Naya Diganta

হবিগঞ্জে স্কুলছাত্রী খুন : মূল আসামির স্বীকারোক্তি

জেরিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে জাকির

২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী হবিগঞ্জ রিচি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী মদিনাতুল কুবরা জেরিন সিএনজি অটোরিকশা থেকে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত মারা যায় এমনটাই প্রচার হয়েছিল। গত ১৮ জানুয়ারির দুর্ঘটনার সংবাদটি মিডিয়ায় এভাবেই আসে। জেরিনের পরিবারও মেনে নেয় দুর্ঘটনার বিষয়টি।

জেরিনের স্কুলের শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে, বিক্ষোভ করে। হবিগঞ্জ-লাখাই সড়কে সিএনজি যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। দুর্ঘটনার পরের দুই দিন ওই রাস্তা দিয়ে কোনো সিএনজি চলাচল করেনি। কোনো ধরনের ময়নাতদন্ত ছাড়া জেরিনের লাশ দাফন করা হয় গ্রামের বাড়ি ধল গ্রামে।

লাশ দাফনের পর পুলিশের কাছে গোপন সংবাদ আসে জেরিনের মৃত্যুর পিছনে রয়েছে ভিন্ন কারণ। বিষয়টি পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের নজরেও আনা হয়। পুলিশ জেরিনের মৃত্যুর বিষয় নিয়ে তদন্তে নামে।

বেশ কিছুদিন যাবত জেরিনকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল একই গ্রামের জাকির হোসেন। অপরদিকে পুলিশের কাছে তথ্য আসে যে সিএনজি দিয়ে জেরিন স্কুলে গিয়েছিল সে সিএনজির চালক হবিগঞ্জ সদর উপজেলার পাটলী গ্রামের নুর আলম।

নুর আলম ও জাকির হোসেনের মোবাইলে প্রযুক্তির সহযোগিতা নেয়া হয়। দেখা যায়, ঘটনার আগে-পরে অনেকবার জাকির হোসেন ও নুর আলমের মাঝে মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয়েছে।

আটক করা হয় জাকির হোসেনকে। জিজ্ঞাসাবাদে জাকির হোসেন স্বীকার করে একাধিকবার দেয়া প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জেরিনের ক্ষতি করার জন্য চেষ্টা করে আসছিল সে।

জেরিন সাধারণত সিএনজিযোগে ধল গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলের কোচিং ও ক্লাসে যায়। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় জাকির হোসেন।

এর আগে জাকির হোসেন তার বন্ধু পাটলী গ্রামের সিএনজিচালক নুর আলমকে ম্যানেজ করে। একই সাথে পাটলী গ্রামের তার আরেক বন্ধু হৃদয়কে তার মনোভাবের কথা জানায়। তিনজন মিলে জেরিনকে অপহরণের ষড়যন্ত্র করে।

ষড়যন্ত্রের অংশ তারা একমত হয় যে, ধল গ্রামের রাস্তার সামনে নুর আলম সিএনজি নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করবে। সিএনজি গাড়িতে যাত্রী হিসাবে বসা থাকবে হৃদয়। জেরিন কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠবে। এর এক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করবে জাকির। পরে সেখান থেকে জাকির সিএনজিতে উঠবে। স্কুলের সামনে না নামিয়ে জেরিনকে তারা অপহরণ করে নিয়ে যাবে।

কথা মোতাবেক গত ১৮ জানুয়ারি সকাল ৭টায় জেরিন কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য সিএনজির জন্য অপেক্ষা করে। নুর আলম তাকে সিএনজিতে তুলে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ব থেকেই হৃদয় সিএনজিতে বসা ছিল। এক কিলোমিটার দূরের একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে জাকির সিএনজি দাঁড় করানোর জন্য হাত দিয়ে ইশারা করে। সিএনজি থামালে সে গাড়িতে উঠে।

রিচি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম গেইটে সিএনজি দাঁড় করানোর জন্য বললেও নুর আলম দাঁড় করায়নি। দ্বিতীয় গেইটে দাঁড় করানোর জন্য বললে নুর আলম দ্রুতগতিতে সিএনজি চালিয়ে হবিগঞ্জের দিকে আসতে থাকে। ইতিমধ্যে জাকির হোসেন ও হৃদয় জেরিনকে সিএনজি থেকে নামতে না দিয়ে চেপে ধরে রাখে।

জেরিন বুঝতে পারে তাকে অপহরণ করা হতে পারে। কৌশলে সে চলন্ত সিএনজি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সিএনজিটি হবিগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়।

আহত অবস্থায় জেরিনকে প্রথমে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল ও পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে জেরিন মারা যায়।

সিএনজি দুর্ঘটনায় জেরিনের মৃত্যু হয়েছে জানাজানি হয়। কোনো ধরনের ময়না তদন্ত ছাড়াই জেরিনের লাশ দাফন করে তার পরিবার। তদন্তে জেরিনকে অপহরণ ও হত্যার বিষয়টি বের হয়ে আসে।

গ্রেফতারকৃত জাকির হোসেন ২১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান উদ্দিন প্রধানের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

অপর আসামি নুর আলম ও হৃদয় এখনো পলাতক। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজি গাড়িটি উদ্ধার করেছে পুলিশ।

মদিনাতুল কুবরা জেরিন মেধাবী ছাত্রী ছিল। ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তিও পেয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে পড়া জেরিনকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন ছিল বাবা আব্দুল হাইয়ের।

জেরিনের মৃত্যুর পর থেকেই জাকির হোসেনের আচরণ ছিল রহস্যজনক। সিএনজি রেখে নুর আলমও বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

জেরিনের বাবা আব্দুল হাই হবিগঞ্জ সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

জেরিনের লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

এমন একটি অপহরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার পিছনেও হত্যাকারীদের হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুরো ঘটনাটি দুইটি টিমে বিভক্ত হয়ে তদন্ত করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর থানার ওসি মাসুক আলী, ওসি অপারেশন দৌস মোহাম্মদসহ পুলিশ কর্মকর্তারা।