২৪ নভেম্বর ২০২০

কোথায় বিনিয়োগ করবেন

-

যেকোনো বিনিয়োগই ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে, দেখে শুনে বিনিয়োগ করলে শতভাগ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব না হলেও পুঁজি হারানোর সম্ভাবনা থাকে না। এ কারণেই আপনার কণ্ঠার্জিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করছেন, কিভাবে বিনিয়োগ করছেন, যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন সেটির অতীত ইতিহাস কী, অর্থাৎ অতীতে কোনো লভ্যাংশ দেয়া হয়েছে কিনা, সেটা দিলে কতটুকু দেয়া হয়েছেÑ এসব কিছু জানা অতি প্রয়োজন। শেয়ারবাজার বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় জায়গা। সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে এখান থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বিনিয়োগে ভুল হলে থাকে পুঁজি হারানোর আশঙ্কা। যদিও শেয়ারে বিনিয়োগের ঝুঁকি কোনোভাবেই শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে জেনেবুঝে সঠিক কৌশলে বিনিয়োগ করতে পারলে ঝুঁঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে ভালো সাফল্য পেতে হলে শেয়ার কেনার আগে কিছু তথ্য জেনে নেয়া ভালো। এসব তথ্য বিশেষণ করে যদি শেয়ারটি বিনিয়োগ অনুকূল মনে হয় তবেই সে শেয়ার কেনা উচিত; হুজুগ বা গুজবের ভিত্তিতে নয়।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগে যেসব জিনিস জানা অতি প্রয়োজনীয় তা পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো। শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য : শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য দেখুন। এর সাথে বাজারমূল্যের একটা সামঞ্জস্য থাকা উচিত। যদিও কোম্পানির অবসায়ন (বিলুপ্তি) না হলে সম্পদমূল্যে বিনিয়োগকারীর কার্যত কিছু যায় আসে না। কোম্পানির অবসায়ন হলেই কেবল শেয়ারহোল্ডাররা ওই সম্পদের কিছুটা ভাগ পেতে পারেন। এ েেত্রও সম্পদ বিক্রির মূল্য থেকে আগে ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হয়। এরপর কিছু অবশিষ্ট থাকলে তা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। এনএভিপিস ভালো থাকলে ওই শেয়ারে বিনিয়োগ করতে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাই ভবিষ্যতে আপনার শেয়ার বিক্রি করতে সুবিধা হবে যদি ভালো এনএভিপিএস সম্পন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ করেন।
শেয়ারের সংখ্যা : মোট শেয়ারের সংখ্যা দেখুন। আর দেখুন তার কতটুকু ফোটিং। চাহিদা-যোগানের সূত্র অনুসারে শেয়ার সংখ্যা কম হলে তার মূল্য বাড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে শেয়ার সংখ্যা বেশি হলে বাজারে তা অনেক বেশি সহজলভ্য হয়। এছাড়া নিয়মিত ভালো অঙ্কের লেনদেন হয় এমন শেয়ার কেনা ভালো। কারণ কোনো কারণে জরুরি ভিত্তিতে টাকার প্রয়োজন হলে সহজেই শেয়ার বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু নিয়মিত লেনদেন হয় না এমন শেয়ারে বিনিয়োগ করা হলে জরুরিভিত্তিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহার সম্ভব নয়।
অনুমোদিত মূলধন : অনুমোদিত মূলধন আর পরিশোধিত মূলধন (ঢ়ধরফ-ঁঢ় পধঢ়রঃধষ) এর রেশিও দেখুন। এই দুই মূলধনের পরিমাণ কাছাকাছি থাকলে বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যু করা বেশ কঠিন। এ েেত্র কোম্পানিকে আগে অনুমোদিত মূলধন বাড়াতে হবে। বোনাস লভ্যাংশে যেসব বিনিয়োগকারীর বিশেষ ঝোঁক রয়েছে তাদের উচিত এসব বিষয় দেখে নেয়া।
ডিভিডেন্ড ইল্ড : শেয়ারের বাজারমূল্য বেশির ভাগ েেত্র অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাই লভ্যাংশের হার প্রকৃত রিটার্ন নির্দেশ করে না। ডিভিডেন্ড ইল্ডই শেয়ারের সঠিক রিটার্ন। বাজারমূল্যের ভিত্তিতে প্রাপ্য লভ্যাংশ বিনিয়োগের কত শতাংশ তা-ই হচ্ছে ডিভিডেন্ড ইল্ড। ঘোষিত লভ্যাংশকে ১০০ দিয়ে গুণ করে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বাজারমূল্য দিয়ে ভাগ করলে ডিভিডেন্ড ইল্ড পাওয়া যায়। এ ইল্ড যত বেশি হবে বিনিয়োগকারীর প্রাপ্তিও তত বাড়বে।
শেয়ারটির পিই রেশিও : কোনো শেয়ার কেনার আগে মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও (চৎরপব ঊধৎহরহম জধঃরড়-চঊ জধঃরড়) কত তা দেখে নেয়া ভালো। পিই রেশিও যত কম, বিনিয়োগ তত কম-ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণভাবে ২০ এর কম পিইসম্পন্ন শেয়ারকে বিনিয়োগের জন্য বেশি অনুকূল মনে করা হয়। মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও হচ্ছে একটি কোম্পানির শেয়ার তার আয়ের কতগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে তার একটি পরিমাপ। কোনো কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় যদি হয় পাঁচ টাকা, আর বাজারে শেয়ারটির দাম থাকে ৪৫ টাকা,তাহলে মূল্য-আয় অনুপাত হবে ৯। এর অর্থ কোম্পানিটি যদি তার আয়ের পুরোটা লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করে দেয় তাহলে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পেতে ৯ বছর সময় লাগবে। কিন্তু শেয়ারটির বাজারমূল্য যদি হতো ১০০ টাকা, তাহলে মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও দাঁড়াতো ২০। অর্থাৎ কোম্পানির আয়ের ধারা অপরিবর্তিত থাকলে বিনিয়োগ ফেরতে ২০ বছর সময় প্রয়োজন। তবে পিই অনেকটা আপেকি। উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন কোম্পানির েেত্র শেয়ারের পিই রেশিও একটু বেশি হলেও সেই শেয়ারে বিনিয়োগে তেমন ঝুঁকি থাকে না। অন্য দিকে কোম্পানির মুনাফা ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি যদি হয় নি¤œমুখী তাহলে পিই রেশিও কম হলেও তাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ।
শেয়ারপ্রতি আয় : শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস (ঊধৎহরহম চবৎ ঝযধৎব-ঊচঝ) হচ্ছে শেয়ারের ভালো-মন্দ বুঝার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। একটি কোম্পানির নিট মুনাফাকে ওই কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস। এটা যত বেশি হয়, ততই ভালো। কারণ ইপিএস বেশি হলে বেশি লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ থাকে। ইপিএস কম হলে লভ্যাংশের সমতাও কম হয়। প্রতিটি কোম্পানি হিসাব বছর শেষ হওয়ার পর ১২০ দিনের মধ্যে ওই বছরের নিরীতি আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইপিএস প্রকাশ করে থাকে, যা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়। এছাড়া প্রতি প্রান্তিক শেষেও কোম্পানিগুলো ইপিএস প্রকাশ করে থাকে, যদিও তা অনিরীতি আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা হয়। এই প্রান্তিক প্রতিবেদনের ইপিএস পর্যালোচনা করে বছর শেষে কোম্পানির ইপিএস কত হতে পারে সে সম্পর্কে একটি ধারণা করা সম্ভব। তবে কোনো কোনো কোম্পানি আছে, যেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়Ñ সেগুলোর েেত্র একটু সতর্ক থাকা ভালো।
ট্র্যাক রেকর্ড : গত ৩-৪ বছরের ট্র্যাক রেকর্ড দেখুন। কী পরিমাণ ডিভিডেন্ড দেয় তা দেখুন। বার্ষিক গড় মূল্য দেখুন। চেষ্টা করুন এই মূল্যের কাছাকাছি দামে শেয়ার কেনার।
কোম্পানি ও সেক্টরের খবর : ডিএসইর সাইটে প্রকাশিত গত ৫-৬ মাসের খবর দেখুন। পত্র-পত্রিকায় দেশ-বিদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার সংবাদগুলো দেখুন। তাহলে সম্ভাবনাময় খাত ও কোম্পানি চিহ্নিত করা অনেক সহজ হবে।
কোম্পানি ও পরিচালকদের গুডউইল : আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনবেন সে কোম্পানির গুড উইল ও তার পরিচালকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকটাও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি কোম্পানি কতটুকু ভালো ব্যবসা করবে, ব্যবসার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কতটুকু তা নির্ভর করে এর উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতা, দতা ও আন্তরিকতার ওপর। একইভাবে মুনাফার সবটুকু হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি-না, লভ্যাংশের ত্রে অতিমাত্রায় রণশীল হবে, না-কি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হবে তাও নির্ভর করে তাদের ওপর।
উল্লিখিত নির্দেশনার আলোকে বিনিয়োগ করতে পারলে আশা করা যায় অন্তত অধিক লাভবান না হলেও কষ্টার্জিত পুঁজি হারানোর ভয় থাকবে না বিনিয়োগকারীদের।


আরো সংবাদ