২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ফিরে দেখা ২০২১ সালের বিশ্ব

ফিরে দেখা ২০২১ সালের বিশ্ব - ছবি : সংগৃহীত

কালের আবর্তনে বিদায় নিচ্ছে ২০২১। স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আরো একটি বছর বিদায় নিচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। ২০২১ সালের বিভিন্ন ঘটনাই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মানুষের আলোচনায় জায়গা দখল করেছিলো এই ঘটনাগুলো।

এখানে সংক্ষেপে আলোড়ন সৃষ্টি করা কয়েকটি ঘটনায় আলোকপাত করা হলো।

১. কাতারের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার

সৌদি আরবে জিসিসি সম্মেলনে যোগ দিতে আসা কাতারের আমিরকে বিমানবন্দরে গ্রহণ করছেন সৌদি যুবরাজ-ছবি :এএফপি

বছরের শুরুতেই কাতারের ওপর থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত দেশগুলোর অবরোধ প্রত্যাহারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে আলোড়নের সৃষ্টি করে। আরব উপদ্বীপের ক্ষুদ্র দেশ কাতারের ওপর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসরের দীর্ঘ আড়াই বছরের অবরোধ ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি প্রত্যাহার করা হয়। কুয়েতের মধ্যস্ততায় কাতারের ওপর থেকে এই অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় দেশগুলো।

পারস্য উপসাগর উপকূলবর্তী আরব দেশগুলোর আঞ্চলিক সংস্থা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ৪১তম সম্মেলনে কাতারের সাথে চুক্তির মাধ্যমে আরব দেশগুলো এই অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। সৌদি আরবের আল-উলা শহরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-সানি স্বয়ং অংশ নেন।

সম্মেলনের পর থেকেই কাতারের সাথে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসরের কূটনীতিক সম্পর্ক আবার চালু হয়। কাতারের সাথে এই চার দেশের কূটনীতিক দূত বিনিময় হয়। বছরের শেষে ৯ ডিসেম্বর সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল-সউদ কাতার সফরে যান।

এর আগে ২০১৭ সালের ৫ জুন সন্ত্রাসে মদদ দেয়া ও ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতার অজুহাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে চার দেশ কাতারের ওপর অর্থনৈতিক, কূটনীতিক ও ভ্রমণ অবরোধ দেয়। তবে কাতার তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে অস্বীকার করে জানিয়ে আসছিলো, এই অবরোধের কোনো বৈধ কারণ ছিলো না।

আড়াই বছর দীর্ঘ অবরোধের পর সৌদি জোট কাতারের কাছে দেয়া কোনো দাবি মানানো ছাড়াই জানুয়ারিতে অবরোধ প্রত্যাহার করে।

২. ট্রাম্পের বিদায় ও ক্যাপিটলে হামলা

ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা-ছবি : এপি

 

২০২১ সালের দ্বিতীয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত-সমালোচিত এই প্রেসিডেন্টকে বিদায় নিতে হয়েছে।

এর আগে ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান দলীয় প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জয়ী হন ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

কিন্তু নির্বাচনে প্রতারণা ও কারচুপি হওয়ার অভিযোগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফলাফল পুনরায় গণনার জন্য চেষ্টা চালান। তিনি তার অধীন প্রশাসনের বিভিন্ন অংশকে ব্যবহার করে চেষ্টা চালান ফল পরিবর্তন করার। শেষে ব্যর্থ হয়ে নিজের সমর্থকদের আহ্বান জানান 'যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের বৃহত্তম প্রতারণা' রুখে দেয়ার।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন আহ্বানের পর তার সমর্থকরা রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন আইন পরিষদ কংগ্রেসের ভবন ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ চালায়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদে জো বাইডেনের জয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করতে কংগ্রেসের দুই কক্ষের যৌথ অধিবেশন চলছিলো। ট্রাম্প সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায়। ট্রাম্প সমর্থকদের তাণ্ডবে কংগ্রেসের অধিবেশন স্থগিত হয়ে যায়। ক্যাপিটল হিলের এই সহিংসতায় পাঁচজনের প্রাণহানি হয়।

সহিংসতার এই ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেয়ার পরেও দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়, যদিও তাকে অভিশংসিত আর হতে হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ট্রাম্পের একাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়।

ক্যাপিটল হিল থেকে ট্রাম্পের সমর্থকরা সরে যাওয়ার পর কংগ্রেসের অধিবেশন আবার শুরু হয়। অধিবেশনে ইলেক্ট্ররাল কলেজের ৩০৬-২৩২ ভোটে জো বাইডেনের বিজয়কে অনুমোদন করা হয়।

কংগ্রেসের অনুমোদনের পর ২০ জানুয়ারি জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। ওই দিনই তিনি হোয়াইট হাউজ থেকে বিদায় নেন।

৩. মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ও সু চির গ্রেফতারি

মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা-ছবি : রয়টার্স

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান বছরের অন্যতম প্রধান আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর দেশটিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বেসামরিক সরকারের সাথে তাতমাদাও নামে পরিচিত দেশটির সামরিক বাহিনীর মতোবিরোধের জেরে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এই অভ্যুত্থান করা হয়।

সাধারণ নির্বাচনে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জয় লাভ করে। কিন্তু তাতমাদাও এই ফলকে অস্বীকার করে।

সরকারের সাথে বিরোধের জেরে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থান ঘটায় সামরিক প্রধান মিন অঙ লাঙের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। একইসাথে প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ও স্টেট কাউন্সিলর অঙ সান সু চিকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়।

অভ্যুত্থানের সাথে সাথে দেশটিতে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। পরে ১ আগস্ট জরুরি অবস্থার মেয়াদ ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেন জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অঙ লাঙ।

সেনা অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরেই বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা অং সান সু চিসহ বন্দি রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির পাশাপাশি সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া অহিংস বিক্ষোভকে সামরিক উপায়ে জান্তা সরকার দমন করতে গেলে বিক্ষোভকারীরাও বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র হাতে নেয়।

গত ৭ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) দেশের সাধারণ মানুষকে সামরিক জান্তার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়।

এরইমধ্যে সামরিক জান্তার আদালতে ৬ ডিসেম্বর উইন মিন্ট ও অঙ সান সু চিকে দেশে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরে তা কমিয়ে দুই বছরে আনা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও টেলিযোগাযোগের একটি আইন লঙ্ঘনসহ সু চির বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা চালিয়ে সামরিক সরকার।

মিয়ানমারে চলমান এই সহিংসতায় এক হাজার তিন শ’র বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে। অপরদিকে ১১ হাজারের বেশি লোক বিক্ষোভ সংশ্লিষ্টতায় গ্রেফতারির শিকার হয়েছে।

৪. লিবিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন

লিবিয়ার আইনসভায় অন্তর্বর্তী সরকার অনুমোদনের পর ব্ক্তব্য রাখছেন আবদুল হামিদ আল-দাবিবাহ-ছবি : আনাদোলু এজেন্সি

আরব বসন্তের পর লিবিয়ায় ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের অবসান হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন অপর এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। গাদ্দাফি পরবর্তী বিভক্ত লিবিয়ায় সকল পক্ষকে নিয়ে অন্তর্বর্তী এই সরকার গঠন দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

দেশটির ত্রিপোলিকেন্দ্রীক পশ্চিম ও তবরুককেন্দ্রীক পূর্বাঞ্চলীয় সরকার ২০২০ সালের অক্টোবরে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করে এবং সংকট সমাধানে বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা করে।

২০২১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ সংলাপের পর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিবাদমান পক্ষগুলো দেশটিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সম্মত হয়। বিবাদমান পক্ষগুলো অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধি দেশটির সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ ইউনুস মানফি এবং প্রধানমন্ত্রী পদে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিনিধি আবদুল হামিদ আল-দাবিবাহকে নির্বাচিত করে।

পরে ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য দেশটিতে সাধারণ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য ১১ মার্চ অন্তর্বর্তীকালীন এক সরকারের অনুমোদন করা হয়। যদিও শেষ মুহূর্তে গিয়ে এই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।

৫. এভারগ্রিন জাহাজ আটকে সুয়েজ খাল বন্ধ

সুয়েজ খালে আটকে পড়া এভারগ্রিন জাহাজ-ছবি : বিবিসি

মিসরের সুয়েজ খালে বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ এভারগ্রিনের আটকে পড়াটা বছরের আলোচিত এক ঘটনা। পানামার পতাকাধারী চার শ’ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজটি সুয়েজ খাল আটকে দেয়ায় সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করে।

২০২১ সালের ২৩ মার্চ এভার গিভেন কোম্পানির জাহাজটি সুয়েজ খালে আটকে পড়ে। ১৯৩ কিলোমিটার (১২০ মাইল) দীর্ঘ সংকীর্ণ এই খালের দক্ষিণ প্রবেশপথ সুয়েজ বন্দর থেকে ছয় কিলোমিটার (তিন দশমিক সাত মাইল) উত্তরে জাহাজটি আটকে পড়ায় সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রচলিত এই পথটি বন্ধ হয়ে যায়।

পরে প্রায় এক সপ্তাহের চেষ্টার পর ২৯ মার্চ ২০ হাজার টন ওজনের জাহাজটিকে আটকে থাকা অবস্থা থেকে মুক্ত করে আবার ভাসাতে সক্ষম করে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ। পরে ক্ষতিপূরণের দাবিতে জাহাজটি আটকে রাখে তারা। খাল কর্তৃপক্ষের দাবি, জাহাজটি আটকে থাকায় মিসর প্রতিদিন এক কোটি ৪০ লাখ ডলার (বাংলাদেশী ১‌১৮ কোটি টাকার বেশি) রাজস্ব হারিয়েছে।

পরে ৭ জুলাই জাহাজ কোম্পানির সাথে ৫৫ কোটি ডলার (চার হাজার ছয় শ' ৭৫ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে জাহাজটি ছেড়ে দেয় সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ।

৬. ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবনে আলোচনা

পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবনে ভিয়েনায় ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির বৈঠক-ছবি : এএফপি

ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবনে আলোচনা বছরের অন্যতম প্রধান ঘটনা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়ের পরপরই এই আলোচনা শুরু হয়।

২০১৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ভিয়েনায় ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানি ওই পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করে। জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা সংক্ষেপে জেসিপিওএ নামে পরিচিত এই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। এর বিনিময়ে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়।

তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করে।

জো বাইডেনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে এই চুক্তি পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু জো বাইডেন প্রথমে ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। অন্যদিকে ইরান আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করে।

চুক্তি পুনরুজ্জীবনে আলোচনার জন্য ৬ এপ্রিল থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ইরানের সাথে আলোচনা শুরু করে বিশ্বশক্তি। ইরানের আপত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে সরাসরি অংশ নিতে পারেনি। মাঝে জুনে ইরানের নির্বাচনের জন্য আলোচনা স্থগিত করা হয়। ২৯ নভেম্বর নতুন করে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরান চুক্তি পুনরুজ্জীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করছে।

৭. জেরুসালেমে সহিংসতা ও গাজায় ইসরাইলি হামলা

গাজায় ইসরাইলের বোমা হামলা-ছবি : রয়টার্স

২০২১ সালে তিন ধর্মের পবিত্র তীর্থভূমি ফিলিস্তিনের জেরুসালেম শহর প্রত্যক্ষ করে নতুন এক সহিংসতার। শহর থেকে ফিলিস্তিনিদের চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে তার ইহুদি বসতি নির্মাণের চেষ্টা চালায় দখলদার ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। শেখ জাররাহ, সিলওয়ানসহ বিভিন্ন মহল্লা থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি উচ্ছেদের নোটিস পাঠায় তারা। এতে ফুঁসে ওঠে জেরুসালেমের ফিলিস্তিনি আরব বাসিন্দারা। এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে।

অধিকৃত জেরুসালেমের শেখ জাররাহ মহল্লা থেকে ছয় ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ইহুদি বসতি স্থাপনে ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল ইসরাইলি আদালতের আদেশের জেরে জেরুসালেমজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে পরপর কয়েক দফা মসজিদুল আকসায় হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। ৭ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত এই সকল হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জাতিসঙ্ঘের মানবিক সাহায্য বিষয়ক দফতর ইউএনওসিএইএ।

মসজিদুল আকসা চত্ত্বরে মুসল্লিদের ওপর ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ মে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে মসজিদ থেকে সৈন্য সরিয়ে নিতে ইসরাইলকে আলটিমেটাম দেয় গাজা নিয়ন্ত্রণকারী ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পর গাজা থেকে ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামাস রকেট হামলা শুরু করে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুসারে, গাজা থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে মোট চার হাজার তিন শ' ৬০টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমে বেশিরভাগ রকেট ধ্বংস করা হলেও বেশ কিছু রকেট ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে।

ইসরাইল ভূখণ্ডে হামাসের রকেট হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ মে রাত থেকেই গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল।

গাজায় ইসরাইলের টানা ১১ দিনের আগ্রাসনের পর ২০ মে রাতে ইসরাইল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দেয়। মিসরীয় উদ্যোগে এই যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টায় ইসরাইলি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ২১ মে সকাল থেকে তা কার্যকর হয়। ১১ দিনের এই যুদ্ধে অন্তত ২৫০ ফিলিস্তিনি ও ১৩ ইসরাইলি নিহত হয়।

৮. নেতানিয়াহুর বিদায়

নেসেটে নতুন ইসরাইলি সরকার অনুমোদনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী বেনেতের সাথে হাত মেলাচ্ছেন নেতানিয়াহু-ছবি : এএফপি

দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিদায় বছরের আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক ঘটনা। দেশটিতে দীর্ঘ দুই বছর রাজনৈতিক সংকটের পর সকল মতের বিরোধীদের একজোট হয়ে সরকার গঠন ইসরাইলে নেতানিয়াহুর যুগের অবসান ঘটায়।

২০২১ সালের ২৩ মার্চ ইসরাইলে সেই সময়ের রাজনৈতিক সংকটে দুই বছরের মধ্যে চতুর্থবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোনো দলই দেশটির আইন পরিষদ নেসেটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিওভেন রিভলিনের সাথে নেসেট সদস্যদের আলোচনার পর শুরুতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু কোনো দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন তিনি।

নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার পর তার বিরোধী ইয়েশ আতিদ দলের প্রধান ইয়ায়ির লাপিদের কাছে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট রিভলিন। তিনি অপর বিরোধী দল ইয়ামিনার নেতা নাফতালি বেনেতের সাথে প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়সীমা ভাগাভাগির সমঝোতার বিনিময়ে সরকার গঠনে সম্মত করান। দুই নেতার সম্মতিতে অপর আরো ছয় দলের যোগে নেসেটে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়। ১৩ জুন এই প্রস্তাবের অনুমোদনের পর নেতানিয়াহুর যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সমঝোতার শর্ত অনুসারে প্রথম দুই বছরের জন্য নাফতালি বেনেত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

৯. তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট দফতরে তালেবান যোদ্ধারা-ছবি : এপি

দুই দশক একটানা যুদ্ধের পর নতুন করে আবার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে যাওয়া ২০২১ সালের সর্বাধিক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। ২০ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুৎ সশস্ত্র এই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আবার ক্ষমতায় আরোহন সারাবিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করে।
২০০১ সাল থেকে দীর্ঘ ২০ বছর যুদ্ধের পর আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তালেবানের সাথে আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলোচনার পর কাতারের দোহায় এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর বিপরীতে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশ নিতে তালেবান সম্মত হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘোষণা অনুসারে ৩১ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে বহুজাতিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ডেডলাইন থাকলেও ৩০ আগস্ট সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।

মার্কিনিদের সাথে চুক্তি অনুসারে ক্ষমতাসীন থাকা মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারের সমঝোতার জন্য তালেবান চেষ্টা করলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। তালেবানের অভিযোগ, আশরাফ গনির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে মে মাসে বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারের মধ্যেই পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানো শুরু করে তালেবান।
৬ আগস্ট প্রথম প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নিমরোজ প্রদেশের রাজধানী যারানজ দখল করে তারা। যারানজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ১০ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় রাজধানী কাবুলে পৌঁছে যায় তালেবান যোদ্ধারা। তালেবানের অগ্রসরে আশরাফ গনির কাবুল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জেরে আফগান প্রশাসন ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ আগস্ট কাবুলে প্রবেশ করে তালেবান যোদ্ধারা।

তবে কাবুলের উত্তরের দুর্গম পাঞ্জশির প্রদেশ শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গিয়েছিলো। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধ যুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা আহমদ শাহ মাসুদের ছেলে আহমদ মাসুদের নেতৃত্বে তালেবানবিরোধী বিদ্রোহী যোদ্ধারা এই উপত্যকায় অবস্থান নিয়েছিলো।

৬ সেপ্টেম্বর পাঞ্জশির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তালেবান। এর পর ৭ সেপ্টেম্বর দলীয় প্রধান মোল্লা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে রাষ্ট্রপ্রধান ও রাহবারি শুরার সদস্য মোল্লা হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী করে নতুন আফগান সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় দলটি।

১০. সুদানে সামরিক অভ্যুত্থান

সুদানে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি বিক্ষোভকারীরা- ছবি : আনাদোলু এজেন্সি

আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক অভ্যুত্থান বছরের আরো একটি আলোচিত ঘটনা। ওমর আল বশির পরবর্তী সুদানে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের অংশীদারমূলক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সভরেইন কাউন্সিলের উভয়পক্ষের মতবিরোধের জেরে এই অভ্যুত্থান ঘটায় সামরিক বাহিনী।

২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর এই অভ্যুত্থানে দেশটিতে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ হামদুকসহ বিপুল বেসামরিক নেতৃত্বকে ২৫ অক্টোবর সামরিক বাহিনী গ্রেফতার করে এবং সামরিক প্রধান জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল-বুরহান পূর্ণ ক্ষমতা দখল করেন।

সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপকে 'অভ্যুত্থান' হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সুদানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।

তবে জেনারেল বুরহান তার এই পদক্ষেপকে অভ্যুত্থানের বদলে 'গণতান্ত্রিক উত্তরণকে শোধরানোর' পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরে ২১ নভেম্বর আবদুল্লাহ হামদুকের সাথে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাহী ক্ষমতা পরিচালনার জন্য মন্ত্রিসভা গঠনে জেনারেল আল-বুরহান চুক্তি করেন।

তবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বিভিন্ন দল এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সম্পূর্ণ বেসামরিক সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

১১. ভারতে কৃষক বিক্ষোভের সমাপ্তি

ভারতে কৃষক বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা- ছবি : আলজাজিরা

 

২০২১ সালের অপর অন্যতম আলোচিত ঘটনা ভারতে কৃষক বিক্ষোভের সমাপ্তি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণায় ৯ ডিসেম্বর আন্দোলনে সমাপ্তির ডাক দেয় কৃষকেরা।

এর আগে ১৯ নভেম্বর নরেন্দ্র মোদি বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিল ঘোষণা করেন।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদির সরকারের কৃষি বিষয়ক তিনটি বিল পাসের পর থেকে রাস্তায় নেমে প্রবল বিক্ষোভে সোচ্চার হন লাখ লাখ কৃষক। ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে হরিয়ানা, পাঞ্জাব থেকে কৃষকরা এসে ভিড় জমান রাজধানী দিল্লির সীমানায়। মাসের পর মাস ধরে দিল্লির সীমানা ঘেরাও করে চলে বিক্ষোভ। সেই বিক্ষোভে উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহারসহ একাধিক রাজ্য থেকে কৃষকরা গিয়ে জড়ো হন।

টানা এক বছর আন্দোলন চলার পর কৃষকদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় মোদি সরকার।


আরো সংবাদ


premium cement