২৪ জুলাই ২০২১
`

পেগাসাস স্পাইওয়্যার : সমালোচকদের মুখ বন্ধের ইসরাইলি অস্ত্র

প্রতীকী ছবি -

মেক্সিকোর সাংবাদিক সিসিলো পিনেডা ২০১৭ সালের ২ মার্চ তারিখে তার ফোন থেকেই এক ফেসবুক লাইভে গিয়েছিলেন। ওই লাইভে তিনি সরকার ও স্থানীয় পুলিশকে দেশটির অপরাধী চক্র ও মাফিয়া সরদারদের সাথে যোগসাজশের জন্য অভিযুক্ত করেন। লাইভের দুই ঘণ্টা পরেই দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে গুলি করে হত্যা করে।

কয়েক সপ্তাহ পরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ক বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ফরবিডেন স্টোরির প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, শুধু পিনেডা নয়, তার হত্যা মামলার তদন্তকারী কৌসুলি জ্যাভিয়ার ওলেয়া পেলায়েজের ফোনও মাসের পর মাস ইসরাইলি স্পাইওয়্যার পেগাসাসের মাধ্যমে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

পিনেডার ফোন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পৌঁছানোর আগেই তার ফোন ঘটনাস্থল থেকে হারিয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্টের নিবন্ধক ও সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশগজিকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যার দুই সপ্তাহ পরে ডিজিটাল ক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সিটিজেন ল্যাব জানায়, ইসরাইলি প্রযুক্তি সংস্থা এনএসও গ্রুপ টেকনোলজির উদ্ভাবিত এই স্পাই ওয়্যারের মাধ্যমে খাশগজির ঘনিষ্ঠ ওমর আবদুল আজিজের ফোনে নজরদারি চালানো হচ্ছিল।

ফরবিডেন স্টোরির প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুসারে, খাশগজির হত্যার চার দিনের মাথায় তার বাগদত্তা খাদিজা চেঙ্গিজের ফোনে পেগাসাস স্পাইওয়্যার চালু করে দেয়া হয়েছিল। খাশগজির চেলে আবদুল্লাহর ফোনও পেগাসাসের সাহায্যে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছিল।

সারাবিশ্বের মোট ১৮০ সাংবাদিকের ফোন পেগাসাসের মাধ্যমে নজরদারি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সিকিউরিটি ল্যাবের সাথে ফরবিডেন স্টোরির যৌথ এক তদন্তে দেখা যায়, শুধু সাংবাদিকই নন, বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, অধিকার কর্মী এমনকি বিচারকরাও এই স্পাই ওয়্যারের শিকার হয়েছেন।

ফরবিডেন স্টোরির তথ্য অনুসারে, তারা মোট ৫০ হাজারের বেশি ফোনের কল রেকর্ড পেগাসাসের মাধ্যমে এনএসওর গ্রাহকদের নজরদারি করার তথ্য পেয়েছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্লামার্ড বলেন, ‘এই বিপল সংখ্যা প্রমাণ করছে নিপীড়নের বিপুল বিস্তৃতির মাধ্যমে সাংবাদিক, তাদের পরিবার ও সহযোগীদের জীবন বিপদের মধ্যে ফেলার সাথে সাথে সংবাদের স্বাধীনতাকে অবজ্ঞা করা এবং সমালোচনাকারী গণমাধ্যম বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

ফরবিডেন স্টোরির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনএসও এক লিখিত প্রতিক্রিয়ায় জানায়, ফরবিডেন স্টোরির তদন্ত ‘ভুল ধারণা’ ও ‘অসমর্থিত তত্ত্বের’ ভিত্তিতে করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ‘কথিত ৫০ হাজারের বেশি ফোন নাম্বারের ফাঁস করা তথ্য পেগাসাস ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারের নজরদারিতে থাকা ফোনের তালিকা হতে পারে না।’

এনএসও’র বিবৃতি অনুসারে, পেগাসাস প্রযুক্তি শুধু গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অনুসরণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

এতে আরো বলা হয়, পেগাসাস গণ নজরদারি প্রযুক্তি নয়। এটি শুধু গুরুতর অপরাধ ও সন্ত্রাসে জড়িত নির্দিষ্ট সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়।

প্রযুক্তি সংস্থাটির তথ্য অনুসারে বর্তমানে মোট ৪০টি দেশের ৬০ গ্রাহক পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করছে।

ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ক পরিচালক ইভা গ্যালপেরিন ২০১০ থেকে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর সাইবার হামলার বিষয়ে কাজ করে আসছেন।

তিনি বলেন, ২০১১ সালের দিকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তির কম্পিউটারে ইমেইল পাঠানো হতো। এই ইমেইলে ক্লিক করার সাথে সাথে তা থেকে ম্যালওয়ার ছড়িয়ে কম্পিটারে তা চালু হয়ে নিত এবং ওই কম্পিটারের তথ্য পাচার করতো।

কিন্তু স্মার্টফোনে পেগাসাসের চালু হওয়ার বিষয়টি আরো সূক্ষ্ম। আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো সংযোগ ছাড়াই এটি তার ফোনে চালু হতে পারে।

একবার চালু হওয়ার পর পেগাসাস গোপন ম্যাসেজিং অ্যাপ হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম বা সিগন্যালসহ সব তথ্যই এনএসওর গ্রাহকদের কাছে পাচার করে।

ফোন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই স্পাই ওয়্যার চালু থাকে। আবার পাওয়ার অন করার সাথে সাথে এটি চালু হয়।

সূত্র : ইয়েনি শাফাক



আরো সংবাদ