২৫ মে ২০২০

বিভিন্ন দেশে টিকার ওপর কতটা আস্থা আছে মানুষের

বিশ্বজুড়েই টিকার ব্যাপারে মানুষের অবিশ্বাস বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আবার পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে। টিকার ব্যাপারে মানুষের মনোভাব জানার জন্য বিশ্বে এযাবতকালের সবচেয়ে বড় জরিপে দেখা যাচ্ছে অনেক অঞ্চলে টিকা সম্পর্কে মানুষের আস্থা একেবারেই কম।

বিশ্বের ১৪০টি দেশের এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের ওপর জরিপটি চালায় যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম ট্রাস্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে দশটি বিষয়কে বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে বর্ণনা করছে, তার একটি হচ্ছে টিকা দেয়ার ব্যাপারে মানুষের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।

এই বিশ্ব জরিপে এমন অনেক লোকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে যারা বলছে টিকার ব্যাপারে তাদের খুব কমই বিশ্বাস বা আস্থা আছে।

যখন তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল টিকা নিরাপদ কীনা, এর উত্তরে:
•৭৯ শতাংশ বলেছেন তারা 'মোটামুটি' বা 'দৃঢ়ভাবে' এর সঙ্গে একমত

•৭ শতাংশ বলেছেন তারা এব্যাপারে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত করেন

•১৪ শতাংশ এর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছুই বলেননি

আর যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল টিকা কতটা কাজ করে:
•৮৪ শতাংশ বলেছেন তারা মোটামুটি বা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে টিকা কাজ করে।

•৫ শতাংশ বলেছেন তারা মোটামুটি বা দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেন

•আর ১২ শতাংশ পক্ষে বা বিপক্ষে কিছুই বলেননি

কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ
হাম বা এরকম অনেক মারাত্মক সংক্রমণের বিরুদ্ধে যে টিকা সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা, এটির অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে।

বিশ্ব জুড়ে কয়েকশো কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে টিকা। বিশ্ব থেকে যে গুটি বসন্ত নির্মূল করা গেছে, তার পুরো অবদান এই গুটি বসন্তের টিকা। পোলিওর মতো রোগসহ আরও অনেক রোগ এখন নির্মূলের পথে। কিন্তু অন্যদিকে হাম এবং আরও কিছু রোগ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকজন টিকা দেয়া এড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ টিকা সম্পর্কে তাদের ভীতি এবং ভুল ধারণা।

ড: অ্যান লিন্ডস্ট্রান্ড বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।

"টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগের বিরুদ্ধে বিশ্বে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা কিন্তু ভেস্তে যেতে পারে টিকা দেয়া নিয়ে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে। এসব রোগ আবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে সেটাকে আমরা একটা অগ্রহণযোগ্য পশ্চাৎযাত্রা বলেই গণ্য করবো।"

হাম আবার ফিরে আসছে
যেসব দেশে হাম প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, সেখানে আবার হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই নতুন করে হাম রোগের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে এর সংক্রমণ ছিল ৩০ শতাংশ বেশি। কেউ যখন টিকা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা যে কারণেই হোক, তা কেবল তাকেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে না, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলছে।

যখন একটি এলাকায় যথেষ্ট সংখ্যাক মানুষ হামের টিকা নেন, সেটি ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করে। এই বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা বলেন 'হার্ড ইমিউনিটি।' অর্থাৎ পুরো জনগোষ্ঠীই তখন সংক্রমণ-প্রতিরোধী হয়ে উঠেন।

ওয়েলকাম ট্রাস্টের ইমরান খান বলেন, "আমরা এখন খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ যদি অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষ হামের টিকা না নেয়, তখন এই রোগ আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমরা এখন সেটাই দেখছি।"

টিকার ব্যাপারে আস্থা কোথায় কম?
টিকা দেয়া কতটা নিরাপদ তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিয়তা কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয়ের কিছু অঞ্চলে। যেমন ফ্রান্স। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের মতো ফ্রান্সেও নতুন করে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। সেখানে জরিপে দেখা যাচ্ছে, সেখানে প্রতি তিন জনে একজন মনে করে টিকা দেয়া নিরাপদ নয়। টিকা সম্পর্কে এরকম নেতিবাচক মনোভাব বিশ্বের আর কোন দেশে এত বেশি নয়।

টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কেও ফরাসীদের সংশয় অনেক বেশি। সেখানে ১৯ শতাংশ মানুষই মনে করে টিকা রোগ প্রতিরোধে খুব কার্যকর নয়। আর শিশুদের টিকা দেয়া যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মানতে নারাজ দশ শতাংশ ফরাসী।

ফ্রান্সে এতদিন শিশুদের জন্য তিনটি টিকা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন সেখানে আরও ৮টি টিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রতিবেশি ইটালিতে ৭৬ শতাংশ মনে করে টিকা দেয়া নিরাপদ। ইটালিতে সম্প্রতি আইন করা হয়েছে টিকা না দেয়া শিশুদের স্কুলে নিষিদ্ধ করে। শিশুদের টিকা না দিলে বাবা-মায়ের জরিমানারও বিধান আছে। ইটালির সরকার এসব পদক্ষেপ নিয়েছে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার পর।

যুক্তরাজ্যে এখনো পর্যন্ত এরকম কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, প্রয়োজনে টিকাদান বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি তারা বাদ দিচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৬টি অঙ্গরাজ্যে ৯৮০টি হামের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ এবং পশ্চিম ইউরোপে ৭০ শতাংশের বেশি কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে টিকা দেয়া নিরাপদ। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কিছুটা তফাৎ আছে।

যেমন পশ্চিম ইউরোপে টিকা দেয়া নিরাপদ মনে করে ৫৯ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপে ৫০ শতাংশ।

ইউরোপে গত বছর সবচেয়ে বেশি হামের সংক্রমণ ধরা পড়েছে ইউক্রেনে (৫৩ হাজার ২১৮টি)। সেখানে মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে রোগ প্রতিরোধে টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখে। বেলারুশে এই হার ৪৬ শতাংশ, মলডোভায় ৪৯ শতাংশ এবং রাশিয়ায় ৬২ শতাংশ।

টিকার ব্যাপারে আস্থা কোন দেশে বেশি
স্বল্প আয়ের অঞ্চলগুলিতে বেশিরভাগ মানুষই টিকার ওপর আস্থা রাখে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপরে দক্ষিণ এশিয়া।। সেখানে ৯৫ শতাংশ মানুষই একমত যে টিকা দেয়া নিরাপদ। এরপরই আছে পূর্ব আফ্রিকা। সেখানে টিকায় আস্থার হার ৯২ শতাংশ।

টিকার ব্যাপারে আস্থা এবং এর কার্যকারিতায় ভরসা রাখেন বাংলাদেশ এবং রুয়ান্ডার প্রায় সব মানুষ। সেখানে নানা রকমের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও টিকাদানের হারে দারুণ সাফল্য পাওয়া গেছে।

রুয়ান্ডা হচ্ছে বিশ্বের প্রথম নিম্ন আয়ের দেশ যেখানে সব তরুণীকেই এইচপিভি টিকা দেয়া হয়। এই টিকা জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

ইমরান খান বলেন, "টিকাদানের হার বাড়ানোর জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা নেয়া হলে কী অর্জন করা যায়, এটা তারই উদাহারণ।"

জরিপে দেখা গেছে, বিজ্ঞানী, ডাক্তার এবং নার্সদের ওপর যাদের আস্থা বেশি, টিকা দেয়াকে তারাই বেশি নিরাপদ বলে মনে করে। অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে যারা বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্যের খোঁজ-খবর নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রেই টিকার ব্যাপারে অবিশ্বাস বেশি।

ওয়েলকাম ট্রাস্টের রিপোর্টে অবশ্য কেন টিকার ব্যাপারে মানুষের আস্থা কম, তা খুব বেশি খতিয়ে দেখা হয়নি। তবে গবেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে অনেক কারণ থাকতে পারে। একটা কারণ হতে পারে আত্মতুষ্টি। কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন রোগ যদি বিরল হয়ে পড়ে, তখন তার বিরুদ্ধে টিকা নেয়া আর অতটা জরুরী বলে মনে নাও হতে পারে।

সব ঔষধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। টিকার বেলাতেও তাই। কিন্তু টিকার ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপক পরীক্ষা চালানো হয় যাতে এটিকে নিরাপদ এবং কার্যকর করা যায়। ইন্টারনেটের যুগে টিকার ব্যাপারে মানুষের উদ্বেগ এবং অবিশ্বাস মূহুর্তেই অনেকের সঙ্গে শেয়ার করা যায়। এর ফলে টিকা সম্পর্কে এমন অনেক কথা ছড়িয়ে পড়ছে, যা মোটেও তথ্যনির্ভর নয়।

জাপানে এইচপিভি টিকা সম্পর্কে লোকজনের উদ্বেগ এবং স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা ব্যাপক প্রচার পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে টিকাদানের ব্যাপারে মানুষের আস্থায় ফাটল ধরে।

একই ভাবে ফ্রান্সে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকার ব্যাপারে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগটা ছিল, সরকার বিপুল পরিমাণে এমন ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা কিনেছে, যেগুলো খুব দ্রুত তৈরি করা হয়েছে এবং এর ফলে এগুলো নিরাপদ নয়। এই দাবির কোন ভিত্তি ছিল না।

যুক্তরাজ্যেও এমন কিছু ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছিল যেখানে এমএমআর (মামস, মিজেলস, রুবেলা) টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে বলে দাবি করা হচ্ছিল।

ডঃ লিন্ডস্ট্রান্ড বলেন, "এ ধরনের সন্দেহ এবং উদ্বেগ দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের খুব ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া। যাতে তারা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে টিকা দেয়ার সুপারিশ করতে পারেন। যাতে তারা টিকা দেয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যেসব প্রশ্ন এবং উদ্বেগ, তার জবাব দিতে পারেন।" বিবিসি বাংলা।


আরো সংবাদ





maltepe evden eve nakliyat knight online indir hatay web tasarım ko cuce Friv gebze evden eve nakliyat buy Instagram likes www.catunited.com buy Instagram likes cheap Adiyaman tutunu