১৬ জুন ২০২১
`

ইসরাইলি আরবরা নিজ দেশে যেভাবে বৈষম্যের শিকার

ইসরাইলি আরবরা নিজ দেশে যেভাবে বৈষম্যের শিকার - ছবি- সংগৃহীত

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের সংঘাত চলতি সপ্তাহে খুবই সহিংস ও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন ধরে চলা সংঘাত ও অসন্তোষের পর ইসরাইল তেল আবিবের কাছে কেন্দ্রীয় একটি শহর লডে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। ইসরাইল বলছে, ওই শহরে দাঙ্গায় জড়িয়েছে ইসরাইলি আরবরা।

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার ক্ষেত্রে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে এই দাঙ্গা। ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম ইসরাইল সরকার নিজ দেশের আরব সম্প্রদায়ের ওপর জরুরিকালীন ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে। কিন্তু কারা এই ইসরাইলি আরব?


ইসরাইলি আরবদের ইতিহাস
সাধারণভাবে বলা হয়, ইসরাইল একটি ইহুদি রাষ্ট্র। কিন্তু ইসরাইলে ইহুদি নয়, এমন মানুষও বাস করেন। যেমন ইসরাইলের সংখ্যালঘু আরব সম্প্রদায়, যারা বংশ পরিচয়ে ফিলিস্তিনি। কিন্তু তারা ইসরাইলের নাগরিক। ইসরাইলের জনসংখ্যা ৯০ লাখের বেশি। এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ প্রায় ১৯ লাখ ইসরাইলি আরব। ইসরাইল রাষ্ট্র যখন সৃষ্টি হয় ১৯৪৮ সালে, তখন এই ফিলিস্তিনিরা ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে রয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ, ১৯৪৮ পরবর্তী যুদ্ধের সময় হয় ইসরাইল ছেড়ে পালিয়ে যায় অথবা তাদের বসতভিটা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়।

যারা ইসরাইল থেকে চলে গিয়েছিলেন তারা সীমান্ত এলাকার কাছেই পশ্চিম তীর ও গাজায় বসতি গাড়েন অথবা ওই এলাকার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। ইসরাইলের ভেতরে যারা থেকে যান তারা নিজেদের পরিচয় দেন ইসরাইলি আরব, ইসরাইলি ফিলিস্তিনি বা শুধুই ফিলিস্তিনি হিসেবে।

ইসরাইলি আরবদের গরিষ্ঠ সংখ্যকই মুসলমান। তবে অন্যত্র ফিলিস্তিনি সমাজে যেমন, তেমনই ইসরাইলি আরবদের মধ্যে খ্রিস্টানও রয়েছেন। ইসরাইলি আরবদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ গোষ্ঠীর মানুষ খ্রিস্টান।

ইসরাইলে ১৯৪৯ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথম নির্বাচন হওয়ার সময় থেকেই ইসরাইলি আরবদের ভোটাধিকার রয়েছে। কিন্তু তারা বলছেন, কয়েক যুগ ধরে ইসরাইলের বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

সমাজে আলাদা অস্তিত্ব
ইসরাইলে আরব ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক সময়ই জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য একই জায়গা ব্যবহার করেন না। যদিও করোনাভাইরাস সঙ্কটের সময় সাম্প্রতিক কয়েক মাসে দেখা গেছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে কাজ করেছেন। এটা বিশেষভাবে দেখা গেছে স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে। যেখানে একই হাসপাতালে একসাথে কাজ করেছেন ইহুদি ও আরব চিকিৎসকরা। আবার একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আরব ও ইহুদি রোগীরা।

চিকিৎসকের ২০ ভাগ, নার্সদের মধ্যে ২০ ভাগ ও ফার্মাসিস্ট বা ওষুধ বিক্রেতাদের ৫০ ভাগই ইসরাইলি আরব। কিন্তু জাতীয়ভাবে ইসরাইলি আরব ও ইহুদি নাগরিকরা একইসাথে পাশপাশি কাজ করছেন এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। উদাহরণ স্বরূপ, ইসরাইলি সমাজে সেনাবাহিনীর একটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। ইহুদি নাগরিকদের জন্য সেনাবাহিনীতে কোনো একটা সময়ে কাজ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আরবদের জন্য তা বাধ্যতামূলক নয়।

বৈষম্য
আরব ইসরাইলিরা বলছেন, তারা নিজের দেশের মধ্যে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন, যা দেশটির পরিচালনা ব্যবস্থার ভেতরেই নিহিত। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সহমতও। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল বলছে, ইসরাইলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইল প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বৈষম্য আরোপ করে রেখেছে। এপ্রিল ২০২১-এ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। যেসব ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত ইসরাইলে বাস করেন ও যেসব ফিলিস্তিনি পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরাইলি দখলদারির অধীনে বসবাস করেন, তাদের প্রতি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আচরণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে ওই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়।

ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই রিপোর্টকে ‘অবাস্তব ও ভুয়া’ বলে প্রত্যাখান করেছে। ইসরাইলি আরবরা বলছেন, তাদের জায়গাজমি জব্দ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় বাজেটে ইহুদি কর্তৃপক্ষ তাদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে বৈষম্য করে আসছে।

‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’
উদাহরণ স্বরূপ, ইসরাইলে নাগরিকত্বের যোগ্যতা পাওয়ার জন্য আইনের যে বিধান রয়েছে তা ইহুদিদের অনুকূলে। ইহুদিদের এমনিতেই ইসরাইলি পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তারা কোন দেশ থেকে এসেছেন বা কোথায় থাকেন, তা বিবেচ্য ধরা হয় না। কিন্তু যেসব ফিলিস্তিনিকে ইসরাইল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের ও তাদের সন্তানদের এ অধিকার নেই।

ইসরাইলের সংসদ ২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত ‘নেশন-স্টেট আইন’ পাস করে। ওই আইনের বলে দেশটির অন্যতম একটি সরকারি ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার মর্যাদা বিলুপ্ত করা হয়। একইসাথে ঘোষণা করা হয়, জাতীয় পর্যায়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে ‘শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর’।

যে সময় ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদের’ এই আইন পাস করা হয়, তখন সংসদে আরব ইসরাইলি সদস্য আইমান ওডেন বলেছিলেন, ইসরাইলি আরবরা চিরকালই এ দেশে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’।

ইতোমধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠদের’।

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ