২৪ নভেম্বর ২০২০

তালিকাভুক্তিতে প্রতিবন্ধকতায় ভালো কোম্পানি

-

সরকারি হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঘোড়া ছুটছে ঊর্ধ্বগতিতে। কিন্তু তার বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে দেশের পুঁজিাবাজার। গত এক দশকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এ বাজার। বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা খুবই কম। এই বাজারের গভীরতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজন ভালো কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি। করপোরেট কর হারে বড় ছাড় না দিলে আগ্রহী হবে না কোম্পানিগুলো।
জানা গেছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২৯টি। কিন্তু এরমধ্যে বহুজাতিক কোম্পানির সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। যদিও এসব কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা বাজারে বেশি নয়। প্রায় পুরো শেয়ারই উদ্যোক্তাদের হাতে। এর বাইরে দেশীয় মিলে ভালো কোম্পানির সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ টির মতো। অথচ দেশে বহুজাতিকের পাশাপাশি দেশীয় ভালো কোম্পানির সংখ্যা লাখের ওপরে। যারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহ রয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকা বহির্ভূত কোম্পানির মধ্যে করপোরেট কর হারের পার্থক্য হচ্ছে ১০ শতাংশ। তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২৫ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত না হলে ৩৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এছাড়া অতালিকাভুক্ত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাড়ে ৪২ শতাংশ, মোবাইল ফোন ও সিগারেট কোম্পানির জন্য ৪৫ শতাংশ। তালিকাভুক্তির জন্য এই কর হার হচ্ছে ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাড়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন ৪০ শতাংশ। এর বাইরে সমবায় ও তৈরি পোশাক খাত পৃথক কর সুবিধা ভোগ করে থাকে।
কর হার কমিয়ে আনার বিষয়ে বৈশ্বিক একটি গবেষণা রয়েছে, সেখানে বলা হয়; মধ্যম আয়ের দেশগুলো গত তিন দশকে যে হারে করপোরেট কর কমিয়েছে, বাংলাদেশ সেই তুলনায় তা কমাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘করপোরেট ট্যাক্স রেট: হাউ লো উই ক্যান গো’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে উলেখ করা হয়েছে, গত তিন দশকে মধ্যম আয়ের দেশগুলো গড় করপোরেট কর হার ৪০ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অন্যদিকে মধ্যম আয়ের দেশ হয়েও বাংলাদেশ গত দেড় দশকে করপোরেট কর কমিয়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী এই ধারণা এখন প্রমাণিত যে, করপোরেট কর কমালে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হয়। বাংলাদেশে করপোরেট করহার তুলনামূলক বেশি। করপোরেট করহার বেশি হলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন। এ দেশে উদ্যোক্তাদের আয়ের বড় অংশ কর হিসেবে দিতে হয়।
সাধারণত ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে করপোরেট কর কমানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে গত দেড় দশকে মাত্র একবার করপোরেট করে বড় পরিবর্তন আনা হয়। আইএমএফের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী করপোরেট করের পরিমাণ উদীয়মান অর্থনীতির ও উন্নত দেশগুলোর মোট করের ১৫ শতাংশ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোর করের ১৭ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করার আগে দুটি বিষয় দেখেন। প্রথমত, করপোরেট করহার কত, এই কর দিয়ে কতটা মুনাফা করতে পারবেন। সুতরাং করপোরেট কর কমালে এ দেশে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়বে। ক্রমান্বয়ে করপোরেট কর কমানোর একটা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত।
বর্তমানে তালিকার বাইরে থাকা কোম্পানিগুলো স্বল্প ব্যবধানের এই কর ছাড়ে আগ্রহী নয়। তাদের মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে নতুন নতুন নিয়ম ও বিধি নিষেধ মেনে চলতে হয়। এছাড়া জবাবদিহি বাড়তে থাকে। এজন্য আরো জনবল নিয়োগের প্রয়োজন হয়। স্বল্প সুবিধার জন্য এই চাপ নিতে আগ্রহী নন কোম্পানির উদ্যোক্তারা। তাদের আগ্রহী করতে সাময়ীক সময়ের জন্য হলেও করপোরেট কর হার বেশি হারে কমানো হয়। এই অতিরিক্ত সুবিধা নিতে তারা বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।
কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি হলে বর্তমান পুঁজিবাজারেই নতুন বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হয়ে উঠবে। এতে নতুন তারল্যের প্রবেশ ঘটবে বাজারে। সময়ের সঙ্গে এর গভীরতাও বাড়তে থাকবে। অধিক সংখ্যক ভালো কোম্পানির জন্য বাজারে কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্যও কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একইসঙ্গে পুঁজিবাজারে সুশাসন চিত্রের উন্নতি ঘটাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন নজরদারি বাড়ানো ও তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা। কারণ হিসেবে সবাই বলে আসছেন, পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যা মূলত দুটি। একটি হচ্ছে আস্থার অভাব ও অন্যটি তারল্য তথা অর্থ সঙ্কট। পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এই আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর থেকেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। যা বিনিয়োগকারীরা বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছে। দুর্বল আইপিও অনুমোদন, কারসাজি চক্রকে শাস্তির আওতায় না আনা, আবার কখনো কখনো শাস্তির নামে অল্প টাকা জরিমানা করে কারসাজি চক্রকে পুরস্কৃত করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
তার আগেই বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দিতে হবে ভালো মানের অসংখ্য শেয়ার। যাতে কেউ কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্যে না পড়ে। দীর্ঘ মেয়াদে যেন বিনিয়োগকারীরা এই বাজারে থাকতে পারে। এজন্য করপোরেট কার ছাড়ের কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন সবাই।
বড় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগী হতে পারে মাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অপরদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়ও কম নেই বলে মনে করেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী, মার্চেন্ট ব্যাংকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই উদ্যোগী হয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে এ দাবি তুলতে হবে। সরকার চাইলেই এ উদ্যোগটি নিয়ে প্রাণ ফেরাতে পারে দেশের পুঁজিবাজারের।


আরো সংবাদ