১৩ মে ২০২১
`

মূল্যস্ফীতিতে লেবাননে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ইফতার সংগ্রহে দুর্যোগ

লেবাননে ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত মানুষ - ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমপ্রধান দেশ লেবানন। এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম অঞ্চলে এর অবস্থান। লেবাননের উত্তর ও পূর্বে দিকে সিরিয়া, দক্ষিণে ইসরায়েলের সীমানা আর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ও সাইপ্রাস দ্বীপ। ১৯৪৩ সালে স্বাধীনতা লাভ করে লেবানন। ২০১৮ সালের এক জরিপ অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যা ৬৮ লাখ ৬০ হাজারের কাছাকাছি। তবে বিভিন্ন কারণে অর্থনৈতিকভাবে দেশটি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

এর মধ্যে পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে। এবারের রমজানে লেবাননের বেশিরভাগ পরিবার প্রতিদিনের ইফতারের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে।

লেবাননে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও খাবারের দ্রুত দাম বাড়ায় এ পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। লেবাননের সঙ্কট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা দ্য লেবানন ক্রাইসিস অবজারভেটরির সাম্প্রতিম প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চিত্র।

গবেষণায় দেখানো হয়, রমজানের এক মাসে পাঁচ সদস্যের এক পরিবারকে এক মাসের ইফতারের জন্য চলতি বাজারে নূন্যতম মজুরির আড়াই গুণ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। লেবাননে নূন্যতম মজুরির পরিমাণ ছয় লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড। কালোবাজারে বর্তমানে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার লেবানিজ পাউন্ড এক ডলারে বিনিময় হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, এক মাসের ইফতারে এখন খরচ আসে ১৮ লাখ লেবানিজ পাউন্ড, যেখানে ২০১৮ সালে খরচ হতো চার লাখ ৪৩ হাজার ৯৩১ পাউন্ড। এই হিসাবে দেশটির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন বা শরবত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গত বছর শেষ হতেই, আন্তর্জাতিক বাজারে লেবাননের পাউন্ডের দরপতন হয় ২০ ভাগ। বর্তমানে দেশটির স্বীকৃত বিনিময় হারে এই পতন ৮৫ ভাগেরও নিচে। মুদ্রাস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলেছে লেবাননের প্রতিটি পণ্য ও সেবায়। বিশেষ করে দেশটিতে ৮০ ভাগ পণ্যই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হওয়ায় এই প্রভাব আরো বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতানুসারে, মানসম্মত এক বেলার ইফতারে ভাত, মুরগির গোশত, ফাতুশ সালাদ ও মসুর ডালের সুপের জন্য বর্তমানে খরচ পড়ছে ৬০ হাজার ২৪৩ লেবানিস পাউন্ড। ২০১৮ সালের একই খাবারে এখন খরচ বেড়েছে ২৬৮ ভাগ।

চলতি বছর একটি রুচিসম্মত ব্যয়বহুল ইফতার বেশিরভাগ লেবানিজ পরিবারের ক্ষেত্রে জোগাড় করার সামর্থ্য নেই। দেশটিতে বর্তমানে আনুমানিক অর্ধেক জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

গবেষণা পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ও বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের (এইউবি) সহযোগী অধ্যাপক নাসের ইয়াসিন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এই বিশাল মূল্য বৃদ্ধি লেবাননের গরিব পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক খাবার ও তাদের জন্য রমজানের ইফতার জোগাতেও অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে।

ইয়াসিন জানান, পর্যবেক্ষণের জন্য এইউবি মধ্যপ্রাচ্যের ক্লাসিক রান্নার বই থেকে সঙ্গতিপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী খাবার বেছে নিয়ে এই গবেষণা করেছে।

পরে গবেষকরা খাবারের বিভিন্ন উপকরণ বেছে নিয়ে গত তিন বছরের মূল্য হিসাব করেছেন। লেবাননের ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, দেশটিতে ২০২০ সাল পর্যন্ত পণ্যের দাম আনুমানিক ৪০০ ভাগ বেড়েছে।

পর্যবেক্ষক দল প্রাথমিকভাবে ঐতিহ্যবাহী ফাতুশ সালাদের সরঞ্জামের মূল্য বাড়ার দিকে নজর দেয়। রুটির ভাজা টুকরার সাথে শসা, মুলা, টমেটো, লেটুস, পার্সলিসহ বিভিন্ন সালাদ পাতা ও সবজির মিশ্রণে এই সালাদ তৈরি হয়।

তারা দেখান যে এই যে শুধু এই সালাদেই গত বছরের তুলনায় ২১০ ভাগ মূল্য বেড়েছে। তবে সালাদটির অন্যতম মৌলিক উপাদান জলপাই তেলের দাম বাড়ার কারণে এই মূল্য বাড়তে পারে।

ইয়াসিন বলেন, 'বিদেশ থেকে আপদানি করা তেল, গোশত ও অন্য পণ্যের দাম প্রকৃতই অনেক বেশি। তবে স্থানীয় উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত প্রাথমিক সরঞ্জাম যেমন বীজ, কীটনাশক ও কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পণ্যের খরচের সাথে এটি জড়িত। এটিই পুরো ব্যয়কে প্রভাবিত করছে।'

সূত্র : মিডল ইস্ট আই



আরো সংবাদ


সকল