১৭ আগস্ট ২০২২
`

হেবরনের ইবরাহীমি মসজিদে ইসরাইলি প্রেসিডেন্টের হানুকা উদযাপন

হানুকার আলোক প্রজ্জ্বলন করছেন আইজ্যাক হ্যারজগ - ছবি : সংগৃহীত

ইহুদি ধর্মীয় উৎসব হানুকা উদযাপন উপলক্ষে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হ্যারজগ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীরের হেবরনের ইবরাহীমি মসজিদে আসেন। রোববার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মসজিদে এসে হানুকার আলোক প্রজ্জ্বলন করেন তিনি।

এদিকে আইজ্যাক হ্যারজগের মসজিদে এসে হানুকার উদযাপনের সমালোচনা করছে ফিলিস্তিনিরা।

পশ্চিম তীরের হেবরনের ইবরাহীমি মসজিদের কাছে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কবর থাকায় ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম; তিন ধর্মের লোকেরাই একে পবিত্রস্থান হিসেবে গণ্য করে। ইবরাহীম (আ.) কে তিন ধর্মের অনুসারীরাই তাদের পূর্বপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করে।

আইজ্যাক হ্যারজগ ইবরাহীমি মসজিদে হানুকা উৎসবের আলোক প্রজ্জ্বলনের অনুষ্ঠানে বলেন, হেবরনের ‘কেভ অব দ্য প্যার্টিয়ার্কে’ তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য এই প্রাচীন শহরের ইহুদি অতীত উদযাপন ও আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক বাড়ানো।

ইবরাহীমি মসজিদ ইহুদিদের কাছে ‘কেভ অব দ্য প্যার্টিয়ার্ক’ (ধর্মীয় প্রধানদের গুহা) হিসেবে পরিচিত।

বক্তব্যে হ্যারজগ হেবরন শহরে চলমান ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর আক্রমণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনামলে হেবরনে এক দাঙ্গায় নিহত ইহুদি বাসিন্দাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। হেবরনের ওই দাঙ্গায় ৬০ ইহুদি নিহত হয়েছিলো।

ওই দাঙ্গা থেকে তার এক আত্মীয় বেঁচে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে হ্যারজগ বলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তার এক অধ্বস্তন পুরুষ ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেভ অব দ্য প্যার্টিয়ার্কে হানুকার আলোক প্রজ্জ্বলন করছে দেখে তিনি প্রশান্তি লাভ করতেন।’

শহরের ইসরাইলি বসতিকে ‘সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইসরাইলি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বর্তমানে হেবরনে প্রায় এক হাজার বসতিস্থাপনকারী বাস করছেন। অপরদিকে শহরের দুই লাখ ফিলিস্তিনি ইসরাইলি সৈন্যদের বন্দুকের নলের মুখে জীবনযাপন করছেন।

এদিকে ইবরাহীমি মসজিদে প্রেসিডেন্ট হ্যারজগের আসার আগেই মসজিদ বন্ধ করে কড়া নিরাপত্তা পাহাড়া বসায় ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী। এই সময় হ্যারজগের মসজিদে ভ্রমণের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা চালায় তারা।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ওপর ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা- ছবি : এপি

 

ইবরাহীমি মসজিদের ডাইরেক্টর হাফিজ আবু সিনিনা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, হ্যারজগের এই ভ্রমণ ইবরাহীমি মসজিদকে ইসরাইলের দখল চেষ্টা এবং এর পরিচিতি পরিবর্তনেরই অংশ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পবিত্রস্থানে যা হচ্ছে, তা কোনো বিস্ময়কর ঘটনা নয়। মসজিদুল আকসা ও ইবরাহীমি মসজিদ ইসরাইলি আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণের জন্যই ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবে এই ঘটনা ঘটছে।’

আবু সিনিনা বলেন, ‘আমরা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের কমিটির কাছে এই অঞ্চলের অবস্থা সম্পর্কে জানিয়েছি, যেহেতু চার বছর আগে এই কমিটি ইবরাহীমি মসজিদকে ফিলিস্তিনি ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছিলো।’

অপরদিকে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা হুসাইন আল-শেখ হ্যারজগের এই ভ্রমণকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ‘রাজনৈতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অপরদিকে বিক্ষোভে অংশ নেয়া নুরিত বুডিনস্কি নামের এক ইসরাইলি অধিকারকর্মী বলেন, ‘হ্যারজগের কোনো লজ্জা নেই। তিনি ওই ইহুদিদের সাথে স্বাধীনতার উৎসব পালন করতে এসেছেন, যারা শহরটি দখল করেছে। হেবরনে কোনো স্বাধীনতা নেই। এখানে জনগণ অসহ্য দখলদারিত্বের মধ্যে বাস করছে।’

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ফিলিস্তিনে গ্রিক শাসনামলে ইহুদি ধর্ম পালন নিষিদ্ধ হলে ইহুদিরা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের ধর্ম পালনের অধিকার আদায় করে। এর স্মরণেই হানুকা উৎসব পালন করা হয়।

এদিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরোধী সাবেক ইসরাইলি সৈন্যদের সংগঠন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স জানিয়েছে, হ্যারজগের এই ভ্রমণ এই অঞ্চলের নির্মম বাস্তবতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর পশ্চিম তীরে সাথেই হেবরন শহর ইসরাইলি দখলে আসে। হেবরন দখলের পর ইসরাইল এই শহরে অবৈধ বসতি স্থাপন করে এবং ইবরাহীমি মসজিদ মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে দুই ভাগ করে দেয়।

১৯৯৩ সালে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তির আওতায় দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অংশ হিসেবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে হেবরনসহ পশ্চিম তীর থেকে ইসরাইলি বসতি সরিয়ে নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়ার কথা থাকলেও ইসরাইল এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

সূত্র : এপি ও দ্য নিউ আরব


আরো সংবাদ


premium cement