা সেটা নির্বাহী বিভাগের অনুসরণ করাই নৈতিক দায়িত্ব। যাই হোক, সার্বিক বিবেচনায় এটা মেনে নিতে হবে যে, প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় ও অভিমত উপেক্ষা করা রাষ্ট্রপতির পক্ষে কার্যত সম্ভব নয়। তাই এ কথা সবাই মনে করতে পারেন যে, সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় এ বিষয়টি ক্ষমতার ভারসাম্যকে বিঘিœত করতে পারে।

এমন সব হিসাব বাদ দেয়ার পরও রাষ্ট্রপতির আহ্বান থেকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, এখন প্রজাতন্ত্রে জাতীয় ঐক্য বিদ্যমান নেই। তবে বোদ্ধারা মনে করেন, রাষ্ট্রপ্রধানের এই আহ্বানের মধ্যে নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি সূক্ষ্ম নির্দেশ রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে ‘আকলমন্দ কে লিয়ে ইশারা কাফি’। অর্থাৎ, বুদ্ধিমানদের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপতির বার্তা বোঝার মতো বহু ‘আকলমন্দ’ প্রশাসনে রয়েছেন। আর এমনটিও যেন না হয় যে, এই আহ্বানকে প্রতিপক্ষের বচন হিসেবে ধরে নিয়ে গুরুত্ব না দেয়া।

জাতীয় ঐক্য একটি সম্মিলিত বোধ-বিবেচনা। আর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি এবং তার স্বরূপ ও ব্যাখ্যা, সেই সাথে শাসনব্যবস্থা দেশে দেশে ভিন্ন হয়ে থাকে। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্যের ধারণা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন শাসকদের একান্ত নিজস্ব বিবেচনাপ্রসূত। তাতে সর্বজনীনতার কোনো স্থান নেই। এই শাসক শ্রেণী ঐক্যের প্রশ্ন নিজেরাই নির্ধারণ করে নেয়। আর তাকে মান্য করা সবার জন্য একান্ত বাধ্যতামূলক বলে স্থির করা হয়। এভাবে অন্যান্য বিষয়ের মতো ঐক্যের ব্যাপারটি কর্তৃত্ববাদিতার একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। স্বাভাবিকভাবেই, এমন চাপিয়ে দেয়ার কাজটি সব মানুষের কাছে প্রকৃতিসম্মত নয়। আর এই প্রক্রিয়া নাগরিকদের কাছে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পায় না, বরং এক ধরনের শৃঙ্খল হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে এবং তখন মানুষ তাতে কোনো আন্তরিক নৈকট্য খুঁজে পায় না। এমন কৃত্রিম ঐক্য জাতির সঙ্কটকালে সঙ্ঘবদ্ধতার প্রমাণ দেখাতে পারে না। বরং বিপরীত ঘটনা ঘটে।

এখানে অতীতের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন- অধুনাবিলুপ্ত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন ছিল, তখন তাদের জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি সব মানুষের মানসিকতা ও আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি। বরং শাসকের দ্বারা স্থিরীকৃত হয়েছিল। ফলে এর সাথে একাত্মতা অনুভব করত না সাধারণ মানুষ। হঠাৎ যে সময় এসব দেশের পতন ঘটছিল, তখন সাধারণ মানুষ এ জন্য কোনো বেদনাই অনুভব করেনি। তারা বরং এই পতনকে ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছিল এবং সে ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য। সেসব দেশের মানুষ তাদের রাষ্ট্রের পতনকালে নিছক নীরব দর্শক ছিল না, তারা সেই পতনকে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সাথে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের বন্ধন, ঐক্য ও সংহতির সাথে তারা কোনো একাত্মতা অনুভব করতে পারেনি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে থাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বোধ-বিবেচনা আর অনুভূতির সংমিশ্রণে। আর সেই ঐক্যের উপাদান হচ্ছে কতগুলো মৌলিক প্রশ্নে একমত হওয়া। আর সব সাধারণ বিষয়ে মুক্ত বিচার-বিশ্লেষণের অবকাশ থাকে। মৌলিক এ প্রশ্নগুলো স্থিরীকৃত হয় মুক্ত সংলাপ আর জাতীয় অভিপ্রায়-অভিব্যক্তির আলোকে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভব তাতে সন্নিবেশিত থাকে। সেজন্য এসব গণতান্ত্রিক দেশে জাতীয় কোনো সমস্যা সঙ্কটে গোটা দেশবাসী একই সুর লয়ে স্পন্দিত হয়ে থাকে। ফলে জাতীয় কোনো ক্রান্তিকালে তাদের মধ্যে ভেদবিভেদ সৃষ্টি হতে পারে না। জাতীয় ইস্যুগুলোতে সবার সম্পৃক্ততা থাকে বলে এমন ঐক্য স্থায়ী বা টেকসই হয়ে থাকে। বস্তুত এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য এখানেই নিহিত। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে প্রশাসনের সাথে জনগণের কোনো সম্পর্ক থাকে না, পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য নিয়ে যে সঙ্কট রয়েছে, সে উপলব্ধি রাষ্ট্রপতির ভাষণ থেকেই উঠে এসেছে। কোনো কিছুর অভাব থাকলে সেটা অনুভব এবং সেজন্য যাঞ্ঝা করা হয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় আনলে বলা যায়, ঐক্যের অভাব আছে বলেই রাষ্ট্রপতি সেজন্য এমন আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে ঐক্য সৃষ্টির পথ-পন্থা খোঁজা বড়ই জটিল। কেননা, রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি বাহ্যত গণতান্ত্রিক; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- গণতন্ত্রের অনুশীলন করার ক্ষেত্রে তার বৈশিষ্ট্যগুলো পরিস্ফুট বা দৃশ্যমান নয়।

আর এই অভিযোগ শুধু তাত্ত্বিক নয়। কেননা, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও জোট দীর্ঘদিন থেকে এদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। গণতন্ত্রের যে প্রধান অনুশীলন হলো সুষ্ঠু নির্বাচন, সেটা আজ এদেশে এতটা কলুষিত হয়ে পড়েছে যে, ভোটের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। ভোটাররা নিজেদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। অস্বচ্ছ এবং প্রশ্নযুক্ত ভোট প্রক্রিয়ার কারণে, বলতে হয়, গণতন্ত্র এখন নির্বাসিত। সেজন্য জাতীয় ঐক্যের বিষয়টির গণতান্ত্রিকভাবে নিষ্পত্তি ঘটানোর সুযোগ নেই। অথচ একটি জাতি যদি কিছু ন্যূনতম বিষয়ে একমত হতে না পারে, তবে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাদের বিশৃঙ্খল হওয়া ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। সে ক্ষেত্রে, এই বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবেই তার শৌর্য-বীর্য হারিয়ে পদানত হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতির সাথে ঐক্যের ঘাটতির জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যর্থতাকেও দায়ী করতে হবে। আমাদের সামনে যে নেতৃত্ব আমরা দেখতে পাই তারা ম্রিয়মান ও নি®প্র্রভ। তাই তাদের পক্ষে জাতীয় ঐক্যের জন্য সব মানুষকে একসূত্রে গেঁথে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তারা একই মন্ত্রে সবাইকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছেন না।

এ নেতাদের দিয়ে জাতি সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে না, বরং আরও বিভক্ত হচ্ছে। এমন সব ঠুনকো বিষয়ে নেতারা বাকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন যার ফলে ভদ্রতা-ভব্যতা আর সৌজন্যের পরিপন্থী এক কুরুক্ষেত্র রাজনীতির অঙ্গনে তৈরি হচ্ছে। ঐক্য মূলত উপর থেকে নিচে নেমে আসে। এর পরিবর্তে, এখন নেতৃত্বের কলহ সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। তা জাতীয় ঐক্য রচনাকে শুধু দুরূহ করছে না, মানুষে মানুষে সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি করছে।

এখন দেশের যে হাজারো সমস্যা তার সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রয়াসের একান্ত প্রয়োজন। তা কোনো একক ব্যক্তি ও দলের পক্ষে মোকাবেলা সম্ভব নয়। এ বিষয়টি সবাই বুঝতে হবে অখণ্ড মনোযোগ, বিবেচনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে। কিন্তু এমন জরুরি বিষয়ও সবার বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না। এমন এক উদার নেতৃত্বের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যারা সবাইকে নিয়ে একসাথে যতদূর যাওয়া সম্ভব হয়, তা নিশ্চিত করবেন। এমন নেতৃত্বের অভাব থাকতে পারে, কিন্তু তা দুষ্প্রাপ্য হবে এটা ভাবা ঠিক নয়। একজন সাধারণ মানুষও যদি নেতৃত্বের যাবতীয় গুণ অর্জন করতে পারেন, তিনিও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। তবে এমন ধারণাও অনেকে পোষণ করতে পারেন যে, জাতীয় জীবনে কোনো ঘোর ক্রান্তিকাল উপস্থিত হলে ত্রাতা হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারো আবির্ভাব ঘটতে পারে। এমন ধারণা প্রকৃতপক্ষে অদৃষ্টবাদীদের চিন্তাকর্মেই ঠাঁই পেতে পারে। মানুষ একে যৌক্তিক বা স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিতে পারে না।

স্বাভাবিকতার বাইরে কোনো কিছু আশা করা ঠিক নয়। তার চেয়ে বরং এমন প্রত্যাশা করাটাই আরো উত্তম যে, আমাদের নেতাদের সুবিবেচনা জাগ্রত হবে এবং তাদের সম্বিত ফিরে আসবে। যদি তা একান্ত অসম্ভব হয়, তবে নতুন নেতৃত্বকে সমাসীন করার জন্য জনগণের কাছে ফিরে যাওয়াটাই হবে উত্তম। জনগণ সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার জন্য নতুনদের আসার সুযোগ করে দেবে। তাদের দায়িত্ব হবে, জাতিকে সব বিভেদ বিসংবাদ থেকে মুক্ত করে প্রগতির দিকে নিয়ে গিয়ে জাতিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেয়া। মনে রাখতে হবে, এ দেশের ইতিহাসের পরতে পরতে এ পর্যন্ত রয়েছে কেবল জনগণের বঞ্চনা, আর না পাওয়ার যত দুঃখ বেদনা।

অথচ নিজেদের ভাগ্য বদলানোর জন্য সংগ্রাম-আন্দোলন তারা কম করেনি। আর নেতাদের নানা আশ্বাস-অভয় পেয়ে তারা জীবনে বহু আত্মত্যাগ করেছে। হেঁটেছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বহু কঠিন পথে; তখন চেতনায় ছিল অপরিসীম দেশপ্রেম। কিন্তু শেষে দেখা গেল যোগের খাতায় শূন্য, যেন এ যাবৎ হাঁটা হয়েছে নিছক মরীচিকার পেছনে। আজো সেই আশার একই গীতগাথা শোনানো হচ্ছে। তবে এখন মানুষ নির্লিপ্ত-নির্বিকার। আসলে ঠকতে ঠকতে তারা নিথর হয়ে গেছে। বিশ্বাস হারিয়ে আর কারো প্রতি তাদের নেই কোনো আস্থা।
[email protected]