১৭ আগস্ট ২০২২
`

ইরানের সাথে পরমাণু সমঝোতায় ভিয়েনায় আলোচনা শুরু

বিশ্বশক্তির পরমাণু সমঝোতা-ইরান-ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ভিয়েনার প্যালেস কোবার্গ, পরমাণু সমঝোতায় ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির বৈঠকের স্থান - ছবি : রয়টার্স

ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে পাঁচ মাস বিরতির পর পরমাণু সমঝোতায় ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। সোমবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা হচ্ছে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির পরমাণু সমঝোতায় শুরু হওয়া আলোচনা জুনে ইরানে নির্বাচনের কারণে স্থগিত করা হয়।

ভিয়েনা আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী ও পরমাণু সমঝোতায় প্রধান আলোচক আলী বাকেরি কানি। ইরানের সাথে আলোচনায় ব্রিটেন, চীন, জার্মানি, রাশিয়া ও ফ্রান্স অংশগ্রহণ করছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান বিষয়ক বিশেষ দূত রবার্ট ম্যালের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দল পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছে।

আলোচনার প্রথমদিনে ইরানের সাথে বিশ্বশক্তির মীমাংসার গতিপথ ঠিক করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

এদিকে আলোচনার শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আলোচনা সফল না হলে ‘ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের’ হুমকি দিয়েছে।

রব ম্যালে সতর্কতা বলে বলেছেন, তেহরান যদি তার পরমাণু প্রকল্পকে জোরদারে সময়ক্ষেপণের জন্য আলোচনাকে ব্যবহার করে, তবে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা নিষেধাজ্ঞার চাপ আরো জোরালো করবে।

১৮ নভেম্বর টুইটবার্তায় তিনি বলেন, ইরানের সামনে বাছাইয়ের জন্য দুইটি পথ রয়েছে: ‘পরমাণু সংঘাত ও সংকটের ধারাবাহিকতা বা পারস্পারিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে জেসিপিওএতে ফিরে এসে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও কূটনৈতিক বন্ধনের সুযোগ তৈরি করা।’

২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সাথে ইরানের পরমাণু সমঝোতায় সম্পাদিত চুক্তিটি ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ বা সংক্ষেপে জেসিপিওএ নামে পরিচিত।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক সমন্বয়ক ব্রেট ম্যাকগুর্ক গত ২১ নভেম্বর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (আইএএস) আয়োজিত মানামা ডায়লগ ফোরামে বলেন, ‘এতে কোনো প্রশ্ন নেই যে আমরা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করার অনুমতি দেবো না।’

তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক পন্থার মাধ্যমে সমাধানের জন্য আমরা এখনো প্রত্যাশা করছি। তবে তাতে যদি সমাধান না হয়, আমরা ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নেবো।’

এদিকে ইরান বলছে, আলোচনা সফল করতে হলে আগে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

ভিয়েনায় আলোচনায় যোগ দেয়ার আগে ইরানের সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে আলী বাকেরি কানি বলেন, ইরান তার ওপর থেকে ‘অবৈধ ও নিষ্ঠুর’ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে এই আলোচনায় যোগ দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইরানি প্রতিনিধি দলের বক্তব্যে ইরানি জাতির বিরুদ্ধে মার্কিনিদের চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণে তেহরানের প্রতিজ্ঞা ও গুরুত্ব ফুটে উঠেছে।’

এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ ইবরাহিম রইসি বার্তা দিয়েছিলেন, ভিয়েনা আলোচনায় সাফল্যের জন্য আগে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে অস্ট্রিয়ায় ভিয়েনায় শুরু হওয়া সমঝোতা আলোচনায় ইরানের সাথে চীন, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন ছয় দফায় বৈঠক করে। জুনে ইরানে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে সমঝোতা আলোচনা স্থগিত করা হয়।

১৯৭০ এর দশকে রাজতান্ত্রিক শাসনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রথম পরমাণু প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রকল্প থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়ালেও ইরান প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তি ইরানের পরমাণু প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টার জন্য দেশটিকে অভিযুক্ত করে আসছিলো। ইরানকে ‘পরমাণু অস্ত্র অর্জনে বাধা দিতে’ দেশটির ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

ইরান সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ।

ইরানের সাথে পরমাণু সমঝোতায় বিভিন্ন সময়ই বিশ্বশক্তির আলোচনা হয়।

২০১৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ভিয়েনায় ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানি পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করে। জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা সংক্ষেপে জেসিপিওএ নামে পরিচিত এই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। এর বিনিময়ে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়।

তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সীমিত পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করে।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি জানিয়েছেন, ইরানকে আগে তার পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসতে হবে। অপরদিকে ইরান আগে দেশটির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করায় নতুন করে শুরু হওয়া পরমাণু আলোচনায় তেহরান ওয়াশিংটনের কোনো প্রতিনিধির সাথে বৈঠকে অস্বীকার করেছে।

সূত্র : আলজাজিরা, সিএনএন, প্রেস টিভি


আরো সংবাদ


premium cement