১৮ অক্টোবর ২০২১
`

সঙ্কটের মধ্যে উদ্বৃত্ত

করোনার প্রভাবে কমে গেছে চাহিদা; দরপতন ঠেকাতে বাজার; থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক; চার দিনে ২ হাজার ২০০; কোটি টাকার ডলার ক্রয়
-

সাধারণত কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়লে আর ওই অনুযায়ী সরবরাহ না থাকলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আর বিপরীত অবস্থা হয় চাহিদা কম থাকলে। আমরা ডলারকে যদি পণ্য ধরি তা হলে ওই একই অবস্থা হওয়ার কথা। কিন্তু চাহিদা ও জোগানের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা অনেকটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকার সাথে সম্পর্কিত। যদিও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের হস্তক্ষেপ কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে তার সবটুকু তাদের হাতে ধরে রাখতে পারে না। ডলার ধরে রাখার জন্য নির্ধারিত সীমা বা কোটা দেয়া থাকে, যা ব্যাংকিং ভাষায় এনওপি (নেট ওপেন পজিশন) বলা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী আগে একটি ব্যাংক যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করত দিন শেষে ওই ব্যাংকের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারত না। কোটার অতিরিক্ত ডলার হাতে থাকলে হয় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বিক্রি করতে হবে, অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। দিন শেষে কোটার অতিরিক্ত ডলার হাতে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরিমানা গুনতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলোর মধ্যে একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া আর কোনো সূচকেই স্বস্তিদায়ক নেই। দীর্ঘ দিন ধরে রফতানি আয়ে নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগেও তেমন সাড়া নেই। খুব বেশি হারে বৈদেশিক অনুদানও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ডলারের সরবরাহ দিকটি ছিল অনেকটা নি¤œমুখী। বিপরীতে আমদানি ব্যয় কমেনি। বরং বেরে চলছিল। যদিও প্রকৃত আমদানি নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন রয়েছে। আমদানির আড়ালে মুদ্রাপাচারÑ এ ধরনের অভিযোগ অনেকটা এখন গা সহা হয়ে গেছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অনেকটা টান ছিল। বলা যায়, বছরখানেক আগেও প্রতি ডলার পেতে আমাদের ব্যয় করতে হতো ৭৭ টাকা। এখন সেটা ৮৫ টাকা থেকে ৮৭ টাকা কোনো কোনো দিন ৮৮ টাকায়ও কিনতে হয় আমদানিকারকদের। এ ধরনের সঙ্কটের মাঝে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে অতিপ্রয়োজনীয় বিশেষ করে জ্বালানি তেল আমদানিতে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করোনাভাইরাসের প্রভাবে সৃষ্ট ঘটনায় অনেকটা এলোমেলো হয়ে পড়ে আমদানি রফতানি বাজার।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি গত কয়েক মাস ধরে রফতানি আয়েও মন্দা চলছে। তবে রফতানি আয় কমার চেয়ে আমদানি ব্যয় কমার হার বেশি। এ ছাড়া রফতানি কমার কারণেও আমদানি কমছে। অন্য দিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে চাঙ্গাভাব রয়েছে। এতে মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ অনেকটাই বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে আমদানি ব্যয় কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। এর মধ্যে একক মাস হিসেবে জানুয়ারিতেই কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আমদানি ব্যয় আরো কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
অন্য দিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এক হাজার ২২৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে, যা ২০.২০ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছর থেকে রেমিট্যান্সের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়ার ফলে রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরে করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমদানি কমে গেছে। সে কারণেই বাজারে বেড়েছে ডলারের সরবরাহ।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে চীনসহ বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। এতে আমদানি কমছে দ্রুত গতিতে। এ কারণে প্রতিটি ব্যাংকই রফতানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, তা কাজে লাগাতে পারছে না। এমতাবস্থায় অনেক ব্যাংকের হাতেই ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ডলার থেকে যাচ্ছে। বাজারে ডলার বিক্রি করলে ব্যাংকগুলো যে দর দিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে তার মূল্য উঠবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংকগুলো। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক না কিনলে ডলারের দাম সাময়িক সময়ের জন্য পড়ে যাবে। এ কারণে দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো বাজার থেকে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা উদ্বৃত্ত ডলার কিনে নিচ্ছে। গত সপ্তাহে চার কার্যদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ২৫ কোটি ডলার কিনে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ না করলে ডলারের দাম পড়ে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি বাজার থেকে ডলার কিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পর প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ১২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০১৮ সালে ২৩৭ কোটি ডলার এবং ২০১৯ সালে ১৬২ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডলার বিক্রি করা হয়েছে আট কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে মার্চ থেকে ডলার বিক্রির বদলে উল্টো কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে গত ৯ মার্চ থেকে ১২ মার্চ চার দিনে কেনা হয়েছে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকারদের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টাকাকে তার আপন গতিতেই চলার সুযোগ দেয়া উচিত। তারা জানিয়েছেন, একে তো বিনিয়োগ নেই, এর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ডলারের মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় কমছে না। আমদানি ব্যয় না কমায় আমদানিকৃত কাঁচামালের দামও কমছে না। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। যদিও ডলারের মূল্য কমে গেলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন রফতানিকারকরা। তবে ব্যাংকারদের মতে, বাজারে যখন ডলার উদ্বৃত্ত থাকে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে কিনে নেয়। কিন্তু বাজারে যখন সঙ্কট থাকে, তখন চাহিদা অনুযায়ী ডলার ছেড়ে দেয় না। এ কারণে সঙ্কট চোখে পড়ার মতো অবস্থা দেখা দেয়। বর্তমানে মুদ্রাবাজারে টাকা-ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এই হার স্থির রয়েছে। আগের মাস জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইছে আগামী কয়েক মাস টাকা ও ডলারের এই হার অপরিবর্তিত রাখতে। রফতানিকারক ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে আশঙ্কার কথা হলো, মূল্যস্ফীতি কিন্তু ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে টাকা ছাড়া হচ্ছে, এটাকে অর্থনীতির ভাষায় হটমানি বলা হয়। এক টাকা সাড়ে ৭ গুণ প্রভাব পড়ে মুদ্রাবাজারে। টাকার প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যেতে পারে।



আরো সংবাদ


মেয়ের চিকিৎসায় ১০ দিন ধরে ঢাকার হাসপাতালে থেকেও মন্দির ভাঙার আসামি (১২৯০৫)‘বাতিল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প’ (১২২০৬)প্রধানমন্ত্রী মোদি কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন (৯৫৬৯)কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ভারতের তালেবানভীতি থেকে? কেন সেই ভীতি? (৯৪১৪)কাশ্মিরে এক অভিযানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সেনা নিহত (৮০৩৮)৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতেই হবে : তথ্য প্রতিমন্ত্রী (৬৬০০)সঙ্কটের পথে রাজনীতি (৫৯৭৭)গ্রাহকদের উদ্দেশে কারাগার থেকে যা বললেন ইভ্যালির রাসেল (৪৮৯৫)পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণ (৪৮৬২)কিছু ‘বিভ্রান্তিকর খবরের’ পর বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ভারত (৪৮২৯)