২৭ মে ২০২০

তিস্তা-কুড়িগ্রাম রেলপথ এখন বিলুপ্তির পথে

৭টিতে বুকিং সহকারীরাই একটি স্টেশনেই মাস্টার,অন্য সব কাজের ‘বাবু’
-

মাটিচাপা পড়া পাথরবিহীন লাইন, ভাঙা কাঠের স্লিপার, দুর্বল সিগন্যালিং আর কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাবে তিস্তা-কুড়িগ্রাম-রমনা রেলপথ এখন বিলুপ্তির পথে। ইতোমধ্যেই এই রুটে বন্ধ হয়ে গেছে রমনা মেইলসহ তিনটি ট্রেন। চালু আছে শুধু রমনা লোকাল ও একটি শাটল ট্রেন। ৮টি স্টেশনের মধ্যে কেবল একটিতে একজন স্টেশন মাস্টার ‘সবেধন নীলমণি’ হয়ে সেবা দিচ্ছেন। বাকি ৭টিতে বুকিং সহকারীরাই একাধারে স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টার, সিগন্যাল আপ-ডাউনার, ঝাড়–দারের কাজ করে রেলপথটিকে কোনোমতে জীবিত রেখেছেন। অবিলম্বে এ রেল রুটটি সংস্কার করে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং বন্ধ করে দেয়া তিনটি ট্রেনসহ ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস নামের একটি আন্তঃনগর চালুর মাধ্যমে মানুষের নির্বিঘœ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত গণকমিটি ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। যদিও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ তাদের নেই।
জানা গেছে, তিস্তা-রমনা রেলপথে বর্তমানে সর্বোচ্চ গতি ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। এই রুটে রমনা লোকাল ট্রেন চালু থাকলেও সেটির শিডিউল নেই। সকাল ১০টার ট্রেন আসে কখনো দুপুর ১২টায়, কখনো বিকেলে। কখনো রাতে। শুধু রংপুর এক্সপ্রেসের শাটল ট্রেনটি সময়মতো আসে। এ রুটের ট্রেন লাইনের ৭০ ভাগ স্থানেই পাথর নেই। কাঠের স্লিপারগুলোও ভেঙে গেছে। রেললাইন মিশে গেছে মাটির সাথে। ফলে চালু থাকা ট্রেন দু’টিও চলছে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে। লোকাল ট্রেনটির কামরাগুলো অপরিষ্কার। বেশির ভাগ স্টেশনেই বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইন।
সরেজমিন দেখা গেছে, এই রুটের ৮টি স্টেশনের মধ্যে শুধু কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ নতুন স্টেশনে মাস্টার আছেন। এ স্টেশনে একজন বুকিং সহকারী আছেন। তাও এখান থেকে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট দেয়ার কারণেই স্টেশন মাস্টার আছেন বলে জানিয়েছে রেলওয়ে সূত্র। বাকি ৭টি স্টেশনে আছে শুধু বুকিং সহকারী। সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় এসব স্টেশনে ট্রেনের হুইসেল শুনে সিগন্যাল ডাউন ও আপ করা হয়। মালামাল ওজন করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনুমান করে ভাড়া নির্ধারিত হয়। পাকা সড়কের সাথে রেলপথের ক্রসিংগুলোতে কোনো গেটম্যান না থাকায় এ রুটে চলাচলকারী ট্রেনটি অহরহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। গত ২৫ বছরে এখানে ছোট-বড় চার হাজার দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্গতির কারণেই এখন এই রুটে ট্রেন যাত্রী আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ সাশ্রয়ী হওয়ায় ট্রেন পথেই যাতায়াত করতে বেশি আগ্রহী।
১৯৬৭ সালে তিস্তা-চিলমারী রেলপথে রেল চলাচল শুরু হয়। পরে বহ্মপুত্র নদের ব্যাপক ভাঙনে চিলমারী রেলস্টেশন নদে বিলীন হয়। এরপর তিস্তা-রমনা রেলপথে মোট চারটি ট্রেন চলাচল শুরু করে। এর মধ্যে রমনা পার্বতীপুর রেলপথে রমনা মেইল নামে একটি মেইল ট্রেনও চলত। ভোর, দুপুর, বিকেল ও রাতে ট্রেনের হুইসেলের সাথে সখ্য গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের মানুষের। তখন এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই ছিল এই রেলপথ। তিস্তা-রমনা রেলরুটে স্টেশনে সংখ্যা মোট আটটি। এর মধ্যে তিস্তা, কুড়িগ্রাম, রমনা বাজার রেলওয়ে স্টেশন তিনটি ‘বি’ শ্রেণীর এবং সিঙ্গার ডাবরীহাট, বালাবাড়ী, টগরাইহাট ও পাঁচপীর স্টেশন ৫টি ‘সি’ শ্রেণীর। এরই মধ্যে পুরনো কুড়িগ্রাম স্টেশনটি ব্যয়বহুল হওয়ার অজুহাতে কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি রেজাউল করিম রেজা নয়া দিগন্তকে জানান, এ অঞ্চলের মানুষের দাবি রমনা-তিস্তা রুটে ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস নামের একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হোক। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনও এ নামের একটি ট্রেন চালু করার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। আমি আশা করি তিনি মন্ত্রিসভায় থাকার সুবাধে এটি করতে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাহিদ হাসান নলেজ জানান, দীর্ঘ দিন থেকে আমরা আন্দোলন করে এসেছি। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর কুড়িগ্রামে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ট্রেন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর ভেবেছিলাম আমরা বন্ধ হওয়া ৩টি ট্রেন আবার ফিরে পাবো। কিন্তু সেটি হয়নি, তার প্রতিশ্রুতির পর রংপুর এক্সপ্রেসের সাথে একটিমাত্র শাটল ট্রেন পেয়েছি। বাকি ট্রেনগুলো চালুর কোনো উদ্যোগ নেই। ঢাকা, কুড়িগ্রাম, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সভা, সেমিনার সিম্পোজিয়াম, মানববন্ধন, সমাবেশ, বিক্ষোভ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সর্বশেষ নতুন মন্ত্রিপরিষদ হওয়ার পরের সপ্তাহেই নতুন রেলমন্ত্রীর সাথে আমরা সাক্ষাৎ করেছি এই রুটে বন্ধ হওয়া ট্রেনগুলো চালুর জন্য। আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি। দেখি কী হয়।
রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত দাবির মুখে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই রেল রুটের তিস্তা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত রেলওয়ে লাইন মেরামত করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জে একটি নতুন স্টেশন এবং প্রায় ৫টি গেট নির্মাণ করা হয়েছে। রেলওয়ের লাইনে স্লিপার, মাটি ও পাথর দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বছর না ঘুরতে আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে এ অংশটি।
নাহিদ হাসান নলেজ জানান, গত অর্থবছরে এই রুটের তিস্তা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত কিছু কাজ করা হয়েছে। তাতেও করা হয়েছে পুকুরচুরি। এ রেলরুটটির অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম থেকে রমনা পর্যন্ত অবস্থা এতই নাজুক যে, রেলওয়ের গতি গরুর গাড়ির চেয়েও কম।
এসব বিষয়ে লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশনের ম্যানেজার মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি। এ রুটে বন্ধ হওয়া অথবা ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস নামের কোনো আন্তঃনগর ট্রেন চালু কিংবা রেলরুট সংস্কারের ব্যাপারে বর্তমানে কোনো উদ্যোগ নেই।

 


আরো সংবাদ