২৯ নভেম্বর ২০২০

করোনা থেকে সেরে ওঠার ক্ষেত্রে রেমডেসিভিরের ভূমিকা 'সামান্যই' : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভির ব্যবহারের সাথে কোভিড রোগীদের অপেক্ষাকৃত দীর্ঘসময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা 'অতি সামান্য বা একেবারেই নেই।'

রেমডেসিভির ও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন-সহ কোভিড-১৯ এর মোট চারটি সম্ভাব্য ওষুধের ট্রায়ালের মূল্যায়ন করে এ তথ্য জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় প্রথম যে কয়টি ওষুধ ব্যবহৃত হয়েছিল, রেমডেসিভির সেগুলোর মধ্যে একটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকার সময় তার চিকিৎসায়ও রেমডেসিভির ব্যবহার করা হয়েছিল।

ওষুধটির নির্মাতা সংস্থা গিলিয়াড সায়েন্সেস অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই দাবি প্রত্যাহার করেছে। এক বিবৃতি গিলিয়াড বলেছে যে গবেষণাটি থেকে পাওয়া তথ্য অন্য গবেষণার সাথে তুলনায় 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ' এবং সাম্প্রতিক এই গবেষণার ফলাফলের রিভিউ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তারা 'চিন্তিত।'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

সলিডারিটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চারটি সম্ভাব্য ওষুধের কার্যকারিতার ওপর পরীক্ষা চালায় - যেগুলোর মধ্যে ছিল ইবোলার ওষুধ রেমডেসিভির, ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, অটো-ইমিউন ড্রাগ ইনটারফেরোন এবং এইচআইভি'র ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত লোপিনাভির এবং রিটোনাভিরের মিশ্রণ।

যুক্তরাজ্যের আইসিইউ'তে থাকা করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের ওপর ব্যবহৃত কম মূল্যের স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ডেক্সামেথাসোন এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

৩০টিরও বেশি দেশে মোট ৫০০ হাসপাতালে থাকা ১১,২৬৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ওপর চারটি ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়। ঐ গবেষণার ফলাফলের 'পিয়ার রিভিউ' বা একই ধরণের বিষয় নিয়ে করা গবেষণার সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা এখনও সম্পন্ন হয়নি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই চারটি ওষুধের একটিও কোভিড রোগীর মৃত্যু ঠেকাতে বা হাসপাতাল থাকার সময়ের ওপর প্রভাব রাখতে ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক সৌম্য স্বামীনাথন বুধবার বলেন যে, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এবং লোপিনাভির/রিটোনাভির এর ট্রায়াল জুনেই থামিয়ে দেয়া হয়েছিল কারণ সেসময়ই প্রমাণিত হয় যে ঐ ওষুধগুলো অকার্যকর। তবে অন্য ওষুধগুলোর ট্রায়াল চলছিল।

এই মাসের শুরুতে গিলিয়াডের পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলের সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলের বৈপরীত্য রয়েছে।

গিলিয়াডের গবেষণায় উঠে আসে যে আইসিইউ'তে থাকা কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে রেমডেসিভির ব্যবহারে হাসপাতালে থাকার সময় পাঁচদিন কমিয়ে আনা সম্ভব। গিলিয়াডের ঐ ট্রায়ালে প্রায় এক হাজার কোভিড রোগী অংশ নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে?

রেমডেসিভির ওষুধের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গিলিয়াড সায়েন্সেস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিজেদের বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, "বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক উপাত্ত অসামাঞ্জস্যপূর্ণ। 'পিয়ার রিভিউ' থাকা একাধিক জার্নালে প্রকাশিত র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড গবেষণা প্রতিবেদনে রেমডেসিভিরের মাধ্যমে চিকিৎসার উপকারিতার বিষয়টি উঠে এসেছে।"

"আমার শঙ্কিত যে এই ওপেন-লেবেল গ্লোবাল ট্রায়াল প্রয়োজনীয় রিভিউর মধ্যে দিয়ে যায়নি, যার ফলে এর গঠনমূলক বৈজ্ঞানিক সমালোচনা করা সম্ভব হয়নি।"

ওদিকে যুক্তরাজ্যের একটি বড় মাপের ট্রায়াল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'রিকভারি'র অধ্যাপক মার্টিন ল্যান্ড্রে মন্তব্য করেছেন যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার ফলাফল 'গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিখুঁত।'

পাশাপাশি ঐ ওষুধের দাম এবং সহজলভ্যতা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, "কোভিড সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ ও তাদের পরিবারকে আক্রান্ত করেছে। এটি বিরল কোনো রোগ নয়, কিন্তু এর চিকিৎসায় আমাদের সাশ্রয়ী ও যথার্থ চিকিৎসা প্রয়োজন। এই বিষয়ে স্বাধীন, বিশ্বাসযোগ্য ও পরিষ্কার গবেষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর একটি বড় উপকার করে দিয়েছে।"

কোভিডের অন্যান্য চিকিৎসার কী অবস্থা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সলিডারিটি ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. স্বামীনাথান বলেন যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন খুঁজছে যে 'পরবর্তীতে কি আছে।'

"মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, ইমিইউনোমডুলেটর সহ গত কয়েকমাসে তৈরি হওয়া অপেক্ষাকৃত নতুন অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখছি আমরা।"

ওদিকে চীনের গবেষকরা দাবি করছে যে একটি ভ্যাকসিন, যেটি নিয়ে এখনো কাজ করা হচ্ছে, নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ের ট্রায়ালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়েছে।

তবে গবেষকরা বলেছেন, ঐ ভ্যাকসিনের কারণে শরীরের অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়ায় যে বৃদ্ধি হয় তা সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে যথেষ্ট কি না, সেটি এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিকাল প্রোডাক্টস এর তৈরি ঐ ভ্যাকসিন চীনে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ