০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

গ্রেফতার এড়াতে ভারত থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা


ধরপাকড় থেকে বাঁচতে ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ৮০০-এর বেশি এমন রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কয়েকজন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশের ধরপাকড় শুরু হয়েছে। এসব অভিযানে দেশটিতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ধরে নিয়ে জেল দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে রোহিঙ্গারা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সে কারণে তারা বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। তাদের মতো অনেকে দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভারত থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের চলে আসায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

মঙ্গলবার তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যবশত অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসছেন। ওই রোহিঙ্গারা ২০১২ সালে ভারতে গিয়েছিল এবং সে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছিল। এখন তারা শুনেছে যে বাংলাদেশে এলে তারা খুব ভালো খাওয়া-দাওয়া পাবে। তাই রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। আমরা ভারতকে বলবো যে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি ভারত থেকে আসা বেশ কিছু রোহিঙ্গা জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কার্যালয়ে যৌথ নিবন্ধন সাক্ষাৎকার গ্রহণের অনুমতি চেয়ে ক্যাম্প ইনচার্জকে লিখিত আবেদন করেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।

সেরোজমিনে দেখা যায়, উখিয়ায় কুতুপালংয়ে ইউএনএইচসিআর পরিচালিত ট্রানজিট পয়েন্টের সামনে ভারত থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের একটি দল কক্সবাজারে আশ্রয় পাওয়ার আশায় জড়ো হয়েছেন।

এ সময় ইউএনএইচসিআর থেকে পাওয়া কার্ড দেখিয়ে ভারত থেকে পালিয়ে আসা নুর আলম বলেন, ভারতের জাম্বু থেকে কলকাতায় পৌঁছাই। সেখান থেকে বাংলাদেশের সিলেট হয়ে কক্সবাজারের এসেছি। জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে দালালদের দিয়ে পাঁচ দিনে এখানে পৌঁছেছি।

তিনি বলেন, ভারতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গাদের ধরে নিয়ে জেলে দিচ্ছে। সেখানে ভালো করে থাকতে দিচ্ছে না। আমাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। সেই কারণে এখানে পালিয়ে এসেছি। গত তিন দিন ধরে ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরছি। কিন্তু কোথাও আশ্রয় পাচ্ছি না।

আলম বলেন, ক্যাম্প থেকে এই ট্রানজিট পয়েন্ট পাঠিয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের ঢোকাচ্ছে না। আমি ভারতে দিন মজুরি করে জীবনযাপন করছিলাম। তার সাথে আরো ৩০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে বলে জানান তিনি। এর আগে ২০১২ সালের আগস্টে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পরে পরিবার নিয়ে দালালের মাধ্যমে ভারতে পাড়ি জমান নুর আলম।

পরিবারের চারজন সদস্য ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভারত থেকে কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে পৌঁছেছেন ছেনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, দালালের খপ্পরে পরে আমাদের দ্বিগুণ টাকা খরচ হয়েছে। মূলত সেদেশে গ্রেফতারের ভয়ে এখানে পালিয়ে আসি। আসার পথে দালালরা টাকা দাবি করে আটকে রাখে। পরে ৩০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ছাড়া পাই। ফলে আমাদের এখানে পৌঁছাতে আট দিন কেটে যায়।

ছেনোয়ারা বলেন, গত তিন দিন ধরে ক্যাম্পে ও রাস্তার আশপাশে দিন কাটাচ্ছি। এখনো কোথাও আশ্রয় পাইনি। ভারত থেকে পালিয়ে আসা অনেকে উখিয়ার ট্রানজিট পয়েন্টে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই আমরা এখানে ঘুরছি। কিন্তু এখন কোনো সাড়া পাইনি।

রোহিঙ্গাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে কলকাতায় জড়ো হচ্ছেন। এরপর সেখান থেকে দালালদের মাধ্যমে সীমান্তের সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। এরপর টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশী দালালেরা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে পৌঁছে দেয়। অনেকক্ষেত্রে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন তারা।

এপিবিএন পুলিশের ভাষ্যমতে, গত দেড় মাসে ভারত থেকে পালিয়ে উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ৮০০ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬০০ জনকে ক্যাম্পে একটি সেন্টারে কোয়ারান্টিনে রাখা হয়েছে। এছাড়া ট্রানজিট পয়েন্টে প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন।

ভারত থেকে সাত দিনে কক্সবাজার কুতুপালং শিবিরে পৌঁছেছেন ইব্রাহীম খলিল।

তিনি বলেন, ইন্ডিয়ার জাম্বুতে বসবাস করছিলাম। সেখানকার সরকার মুসলিমদের হয়রানি করছে। আমাদের চার থেকে ৫০০ রোহিঙ্গাকে জেলে দিয়েছে। এখানে সেখানে নিরীহ মানুষ, এমনকি ছোট ছোট সন্তানদের রেখে বাবা-মাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আবার বাব-মা রেখে সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা ছাড়া জুলুম করছে। আমরা এখানে পালিয়ে আসছি। ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছিল, সেগুলো খরচ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, কিছু টাকা দালালরা প্রতারণা করে নিয়ে গেছে। ভারতে দিনমজুরি করে সংসার চলছিল। সেখানে অন্য শরণার্থীও রয়েছে তাদের কিছু করছে না। শুধু রোহিঙ্গা মুসলিমদের অত্যাচার করছে সরকার।

ভারত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের খবর নিশ্চিত করে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, এই ব্যাপারে পরে কথা বলবো।

তবে ৮-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসাদের প্রথমে কোয়ারান্টিনে পাঠানো হয়। কোয়ারান্টিন শেষে আবার উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে সেখানকার প্রক্রিয়া শেষে ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তার অধীনে এ পর্যন্ত ১২৪ জন রোহিঙ্গাকে এই প্রক্রিয়ায় ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে।

জাতিঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারকে (ইউএনএইচসিআর) বার্তা পাঠিয়ে এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

সূত্র : ডয়চে ভেলে


আরো সংবাদ


premium cement