০২ ডিসেম্বর ২০২০

দুর্নীতিতে ডুবছে পানগাঁও বন্দর

দুর্নীতিতে ডুবছে পানগাঁও বন্দর - সংগৃহীত

অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও লাভজনক হচ্ছে না কেরানীগঞ্জের পানগাঁও বন্দর। ঢাকায় সহজে নৌপথে পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে এ টার্মিনালটি নির্মাণ করা হলেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে লাভজনক হচ্ছে না বন্দরটি। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের চেয়ে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শুল্ক আদায় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা কম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দেয়া শুল্ক আদায়ের টার্গেট বাস্তবায়ন হয়েছে -৩৪ শতাংশ। ফলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকায় নির্মিত বন্দরটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

শুল্ক আদায় কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানান, এ টার্মিনালে আমদানিকৃত পণ্যের নাম, বিবরণ, গুণগত মান, মূল্য, এইচ এস কোড ইত্যাদিতে মিথ্যা ঘোষণা দেয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। তারা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে বাড়তি আর্থিক সুবিধা আদায় করে বেশি শুল্কপণ্যকে কম শুল্কপণ্য দেখিয়ে শুল্কায়ন করছেন। এ সময় যেসব ব্যবসায়ীর সাথে শুল্ক কর্মকর্তাদের বোঝাপড়া হচ্ছে না তাদের পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ করছেন। ফলে তাদের পোর্টের ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এবং ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

পানগাঁও আইসিডির এসব অনিয়ম ও কনটেইনার আটকের অভিযোগ পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে পোর্টে প্রায় ৩০০ কনটেইনার শুল্কায়নের জন্য আটকে আছে এমন অভিযোগের তদন্তের জন্য সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশনা দেয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে দুদকের কাছে প্রেরণের অনুরোধ করা হয়। কিছু কাস্টমস কর্মকর্তার হয়রানির কারণে বছরে পর বছর অত্যাধুনিক এ টার্মিনালে পণ্য খালাস ও কনটেইনার আমদানির পরিমাণ কমেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক অর্থবছরের ব্যবধানে কনটেইনার আমদানি কমেছে ২৯৯টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পানগাঁও পোর্টে কনটেইনার এসেছে ১ হাজার ২২৩টি। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসেছে ৯২৪ কনটেইনার পণ্য। এ কারণে রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। এ দিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এনবিআরের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ৯৮০ কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে ৮৬০ কোটি টাকা। আর সদ্য বিদায়ী অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১০২ কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৬০ কোটি টাকা। কাস্টমস কর্মকর্তাদের হয়রানির কারণে রাজস্ব আদায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পানগাঁও টার্মিনাল সূত্র জানায়, গত বছর ব্যাটারি আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রেখে পানগাঁও কাস্টমসের উপকমিশনার সোনিয়া আক্তার ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন। ফাইল আটকে থাকলে মালপত্র বন্দরে পড়ে থাকবে, তাতে তার আর্থিক ক্ষতি হবেÑ এ চিন্তা করে ওই কর্মকর্তাকে দুই লাখ এবং পরে আরো আট লাখ টাকা দেনওই ব্যবসায়ী। এর পরও তিনি ফাইল না ছাড়ায় ওই ব্যবসায়ী কাস্টমস কমিশনারের কাছে যান। কাগজপত্র যাচাই করে তার চালান ছেড়ে দেন কমিশনার। 

এরপর সোনিয়া আক্তারের কাছে গিয়ে ঘুষের টাকা ফেরত চান ওই ব্যবসায়ী। উত্তপ্ত আলোচনার পর টাকা ফেরত দিতে সম্মত হন ওই কর্মকর্তা। পরে তিনি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেন। এ ঘটনার ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ওই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে কর্মস্থল থেকে বদলি করলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন সোনিয়া আক্তার। ভিডিওসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের হলেও ওই কর্মকর্তাকে গত সপ্তাহে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর পানগাঁও আইসিডি বন্দর সচলে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে পদক্ষেপ নেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। সমাধানের উপায় হিসেবে বন্দরের গতি ফেরাতে একচ্ছত্রভাবে তুলা আমদানি সহায়ক হতে পারে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া বন্দরের কার্যক্রমকে নীরবচ্ছিন্ন রাখতে তাৎক্ষণিক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একটি অপারেটরসহ স্ক্যানার এ বন্দরে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রীর এমন পদক্ষেপের পরেও পূর্ণভাবে সচল হচ্ছে না এ বন্দরটি। 

এ বিষয়ে জানতে পানগাঁও কাস্টমস হাউজের কমিশনার ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর দফতরে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


আরো সংবাদ