১০ জুলাই ২০২০
দেহে ভাইরাস আছে, কিন্তু উপসর্গ নেই

নীরবে করোনা সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন যারা

নীরবে করোনা সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন যারা -

যত দিন যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের অদ্ভুত কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ততই নতুন নতুন সব তথ্য জানতে পারছেন। এর কিছু কিছু তাদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

সবাই এতদিনে জেনে গেছেন যে, করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ সংক্রমণ হলে মানবদেহে জ্বর, কাশি, স্বাদ গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া– এসব উপসর্গ দেখা দেয়।

কিন্তু এমন কিছু লোক আছেন, যাদের দেহে কোন উপসর্গই দেখা দেয় না।

তারা জানতেও পারেন না যে তারা করোনাভাইরাস বহন করছেন এবং সবচেয়ে ভয়ের কথা, তারা নীরবে অন্যদের সংক্রমিত করে চলেছেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঠিক কত মানুষের মধ্যে এরকম ‘উপসর্গ-বিহীন’ সংক্রমণ ঘটেছে, এবং এই ‘নীরব বিস্তারকারীরাই’ এই ভাইরাস এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী কিনা- তা জানা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

জানুয়ারির ১৯ তারিখ সিঙ্গাপুরের দ্য লাইফ চার্চ অ্যান্ড মিশন নামের গির্জাটিতে রোববার সকালের প্রার্থনায় যারা জড়ো হয়েছিলেন, তারা কেউ ভাবতেই পারেননি যে, এখান থেকে করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে।

সেদিন সেই প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন এক প্রৌঢ় দম্পতি।

সেসময় চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা অনেকেই জানতেন কিন্তু সবারই ধারণা ছিল কোভিড-১৯এ কেউ সংক্রমিত হলে তা বোঝা যাবে তার ঘনঘন কাশি দেখে।

ওই দম্পতিটির দু’জনেরই বয়স ৫৬। দুজনের কারোরই কোন কাশি ছিল না, অন্য কোন উপসর্গ বা স্বাস্থ্য সমস্যাও ছিল না। ফলে গির্জার কারোরই তাদের নিয়ে অন্য কিছু ভাবার কোন কারণ ছিল না।

সমস্যা হলো, তারা সেদিন সকালেই সিঙ্গাপুর আসেন চীনের উহান শহর থেকে– যা তখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রার্থনা শেষ হবার সাথে সাথেই তারা চার্চ থেকে চলে গিয়েছিলেন।

এর পর তিন দিন যেতে না যেতেই ঘটনা খারাপ দিকে মোড় নিতে শুরু করলো। জানুয়ারির ২২ তারিখে প্রথমে সেই মহিলাটি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর দুদিন পর অসুস্থ হলেন তার স্বামী।

পরে এক সপ্তাহের মধ্যে সিঙ্গাপুরের তিনজন স্থানীয় লোক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোথা থেকে কীভাবে তারা সংক্রমিত হলেন– কেউ বুঝতে পারছিল না।

সিঙ্গাপুরে করেনাভাইরাস বিস্তারের সেখান থেকেই সূচনা।

‍“আমরা একেবারেই বোকা বনে গিয়েছিলাম। যাদের দেহে রোগের কোন লক্ষণ নেই, তারা কী করে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে?”- বলছিলেন সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ভারনন লী।

কোভিড-১৯ সম্পর্কে তখন তাদের যেটুকু জানা ছিল– সেই জ্ঞান দিয়ে তারা বুঝতেই পারছিলেন না যে কী করে লোকের মধ্যে রোগটা ছড়াচ্ছে।

ড. লী তখন পুলিশ এবং রোগ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা তদন্ত শুরু করলেন। কে কখন কবে কোথায় ছিলেন তার একটা মানচিত্র তৈরি করলেন।

এটাকেই বলে কনট্যাক্ট ট্রেসিং- যার মাধ্যমে কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তা জানা যায় এবং রোগ বিস্তার ঠেকানো যায়।

বলা হয় সিঙ্গাপুরের তদন্তকারীরা এ কাজে বিশেষ দক্ষ। কয়েকদিনের মধ্যে তার সেই গির্জার ১৯১ জন লোকের সাথে কথা বললেন, এবং বের করলেন যে তাদের মধ্যে ১৪২ জন সেই রোববারের প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন। এটাও বেরিয়ে এলো তার মধ্যে যে দু‌’জন সংক্রমিত হয়েছিলেন– তারা সেই চীনা দম্পতির সাথে একই প্রার্থনায় ছিলেন।

‍“হয়তো তারা কথা বলেছিলেন, বা পরস্পরকে সম্ভাষণ করেছিলেন– যা গির্জায় প্রার্থনার সময় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা‍”– বলছিলেন ড. লী।

এ থেকে একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। কিন্তু যে প্রশ্নের জবাব মিলছে না তা হলো: “সেই চীনা দম্পতির দেহে তো সংক্রমণের কোন লক্ষণ ছিল না। তাহলে তারা কিভাবে ভাইরাস ছড়ালেন ?”

তার ওপর আরো কঠিন একটি ধাঁধাঁরও কোন উত্তর পাওয়া গেল না। সেটা হচ্ছে, সিঙ্গাপুরের যে ৫২ বছর বয়স্ক মহিলা তৃতীয় সংক্রমিত ব্যক্তি ছিলেন– তিনি সেই প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু ওই গির্জাতেই সেদিন অন্য একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাহলে কীভাবে সংক্রমিত হলেন?

সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তদন্তকারীরা গির্জার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।

তা থেকেই বেরিয়ে এলো এক অপ্রত্যাশিত তথ্য। চীনা দম্পতি গির্জা থেকে চলে যাবার পর তারা যে চেয়ারে বসেছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই চেয়ারেই এসে বসেছিলেন আক্রান্ত মহিলাটি।

বোঝা গেল, চীনা দম্পতিটির হয়তো নিজেদের কোন অসুস্থতা ছিল না বা কোন উপসর্গ ছিল না– কিন্তু তা সত্বেও তারা না জেনেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে অন্যদের সংক্রমিত করেছেন। হয়তো তাদের হাতে ভাইরাস লেগে ছিল, বা হয়তো তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে এটা ছড়িয়েছে। ঠিক কী ঘটেছে তা স্পষ্ট নয়– কিন্তু এর তাৎপর্য ছিল বিশাল।


আরো সংবাদ

সকল